করোনায় করণীয় সময় নেই সময়ক্ষেপণের

আগের সংবাদ

এই দুঃসময়ে অনেকেই স্বার্থ উদ্ধারে হাঁটছে

পরের সংবাদ

করোনা-উত্তর কৃষি : কিছু ভাবনা ও প্রস্তাবনা

ড. আবুল কালাম আযাদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০২০ , ১০:২৫ পূর্বাহ্ণ

করোনা-উত্তর বিশ্ব আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হবে। বিশেষজ্ঞরা এসব পূর্বাভাসই দিচ্ছেন। দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নতুন কৃষি প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও ব্যবহারের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এসব প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল বৃদ্ধি, নতুন ল্যাব স্থাপন, প্রয়োজনীয় লজিস্টিকসহ অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য বর্তমানে জাতীয় বাজেটের ০.৭০% গবেষণা বাজেট উন্নীত করে ১.০০% করার বিষয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ মত প্রকাশ করে থাকেন। আমি এসবের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলতে চাই, প্রতি বছর ০.১০% হারে বৃদ্ধি করে (জাতীয় বাজেটের) আগামী ৫ বছরে এই হার ১.১২% করা প্রয়োজন। কর্মপরিকল্পনায় বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে এবং বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে গবেষণা ব্যবস্থাপনারও উন্নয়ন একান্ত প্রয়োজন। এজন্য দরকার আরো অধিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতামূলক কৃষি গবেষণা ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থাপনায় প্রতিটি কর্মচারীকে (বৃহৎ অর্থে) অধিকতর মনিটরিংয়ের আওতায় আনা প্রয়োজন হবে। এখানে বাস্তবায়নে অধিকতর মনোযোগী হতে হবে। উল্লেখ্য, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া শুধু বাজেট উক্ত হারে বৃদ্ধি করা হলে তা বাস্তবায়ন দুঃসাধ্য হবে। আর গবেষণায় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অনস্টেশন গবেষণার পাশাপাশি অনফার্র্ম গবেষণাও সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে উক্ত গবেষণা বাস্তবধর্মী গবেষণা হবে না। আর এজন্য বিজ্ঞানীদের মাঠপর্যায়ে মোবিলিটির বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

আমাদের দেশে ধান, পাট, গম, ভুট্টা, আখ, তুলা, আলু, ডাল, তেল ফসল, মসলা, উদ্যান ফসল মিলে দুই শতাধিক ফসলের ওপর গবেষণা হয়। তাই ফসলের গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রায়োরিটি (Priority) নির্ধারণপূর্বক তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা যেতে পারে, যাতে সব প্রতিষ্ঠান সমন্বয় করে গবেষণা কাজ সম্পাদন করতে পারে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে অধিক উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, মাটি ব্যবস্থাপনাসহ ফসলের নানামুখী গবেষণা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন এসব গবেষণা কি এখন হচ্ছে না? এর উত্তর হবে এখনো এসব গবেষণা হচ্ছে। কিন্তু যে আঙ্গিকে গবেষণা ঢেলে সাজাতে হবে, যে প্রধান প্রধান ফসলের জাত উদ্ভাবনে লক্ষ থাকবে, জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ে সবচেয়ে উচ্চ ফলনশীল জাতের চেয়ে কমপক্ষে ২০-২৫% উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এমন জাতের উদ্ভাবনে সচেষ্ট হওয়া। তবে অন্যান্য সব মান ঠিক রেখেই তা করতে হবে। এজন্য কনভেনশনাল ব্রিডিংয়ের পাশাপাশি জীবপ্রযুক্তি, মার্কার এসিস্টেড ব্রিডিংসহ অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির অধিকতর সমন্বয় করতে হবে। সেক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল লাভ করা সম্ভব হবে।
সার, বীজ ও সেচ ব্যবস্থাপনা কৃষি উৎপাদনের প্রধান অনুষঙ্গ। বিগত এক দশক ধরে কৃষি মন্ত্রণালয় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সার আমদানি, সার বিতরণ, সারের মূল্য কমানোর মাধ্যমে কৃষকদের প্রণোদনা প্রদানে অত্যন্ত দক্ষতা ও সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। তবে প্রধান প্রধান সার ছাড়াও জিংক, বোরনসহ জৈবসার ব্যবস্থাকে আরো বেশি গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। তবে মানসম্পন্ন বীজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রধান কয়েকটি ফসলে প্রাধান্য থাকলেও দেড় শতাধিক ফসলের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে private sector ক্ষেত্রবিশেষে উল্লেখযোগ্য কিছু ভূমিকা রাখলেও মানসম্পন্ন বীজ সরবরাহ ও ব্যবহারে উন্নয়ন প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনে আগ্রহী গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে বীজ উৎপাদনের ম্যান্ডেট দেয়া যেতে পারে। যেমন ডাল, তেল ও মসলা ফসল ইত্যাদি। সেচ ব্যবস্থাপনার বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প থাকলেও এর পরিধি আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এজন্য প্রয়োজনে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

২০০৭ সালে বাংলাদেশ চাল আমদানির ক্ষেত্রে যে বিপাকে পড়েছিল তা সবাই জানে। গত বছর পেঁয়াজ আমদানিতেও বিপাকে পড়তে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ কথা সত্য যে ডাল, তেল ও মসলা আমাদের ঘাটতি ফসল আর এর উৎপাদন যদি কোনো বছর কোনো প্রাকৃতিক কারণে কমে যায় তখন তা রাজনীতির প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাছাড়া চাল আমদানির প্রয়োজন হলে তা হয় মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। তবে সুখের বিষয় এই যে, অন্তত চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং এর মোট উৎপাদন যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এ কথা মনে রাখতে হবে যে, দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে, আবাদি জমি দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগও দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাকে আমরা জলবায়ুর পরিবর্তন বলতে পছন্দ করি। তবে বাস্তবতা কিন্তু তাই। অসময়ে বৃষ্টি, অসময়ে খড়া, অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি ইত্যাদি সমস্যা কৃষিকে দিনে দিনে অধিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। তাই ফসল বা কৃষিপণ্য নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন বৃদ্ধি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

কৃষিপণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যেসব প্রকল্প রয়েছে তা অত্যন্ত ভালো এবং উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্প ঠিক রেখে জেলাভিত্তিক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি (ফসলভেদে ১৫-২৫%) প্রকল্প গ্রহণ করা যায় কিনা তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভেবে দেখতে পারেন। এতে আলাদা আলাদা ৬৪টি জেলার জন্য ৬৪টি প্রকল্প গ্রহণ করা হলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে ফসলের যে ডাইভারসিফিকেশন হবে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কেউ মনে করতে পারে সারাদেশে এমন একটি প্রকল্পই তো যথেষ্ট। কিন্তু আমি বিনয়ের সঙ্গে তা দ্বিমত পোষণ করি। প্রতিটি জেলার ভূ-প্রকৃতি আলাদা আলাদা বলেই বাংলাদেশকে ৩০টি কৃষি পরিবেশ অঞ্চলে (AEZ) ভাগ করা হয়েছে।

আমাদের দেশের দুই শতাধিক ফসল উৎপাদন হয় এবং একেক জেলায় একেক ফসলের প্রাধান্য লক্ষণীয়। তাই প্রতি জেলায় কৃষি সম্প্রসারণের উপপরিচালককে (DD) প্রকল্প পরিচালক হিসেবে বিবেচনা করে প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় তবে তা হবে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী। তবে এক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক কার্যালয়, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা আলাদা শক্তিশালী মনিটরিং টিম গঠন করা প্রয়োজন হবে, যাতে প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজতর হয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পে উপপরিচালক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং জেলা/উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তারা উপ-প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন। প্রকল্প প্রণয়ন কাজে ওই কর্মকর্তাদের সঙ্গে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে (SAAO) মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ/বেজ লাইন সার্র্ভে করার পরই কেবল বাস্তবধর্মী প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। সারাদেশে একসঙ্গে সম্ভব না হলেও ১৪টি কৃষি অঞ্চলের ১৪টি জেলায় তা পাইলট প্রকল্প আকারে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। কৃষি যেমন একটা জটিল বিজ্ঞান এবং জটিল বাণিজ্যিক বিষয়, তাই করোনা-পরবর্তী সময়ে এসব বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণপূর্বক ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক। কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য কৃষি বাণিজ্যিকীকরণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, যুবসমাজকে সম্পৃক্তকরণ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, প্রাইভেট সেক্টরের ভূমিকা ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ড. আবুল কালাম আযাদ : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট।
[email protected]

ডিসি