সিদ্ধান্ত না পাল্টালে কাল থেকে আমরণ অনশন

আগের সংবাদ

৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে পারে আজ

পরের সংবাদ

‘পোলাডা স্বপ্নেও বাঁচলো না, বাস্তবেও না!’

ইমরান রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০২০ , ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ

‘ইঞ্জিনের ভেতর কিমুন জানি করছে রে পোলাডা। বাইরোনের লাইগা ছটফট করছে। মা বইলা চিৎকার করছে। কেউই ওর চিৎকার শোনে নাই। কত কষ্ট পাইয়া মারা গেছে। এহন আমি কার লাইগা দোয়া-দুরুদ পইড়া আল্লাহর কাছে হাত পাতমু… আশিকরে ফিরে আয় বাবা… তোর মারে ফেইলা যাইস না।’ এভাবেই আর্তনাদ করতে করতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন মধ্যবয়স্ক পপি বেগম। মাথায় পানি ঢালার পর জ্ঞান ফিরলে আবারো বিলাপ করতে

করতে ছেলেকে খুঁজতে থাকেন।
ছেলের বিষয়ে জানতে চাইলে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে ভোরের কাগজকে তিনি জানান, তার ছেলের নাম আশিক (১৮)। ডুবে যাওয়া লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে কাজ করত। বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। ছেলে লঞ্চে কাজ করায় সব সময় দোয়া-দুরুদ পড়ে দোয়া করেন তিনি। কিন্তু রবিবার দিবাগত রাতে স্বপ্ন দেখেন আশিক লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা গেছে। এরপর আর সারারাত ঘুমাতে পারেননি। সকালে স্বপ্নের মতোই ঘটনা ঘটল। লঞ্চডুবির পর থেকে খুঁজে পাচ্ছেন না একমাত্র ছেলে আশিককে। স্বপ্নের মতোই আশিক ইঞ্জিন রুমে চিৎকার করতে করতে মারা গেছে… বলেই আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
পপি বেগম যখন নিখোঁজ ছেলের শোকে বুড়িগঙ্গা তীরে বসে আর্তনাদ করছেন, তখনই স্বজনের লাশ বুকে জড়িয়ে আর্তনাদের রোল পড়ে যায় পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড) মর্গের সামনে। কেউ বাবা হারিয়ে, কেউ সন্তান হারিয়ে আবার কেউ মা-বোনকে হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। কেউ বা স্বজনের খোঁজে অশ্রুশিক্ত চোখ নিয়ে বসে থাকেন নতুন লাশের অপেক্ষায়।
ডুবে যাওয়া লঞ্চ মর্নিংবার্ডে থেকেও ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা রিফাত কান্নাজড়িত কণ্ঠে ভোরের কাগজকে বলেন, মা ময়না বেগম ও বোন মুক্তাকে নিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম। লঞ্চের ছাদে থাকায় আমি প্রাণে বেঁচে গেছি। কিন্তু মা-বোনকে বাঁচাতে পারলাম না। আল্লাহ আমারেও কেন নিয়ে গেল না এটুকু বলেই অচেতন হয়ে পড়েন রিফাত। পরে স্বজনরা তাকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান। একইভাবে বিলাপ করছিলেন আপন দুই ভাইকে (বাচ্চু শেখ ও আবদুল শেখ) হারানো ইব্রাহিম শেখ। কান্না ভেজা কণ্ঠে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে একই সঙ্গে ঢাকা আসার পথে মারা যান বাচ্চু শেখ ও আবদুল শেখ। ওদের সন্তানদের কিভাবে বলব তোদের বাবার লাশ নিয়ে এসেছি…।
এদিকে, রাজধানীর ভাড়া বাসা ছেড়ে দিতে স্ত্রী হাসিনা রহমান ও আট বছরের ছেলে সিফাতকে নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন জজ কোর্টে মুহুরির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা আবদুর রহমান। কিন্তু রাজধানীর মায়া ত্যাগ করতে গিয়ে জীবনের মায়াই ত্যাগ করতে হয়েছে তাদের। মর্গে রাখা লাশের সারির প্রথম দিকেই ভাগ্নে সিফাতকে দেখে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন আবদুর রহমানের শ্যালিকা হামিদা বেগম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুঁজে পান বোন হাসিনার মৃতদেহ।
পরে হামিদা বলেন, দুলাভাই অনেক কষ্ট করে সবাইকে নিয়ে চলছিল। বড় ছেলে হাসিবুর রহমান এবার এইচএসসি পাস করেছে, মেজ ছেলে রিফাত নবম শ্রেণিতে পড়ে। করোনা ভাইরাসের কারণে দুই মাস আগে পুরো পরিবার গ্রামে চলে যায়। সকালে দুলাভাই বোন ও ছোট ভাগ্নেকে নিয়ে কসাইটুলি আসছিলেন বাসার মালামাল নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আসার পথেই ঘটে গেল এই দুর্ঘটনা। আবদুর রহমানের খোঁজ না মেলায় অশ্রæশিক্ত চোখে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।
প্রসঙ্গত, গতকাল সকালে রাজধানীর শ্যামবাজার এলাকা সংলগ্ন বুড়িগঙ্গা নদীতে ময়ূরপঙ্খী-২ লঞ্চের ধাক্কায় অর্ধশতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় মর্নিংবার্ড লঞ্চ। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ৩২ জনের লাশ উদ্ধার করতে পেরেছে ডুবুরিরা।

এসএইচ