ঢাকায় বৃষ্টি হতে পারে আজ

আগের সংবাদ

করোনা-উত্তর কৃষি : কিছু ভাবনা ও প্রস্তাবনা

পরের সংবাদ

করোনায় করণীয় সময় নেই সময়ক্ষেপণের

মাহমুদ হাশিম

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০২০ , ১০:১৮ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের ১৬তম সপ্তাহ শেষ হয়ে ১৭তম সপ্তাহে পড়েছে। ১৬তম সপ্তাহের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার। প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় গড়ে ২৩ জন করে রোগী পাওয়া যাচ্ছে। রোগী শনাক্তের এ হারে আফগানিস্তানের পরেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়। ভারত ও পাকিস্তানে এ হার যথাক্রমে ৬ ও ১৮। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনে মৃত্যুও ৩৫-এর এদিকে-ওদিকে। অর্থাৎ সব দিক থেকেই দেশের করোনা পরিস্থিতি আশঙ্কাকে সত্য করে খারাপের দিকেই যাচ্ছে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বর্তমানে আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়াকে করোনার বিপজ্জনক ঘাঁটি বলেছে। যুক্তরাজ্যের সংবাদপত্র গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ ঝুঁকির শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে ৫ নম্বরে রেখেছে। তালিকার প্রথম ৫-এর অন্য চারটি হলো যথাক্রমে জার্মানি, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ড। পরের পাঁচটি দেশ হলোÑ ফ্রান্স, সুইডেন, ইরান, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয় করোনার প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে এসব দেশে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেই। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের করোনা ট্র্যাকিং অ্যাপের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য-উপাত্তে এ প্রতিবেদন তৈরি করে গার্ডিয়ান। এতে দেখা গেছে লকডাউন শিথিল করার পর ৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশসহ ২১টি দেশেই সংক্রমণ বেড়েছে।
এরই মধ্যে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ দিয়েছে আরেকটি মন খারাপ করা পূর্বাভাস। করোনা-দুর্যোগে চিকিৎসা সংকটে আগামী ছয় মাসেই মারা যেতে পারে বাংলাদেশের ২৮ হাজার শিশু। জন হপকিনস ব্লু মবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষণার বরাত দিয়ে ইউনিসেফ জানিয়েছে, করোনা মহামারির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত ৪ লাখ ৫৯ হাজার মা ও শিশুর জীবন হুমকিতে। আর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বিঘ্নের পাশাপাশি করোনা-দুর্যোগে শিশুদের নিয়মিত টিকা দেয়া যাচ্ছে না। এতে স্বাভাবিকভাবেই শিশুমৃত্যুর হার বাড়বে।

বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির বেহাল দশার পরিষ্কার চিত্র দিয়ে গেছে চীনের ১০ সদস্যের করোনা বিশেষজ্ঞ দল। দুই সপ্তাহ তারা বাংলাদেশে থেকে সরেজমিন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন। ২১ জুন ক‚টনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিক্যাবের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে চীনা বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস মোকাবিলার সার্বিক পরিস্থিতিতে হতাশা প্রকাশ করে। তারা করোনা মোকাবিলায় তিনটি গুরুতর খামতির কথা তুলে ধরেন। প্রথমত, এমন ভয়াবহ একটি মহামারির বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ও সাবধানতার অভাব বিস্মিত করেছে তাদের। দ্বিতীয়ত, প্রয়োজনের তুলনায় নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে কম। আর তৃতীয়ত, কার্যকর লকডাউন না থাকায়ও গভীর হতাশা প্রকাশ করে গেছেন তারা। একটি বিষয়ে শুধু তারা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আমাদের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রশংসনীয় কাজ করে যাচ্ছেন। করোনা মহামারি মোকাবিলায় তাদের পরামর্শ বৈজ্ঞানিক উপায়ে কঠোর লকডাউনসহ প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নিতে হবে।

চীনা বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশের করোনা মোকাবিলা কার্যক্রমে ব্যর্থতার একেবারে মূল জায়গাটাতেই আঙুল তুলেছে। দীর্ঘ দুই মাস সাধারণ ছুটি দিয়ে একটা ঢিলেঢালা লকডাউনে ছিল গোটা দেশ। যার ফলে দেশের অর্থনীতিসহ মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও করোনা সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। তারপর সবকিছু খুলে দেয়া হলো। এতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ আর মৃত্যু। পরবর্তী সময়ে জোনভিত্তিক লকডাউনের কথা বলা হলো। প্রায় মাস পার হতে চলল এ সময়ে রাজধানীতে শুধু পূর্ব রাজাবাজার আর দেশের ১৮ জেলায় বেশ কিছু এলাকা রেড জোন ঘোষণা করে লকডাউন কার্যকরের চেষ্টা চলছে। এর মধ্যেও যশোরসহ অনেক জায়গায় লকডাউন ও স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না বলে খবর এসেছে গণমাধ্যমে। রাজধানীর ৪৫টি এলাকা রেড জোন চিহ্নিত করার কথা বলা হলেও পূর্ব রাজাবাজারের পর শুধু ওয়ারীতে কার্যকরের প্রস্তুতির খবর রয়েছে। আর কোথায়, কখন রেড জোন কার্যকর হবে তার কোনো তথ্য নেই কারো কাছে। বাংলাদেশ করোনা মোকাবিলায় যথেষ্ট ভুল করেছে অতীতে। তার মাসুল এখন দিতে হচ্ছে। আর সময় নষ্ট করার সময় নেই আমাদের হাতে। যা করার দ্রুত করতে হবে।

এত খারাপ খবরের মধ্যে একটা আশার কথা দিয়ে শেষ করা যাক। ২২ জুন চীনা মেডিকেল টিম বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে বিদায় সংবর্ধনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বন্ধুদেশ চীনের কাছে একটা বড় আবদার করেন। তা হলো চীনে টিকা আবিষ্কৃত হলে সেটা যেন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশকে দেয়া হয়। করোনা মোকাবিলায় চীনা বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাৎক্ষণিকভাবে চীনা রাষ্ট্রদূত লি চি মিংও আশ্বাস দিয়েছেন চীনে টিকা তৈরি করলে বাংলাদেশে প্রথমদিকেই তা পাবে। চীনের উদ্ভাবিত টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানব শরীরে প্রয়োগের পর্যায়ে রয়েছে। চীনা টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে হতে পারে। এটা খুবই আশার কথা। তা হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাংলাদেশের করোনা টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে!

লেখক : সাংবাদিক; বার্তা সম্পাদক, দেশ টিভি

ডিসি