করোনা-উত্তর কৃষি : কিছু ভাবনা ও প্রস্তাবনা

আগের সংবাদ

এত প্রাণহানির দায়ভার কে নেবে?

পরের সংবাদ

এই দুঃসময়ে অনেকেই স্বার্থ উদ্ধারে হাঁটছে

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩০, ২০২০ , ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

পৃথিবীব্যাপী করোনা ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত। আমরাও এই আক্রমণের ব্যাপকতায় আছি। জানি না এর চূড়ান্ত বিস্তার আরো ঘটবে কিনা? বিশ্বব্যাপী করোনার ঢেউ আবার যেভাবে ছড়াচ্ছে, তা দেখে আমাদের মধ্যেও বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। গোটা দেশের অর্থনীতি, কর্মচাঞ্চল্য, শিক্ষাব্যবস্থা, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। নিম্নবিত্ত, বিত্তহীন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এখন বলতে গেলে আশাহত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। তবে দেশে এবার ফসল ভালো হওয়ায়, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা ধরনের সহায়তায় প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী এখনো একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়নি, দুর্ভিক্ষেও পড়েনি। তবে সবাই মহাদুশ্চিন্তায় আছে সামনের দিনগুলো নিয়ে। যদি এই অবস্থা আরো কয়েক মাস চলতে থাকে তাহলে কারই বা কী করার আছে? কিন্তু এমন দুঃসময়টি শুধু আমাদের দেশের জন্যই নয়, পৃথিবীর সব দেশের জন্যই কমবেশি অভিন্ন। এমন দুঃসময়ের মধ্যেও আমাদের দেশে কিছুসংখ্যক মানুষ নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত থাকার যেসব ঘটনা জনসমক্ষে দেখা যাচ্ছে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যের।
করোনার এই দুঃসময়ে অসংখ্য মানুষ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। সরকারও নানাভাবে সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক বেশকিছু গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে খাদ্য ও অর্থ সহযোগিতা প্রদান করেছে। দেশে এসব সহযোগিতা প্রদানকারীদের কথা সবাই উচ্চারণ করছে। আমাদের সমাজে মানবতার অবস্থান এখনো যে রয়েছে তার প্রমাণ এবারো আমরা দেখতে পারছি, আশা করছি সামনের দিনগুলোতেও সেটি বজায় থাকবে। কিন্তু যে বিষয়টি আমাদের সবাইকেই অবাক এবং হতবাক করছে তা হচ্ছে, এই সমাজেরই বিভিন্ন স্তরে বেশকিছু ছদ্মবেশী মানুষ রয়েছে যারা এই দুঃসময়ে নানা ধরনের প্রতারণা, মিথ্যাচার, ঠকবাজি ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়ার কাজে যুক্ত রয়েছে। কিছুসংখ্যক জনপ্রতিনিধি ত্রাণের অর্থ ও সম্পদ লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছে, দায়িত্ব চ্যুত হয়েছে, কারাগারেও নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এরপরও কেউ কেউ এখনো এই অভিযোগ থেকে দূরে থাকার অবস্থানে যে নেই সেটিও জানা যাচ্ছে অভিযোগে গ্রেপ্তার কিংবা পদচ্যুত হওয়ার খবর থেকে। এসব ব্যক্তিকে জনপ্রতিনিধি নামে অভিহিত করাই যেন শুভনীয় নয়। আবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় নকল ও ভেজাল ওষুধ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্কসহ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার জন্য যেসব দ্রব্যসামগ্রী মানুষের জীবন বাঁচানো ও সুরক্ষা দেয়ার জন্য অতীব জরুরি সেসব সামগ্রী বাজারে নকল ও ভেজালে সয়লাভ হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের মাধ্যমেই দেশের জনসাধারণ জানতে পেরেছে এসব পণ্য সামগ্রীর নকল ও ভেজাল উৎপাদন, সরবরাহ, বেচাকেনা দেদার চলছে। যারা এই অপকর্মটি করছে তারা জেনেশুনেই করছে। তারা বৈধ উপায়ে ব্যবসা বা উৎপাদন করার যদি উদ্যোগ নিত তাহলে মানুষ উপকৃত হতো। কিন্তু তারা ভেজাল ও নকল উৎপাদনের পথেই হাঁটলেন। এর ফলে করোনা ভাইরাসে আরো বেশি মানুষ সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে। ঢাকার রাস্তায় ভেজাল পিপিইর মতো পোশাক যত্রতত্র বিক্রি করা হচ্ছে এটি ভাবতেই অবাক হতে হয়। র‌্যাব এরই মধ্যে ঢাকায় অভিযান চালিয়ে বেশকিছু নকল কারখানা এবং বেচাকেনার জায়গায় অনেককে আটক করেছে, জরিমানাও করা হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে যারা এই অপকর্মগুলো করছে তারা কোন বিবেচনা থেকে করোনা ভাইরাসের এমন সংক্রমণকালে মানুষের জীবন সুরক্ষার দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে এমন তুঘলকি কাণ্ড করবে? তাদের কি সামান্যতম বিবেক নেই? অর্থ উপার্জনের জন্য দেশের বৈধ পথ রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে একটা বিরাটসংখ্যক মানুষ বৈধ পথে না গিয়ে অবৈধ উপায়ে মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতেই যেন বেশি স্বস্তিবোধ করে। তাদের সাহস এবং প্রতারণার মানসিকতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, এমনকি প্রশাসনেরও কোনো কোনো ব্যক্তি। তাদেরই আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে এসব অপরাধী এমন অপরাধ করার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করে, নকল পণ্য বাজারজাত ও বেচাকেনার ব্যবস্থা করে। এটি একটি চক্র যা অতীতেও বিভিন্ন কাজে এবং সময়ে দেখা গেছে। কিন্তু মানুষ আশা করেছিল করোনার এই দুর্যোগে করোনার পণ্য সামগ্রী নিয়ে এমন জীবননাশক ভ‚মিকায় কেউ অবতীর্ণ হবে না। কিন্তু চোরায় না শুনে ধর্মের কাহিনী। এ ধরনের চক্র ছাড়াও আরো অসংখ্য, অবৈধ চক্র এই সময়ও করোনা সংক্রমণের হাত থেকে মানুষকে রক্ষার প্রক্রিয়ার ভেতর ছদ্মবেশে প্রবেশ করেছে। তাদের কেউ কেউ অক্সিজেন সিলিন্ডারের ব্যবসায় মেতে উঠেছে। বাজারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে এরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। আবার কোনো কোনো চক্র ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়িত থাকার নামে নকল মাস্ক, পিপিইসহ জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় সামগ্রীর নকল পণ্য সরবরাহ করে হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে বিপুল অর্থ। বেশকিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যবস্থা নেয়ারও উদ্যোগ নিয়েছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রশাসনের কোনো কোনো ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় এসব অপকর্ম করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দেশে এখন স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে বিভিন্ন হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য জরুরিভিত্তিতে নানা ধরনের পণ্য সামগ্রী, যন্ত্রপাতি, কিট ওষুধপত্র, অক্সিজেন সামগ্রী সরবরাহ চলছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে বিভিন্ন দালাল ও প্রতারক চক্র, অসাধু ব্যবসায়ী, ঠিকাদার এমনকি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীও যারা এখান থেকে হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে টাকা-পয়সা। দেশে ওষুধ নিয়েও চলছে নানা ধরনের কারসাজি। ঢাকায় মিটফোর্ড, চট্টগ্রামের হাজারী গলিসহ দেশের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে ওষুধ নিয়ে দোকানিদের কারসাজি চড়ামূল্যে ওষুধ বিক্রির নানা অভিযোগ ভুক্তভোগীদের প্রতিদিনের সঙ্গী। হাসপাতালের চারপাশে দালাল চক্র অর্থের বিনিময়ে সেবাদানের নানা ফন্দিজালে মানুষকে আটকে ফেলার চেষ্টা করছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে বেশিরভাগই করোনা সেবাদানে অসম্মতি জানিয়েছে। অল্পসংখ্যক বেসরকারি হাসপাতাল করোনা সেবায় সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানবসেবায় এখন পর্যন্ত নিজেদের উৎসর্গ করে চলছে। জাতি এ ক’টি হাসপাতালকে বিশেষভাবে স্মরণ রাখবে। তবে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল করোনা সেবার নামে বিপুল অর্থ উপার্জনে নেমেছে। তাদের সম্পর্কে এরই মধ্যে গণমাধ্যমে কথা উঠেছে। কিন্তু তাদের কোনো ধরনের সম্বিৎ ফিরে আসার খবর আমরা জানি না। তারা লাখ লাখ টাকার ব্যবসা এই সুযোগে প্রতি রোগী থেকে করে নিচ্ছে। ইতিহাস তাদের কতটা ক্ষমা করবে জানি না। তবে দেশের করোনা আক্রান্ত মানুষ ওইসব হাসপাতালের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস এরই মধ্যে ফেলতে শুরু করেছে। করোনা হাসপাতাল ছাড়াও বেশকিছু এজেন্সি নকল ও ভুয়া সার্টিফিকেটদানের মতো কাজে নেমে পড়েছে। এরা করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট দিচ্ছে। এসব সার্টিফিকেট নিয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত আরেকটি চক্র বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। এর সঙ্গে এজেন্সি ছাড়াও প্রশাসনের কেউ কেউ জড়িত আছে কিনা আমরা জানি না। তবে কোনো নেগেটিভ সার্টিফিকেটদানের বিষয়টি বিদেশে বাংলাদেশের মানসম্মান কতটা ক্ষুণ্ণ করছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে বিদেশে অনেকেই এই সার্টিফিকেট নিয়ে প্রবেশের পর অন্যদের চাকরির ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে এটি সেখানকার বাঙালিরা এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছে।
বাজারে পণ্য সামগ্রী নিয়ে সিন্ডিকেট চলছে। চালের বাজার এবার স্বাভাবিক থাকারই কথা ছিল। কিন্তু চাতাল, আড়তদার ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে কেজিপ্রতি কয়েক টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজারে অন্যান্য নিত্যপণ্য সামগ্রীতেও মাঝেমধ্যে বেসামাল অবস্থা দেখা দেয়। সবকিছুতেই আসলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার মনোবৃত্তি। বাঙালি বোধহয় টাকা এবং বিত্তকে খুব বেশি চিনে ফেলেছে। এই চেনা থেকে নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ, মানবিকতা ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। সে কারণেই তাড়া ওঁৎ পেতে থাকে কখন সুযোগ আসবে। যখনই জাতীয় জীবনে যে কোনো উৎসব আসে তখনই এর ‘সদ্ব্যবহার’ করতে সবাই যে যার মতো করে মাঠে নামে। আবার দুর্যোগ এলেও তাদের টাকা উপার্জন চাই-ই চাই। অধিক টাকা না হলে যেন তাদের শান্তি নেই। এই অশান্তি থেকেই অনেক মানুষ এই সমাজে এত বেশি অর্থবিত্ত করে ফেলেছে, যা তার সাত জনমেও ভোগ করে শেষ করার নয়। অথচ মানুষের তো বেঁচে থাকার জন্য এত অর্থ ও বিত্তের প্রয়োজন নেই। একজন মানুষ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকার মতো অর্থবিত্ত হলেই যথেষ্ট। সেই অর্থবিত্ত সৎভাবে আয়-উপার্জন করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের সমাজে এই শিক্ষার বড়ই ঘাটতি। সে কারণেই করোনার এই দুর্যোগে মানবতার পক্ষে যখন সবারই হাতে হাত লাগিয়ে কাজ করা উচিত ছিল তখন সর্বক্ষেত্রে স্বার্থান্বেষীরা অবৈধ অর্থ উপার্জনে এমন বেপরোয়া আচরণ করতে সাহস পাচ্ছে। এদের শাস্তি অবশ্যই হতে হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি