এমন করুণ দৃশ্য আর কত দেখব

আগের সংবাদ

চীন-ভারত উত্তেজনা এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

পরের সংবাদ

করোনা মোকাবিলা ও অর্থনীতি চালুর যুগপৎ সমাধান

ড. মো. মামুন আশরাফী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০২০ , ৫:৩৪ অপরাহ্ণ

এক ধরনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা নিয়েই করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। ব্যাপক সংক্রমণ এবং বারবার চরিত্র পরিবর্তনকারী এই ভাইরাসকে মোকাবিলা করতে কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করলে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে সেটি অনুমান করা সত্যিই মুশকিল। তাই বিশেষজ্ঞরা এই ভাইরাস মোকাবিলার পদ্ধতি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত গলদঘর্ম হচ্ছেন কিন্তু করোনা ভাইরাস তাদের উদ্ভাবিত সব পদ্ধতিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তার দোর্দণ্ড প্রতাপ দেখিয়েই চলেছে। এই পদ্ধতির সর্বশেষ সংস্করণ হচ্ছে ঢাকা শহরকে রেড, ইয়েলো এবং গ্রিন জোনে ভাগ করে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনা। আমি সর্বান্তকরণে সরকারের ওই পদ্ধতির সফলতা কামনা করছি; তবে এই জোনিং পদ্ধতির পরিকল্পনাটি শুধু সমগ্র ঢাকা শহরে নয়; দেশের প্রতিটি উপজেলাকে একেকটি জোন হিসেবে ভাগ করে একটু ভিন্ন ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিম্নোল্লিখিতরূপে প্রয়োগ করলে করোনা মোকাবিলায় অধিক ফল পাওয়া যেতে পারে এবং ঢাকা শহরের প্রায় ২ কোটি কর্মক্ষম মানুষসহ বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ উৎপাদনে আগের মতোই তাদের সরাসরি ভ‚মিকা রেখে অর্থনীতিকে পুরোদমে চালু রাখতে পারে বলে আমি মনে করি।
অর্থনীতি এবং উৎপাদন চালু রাখা এ জন্যই প্রয়োজন যে, করোনা ভাইরাসের আক্রমণে গত তিন মাসে মানুষের আয় প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। থমকে গেছে উৎপাদনের অর্থনীতি। উৎপাদনের চাকা ঘুরলে সবারই আয়ের ব্যবস্থা হবে এবং নিদেনপক্ষে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা হবে। এটা বুঝতে হবে যে, উৎপাদন বন্ধ থাকলে খাবারের অভাবে মানুষ মারা যাবে; চিকিৎসার অভাবে নয়। কর্ম না থাকলে বেকারত্ব বাড়বে আর সেইসঙ্গে বাড়বে সামাজিক অস্থিরতা, ছিনতাই, চুরি-ডাকাতির মতো নিত্যনৈমিত্তিক অপরাধগুলো। আর তাই করোনা সমস্যাকে আমরা যত প্রকট সমস্যাই মনে করি না কেন, অর্থনীতি কিংবা উৎপাদন চালু না রাখলে দেশে যে সমস্যা দেখা দেবে তা করোনার চেয়ে কোন অংশেই কম প্রকট নয়। সুতরাং আমাদের যুগপৎ দুটি সমস্যাই সমান গুরুত্বের সঙ্গে এবং একইসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে; একটি বাদ দিয়ে অন্যটি সম্ভবপর নয়।
আমাদের মনে রাখতে হবে করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় যে পদ্ধতি কার্যকর, বাংলাদেশের জন্য সে পদ্ধতি কার্যকর না-ও হতে পারে। কারণ আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রকৃতি, নিরাপত্তা ও শক্তি, শিক্ষা ও জনগোষ্ঠীর আচরণ, সচেতনতার মাত্রা ইত্যাদি ইউরোপ-আমেরিকার চেয়ে বহুলাংশেই আলাদা। আমাদের সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে আমাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে, যেটা বাংলাদেশে কার্যকর করা সম্ভব হবে। আমার প্রস্তাবিত পদ্ধতিটির ফর্মুলা নিম্নরূপ :
প্রকল্প এলাকা ও পরিধি : ঢাকা শহরের প্রতিটি অঞ্চলসহ দেশের প্রতিটি উপজেলার রোগীদের উপসর্গ ও অবস্থাভেদে তিন ভাগে ভাগ করে যে এলাকায় রোগী থাকবে সে এলাকাকে ‘নীল অঞ্চল’ ঘোষণা করা যেতে পারে এবং প্রতিটি ‘নীল অঞ্চলে’ অথবা তার কাছাকাছি কোনো এলাকায় ‘করোনা পরীক্ষা কেন্দ্র’ গড়ে তোলা যেতে পারে যেখান থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি জেলার অথবা কয়েকটি ‘নীল অঞ্চল’-এর সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রæত পরীক্ষা করা যেতে পারে।
রোগী ক্যাটাগরি অ (কম ঝুঁকিপূর্ণ রোগী) : যাদের উপসর্গ রয়েছে কিন্তু অসুস্থতা মৃদু পর্যায়ের অর্থাৎ কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাড়িতেই চিকিৎসা করা সম্ভব, তারা নিজের বাসায় গৃহবন্দি এবং যতটুকু সম্ভব সঙ্গনিরোধ অবস্থায় থাকবেন। ইতোমধ্যেই সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসকদের বরাতে আমরা জানতে পেরেছি যে, করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই বাড়িতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। প্রদত্ত চিকিৎসার মাধ্যমে অবস্থার উন্নতি হলে তিনি বাড়িতেই অবস্থান করবেন আর অবনতি হলে তিনি ই ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত হবেন এবং একটি ‘হলুদ কার্ড’ পাবেন।
রোগী ক্যাটাগরি ই (ঝুঁকিপূর্ণ রোগী) : এটি একটি ‘হলুদ অঞ্চল’। এ অঞ্চলের রোগীরা ক্যাটাগরি অ থেকে ই ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরিত ঝুঁকিপূর্ণ রোগী, যারা মেডিকেল অফিসারদের অনুমোদনক্রমে এখানে ভর্তি হতে পারবেন এবং একটি ‘হলুদ কার্ড’ পাবেন, অর্থাৎ তাদের জন্য বাড়ির বাইরে সঙ্গনিরোধের প্রয়োজন রয়েছে এবং সঙ্গনিরোধ অবস্থায় সরাসরি ডাক্তারের চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রদত্ত চিকিৎসার মাধ্যমে ভর্তিকৃত রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে তিনি একটি ‘সবুজ কার্ড’ পাবেন এবং বাড়িতে প্রস্থান করবেন আর অবনতি হলে তিনি একটি ‘লাল কার্ড’ পাবেন যেটি প্রদর্শনপূর্বক তিনি ক্যাটাগরি ঈ-তে স্থানান্তরিত হবেন ও ভর্তি হবেন। এই ক্যাটাগরির রোগীর জন্য সরকার প্রয়োজনে দেশের প্রতিটি ‘লাল অঞ্চল’ ঘোষিত এলাকায় পর্যাপ্তসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতাল অধিগ্রহণ করে রোগীদের সেখানে স্থানান্তরিত করতে পারেন এবং সরকারি হাসপাতালসহ একই এলাকার স্কুল, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার, আবাসিক হোটেল ইত্যাদি স্থাপনা স্বল্পতম সময়ে ন্যূনতম চিকিৎসার উপযোগী করে প্রস্তুত করে রোগীদের সেখানে রাখতে পারেন। জনগণকে বোঝাতে হবে যে, এটি একটি আপৎকালীন যুদ্ধাবস্থা এবং আমাদের সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে এই যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে।
রোগী ক্যাটাগরি ঈ (অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগী) : এটি একটি ‘লাল অঞ্চল’। এখানকার রোগীরা ক্যাটাগরি ই থেকে স্থানান্তরিত ‘লাল কার্ড’ প্রাপ্ত অতি ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাৎ সংকটাপন্ন রোগী। অর্থাৎ তার অক্সিজেন/আইসিইউ/ভেন্টিলেটর সাপোর্ট প্রয়োজন। ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন ব্যতিরেকেও এখানে বিশেষ বিবেচনায় তাৎক্ষণিক সরাসরি জরুরি সংকটাপন্ন অবস্থায় রোগী ভর্তি হতে ও চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবেন এবং এদের ‘কমলা কার্ড’ প্রদান করা যেতে পারে। প্রদত্ত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে তিনি একটি ‘সবুজ কার্ড’ পাবেন এবং বাড়িতে প্রস্থান করবেন। এই ক্যাটাগরির রোগীদের অবস্থান করার জন্য অবশ্যই অক্সিজেন/আইসিইউ/ভেন্টিলেটর সাপোর্ট সম্পন্ন হাসপাতাল প্রয়োজন, যেখানে ভেন্টিলেটর না থাকুক অন্তত আইসিইউ/অক্সিজেন প্রদানের সুবিধা রয়েছে।
আমরা এখন মোটামুটি নিশ্চিত হলাম যে, এভাবে সংক্রমণের প্রত্যক্ষ ঝুঁকি আমরা কমিয়ে আনতে পারব কেননা এখন অ, ই, ঈ এই তিন ক্যাটাগরির রোগীই আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমণ ঘটানোর জন্যে বর্তমানের মতো অতি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, কারণ তারা ব্যাপক মানুষের সংস্পর্শে আসছে না। তবে সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাসকল্পে প্রতিটি উপসর্গধারী নাগরিকের করোনা টেস্টসহ মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং জনসমাগম হয় এমন প্রতিটি জায়গায় জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে হাত ধৌত করার স্থান ও জীবাণুমুক্ত করার উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যমকর্মী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ লড়াইয়ে যে অকুতোভয় সাহসিকতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তাতে আমাদের সাহস ও শক্তি বেড়ে গেছে বহুগুণ আর তাই সর্বাগ্রে সম্মুখ সারির এই যোদ্ধাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু আরো একটি দক্ষ কর্মীবাহিনী আমাদের প্রয়োজন আর তারা হলেন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, যারা করোনা ভাইরাসের স্যাম্পল কালেকশন করেন। দক্ষ টেকনোলজিস্ট ছাড়া সঠিকভাবে স্যাম্পল কালেকশন সম্ভব নয় আর সঠিকভাবে স্যাম্পল কালেকশন না করলে সঠিক ফল পাওয়াও সম্ভব নয়। তেমনি, নিম্নমানের কিট দিয়ে স্যাম্পল কালেকশন ও টেস্টের ফলও সঠিকভাবে পাওয়া সম্ভব নয়। যত উন্নত মানের চিকিৎসার ব্যবস্থাই আমরা করি না কেন, স্যাম্পল কালেকশন ও টেস্ট সঠিক না হলে মহামারির বিরুদ্ধে আমাদের পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।

ড. মো. মামুন আশরাফী : রাষ্ট্রচিন্তক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ।