এসব স্যানিটাইজারে বিন্দুমাত্র স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপাদান নেই

আগের সংবাদ

সংকটে গ্রামীণ অর্থনীতি

পরের সংবাদ

চ্যালেঞ্জের মুখে এসডিজি

প্রকাশিত: জুন ২৬, ২০২০ , ৯:০৯ পূর্বাহ্ণ আপডেট: জুন ২৬, ২০২০ , ১০:০২ পূর্বাহ্ণ

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। ইতোমধ্যে পার হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার চার অর্থবছর। দারিদ্র্যের হার শূন্যে নামানো, ক্ষুধামুক্ত করা, সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ-জ্বালানি সুবিধা, বৈষম্য কমানো, শিক্ষা-স্বাস্থ্যের গুণগত মান নিশ্চিতে সদস্য রাষ্ট্রের প্রতি ২০১৫ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল জাতিসংঘ। কিন্তু সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাসের সংকট মোকাবিলায় বিপর্যস্ত বিশ্ব নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নেও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এমন আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো আরো বেশি চ্যালেঞ্জে পড়বে। করোনার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হলে জাতিসংঘের উচিত হবে লক্ষ্য অর্জনে সময় বাড়ানো এবং দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি সহযোগিতার অংশীদারত্ব বাড়ানো।

বাংলাদেশে তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে এসডিজির বাস্তবায়নের কাজ চলছে যা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগসহ ৪৯টি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ সরাসরি তদারকি করছে। এদিকে জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সল্যুশন্স নেটওয়ার্কের এসডিজি সূচক এবং ড্যাশবোর্ডস রিপোর্ট ২০১৮ অনুযায়ী, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম। স্কোর ৫৯ দশমিক ৩। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ নেপাল, ভুটানও র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ওই রিপোর্টে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৮টিতেই ‘লাল কার্ড’ পেয়েছিল বাংলাদেশ। তবে সরকারপক্ষের দাবি, ২০১৯ সাল থেকে এসডিজি বাস্তবায়নের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। আর করোনা পরিস্থিতিতে এসডিজি বাস্তবায়ন এখন বাধার সম্মুখীন। চলতি জুনে এসডিজি নিয়ে ভলান্টারি ন্যাশনাল রিভিউয়ের (ভিএনআর) প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে এখনো এক দশক বাকি। কাউকে পেছনে না ফেলে সবার জন্য সমান উন্নয়নে বিশ্বাসী আমরা সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছি। জিডিপি হার বাড়ানো, মাথাপিছু আয় বাড়ানো, দারিদ্র্য কমানো ও আর্থ-সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের মানদণ্ড পূরণ করে আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ। কোভিড-১৯ মহামারিতে আমরা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে জোরদার করেছি এবং জরুরি স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি। কোভিড-১৯ এর আর্থ-সামাজিক প্রভাব নিঃসন্দেহে ২০৩০ এর লক্ষ্য অর্জনে বাধা দেবে। এসডিজি অর্জনে আমাদের আরো সম্মিলিত পদক্ষেপের প্রয়োজন। অংশীদারত্বের দায়িত্বে আরো সক্রিয় হয়ে উঠে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে দারিদ্র্য বিমোচন ও এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সদস্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও অন্যান্য অংশীজনদের পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরো সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে জাতিসংঘের সদ্যগঠিত দারিদ্র্য নির্মূল জোটে যোগ দিয়ে কোভিড-১৯ মহামারি থেকে টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য জাতিসংঘের সদস্য দেশসমূহের পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরো সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। গতকাল বৃহস্পতিবার জোটের ভার্চুয়াল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্যে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা বলেন, কোভিড-১৯ বিশ্বব্যাপী বিপুল জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেবে। এই মহামারির ফলে এসডিজির বাস্তবায়ন দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হবে। কারণ জরুরি স্বাস্থ্য সংকট মেটানোর প্রয়োজনে সম্পদকে এখাতেই প্রবাহিত করতে হচ্ছে। বহুপক্ষীয় পর্যায়ে এবং উন্নয়ন অংশীজনদের মাঝে শক্তিশালী অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে দারিদ্র্য নির্মূলের এই জোট হতে পারে কার্যকরী একটি প্ল্যাটফর্ম।
করোনা ভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতির মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনার পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে কমিয়ে আনা সম্ভব না হলে এসডিজির সফলতা হোঁচট খাবে। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, এসডিজি অর্জনের জন্য আরো সময় রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনসহ এসডিজির অনেকগুলো অভীষ্ট পূরণে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান করোনা পরিস্থিতি এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে বিশ^কেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। করোনা দীর্ঘমেয়াদি না হলে আমরা হয়তো অনেকগুলো লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। কিন্তু করোনা দীর্ঘমেয়াদি হলে এসডিজি পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘকেই নতুন করে ভাবতে হবে। হয় তারা লক্ষ্য অর্জনে সময় বাড়াবে; নতুবা দরিদ্র দেশগুলোর প্রতি সহযোগিতার অংশীদারত্ব বাড়াবে। আমার মনে হয়, এসডিজি নিয়ে আমাদের এখুনি না ভেবে বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা প্রয়োজন।

এদিকে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদন মতে, এসডিজি অর্জনে সঠিক পথে নেই বাংলাদেশ। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত নেই। বৈষম্য দূরীকরণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের এখনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তবে সবার জন্য শিক্ষা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে প্রাথমিকভাবে সাফল্য এসেছে। এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি মনে করছে, নীতিগত অনেক সংস্কার প্রয়োজন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এ লক্ষ্যগুলো অর্জনে বিদ্যমান নীতিতে ব্যাপক সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।

সব স্তরে সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ব্যাপারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, এসডিজির অন্যতম অভীষ্ঠ সবার জন্য ন্যায়বিচার, সব স্তরে কার্যকর, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এটি বাংলাদেশের জন্য সবসময়ই কঠিন ছিল। করোনা ভাইরাসজনিত দুর্যোগকালে এক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভ‚ত চ্যালেঞ্জ ব্যাপক ও গভীরতর হয়েছে এবং হচ্ছে। যা প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান। যদি চলমান প্রবণতা ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিকতায় পরিণত হয় তবে এই অভীষ্ট ও তার লক্ষ্য অর্জন কাগুজে দলিল হিসেবেই রয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে এসডিজির জন্য সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতে যা প্রয়োজন এর কিছুই বাংলাদেশে নেই।
জানতে চাইলে প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও আমাদের দেশে গত ১২/১৩ বছরে বরাদ্দ ১ শতাংশেরও কম। দুঃখজনক তাও বাস্তবায়ন হয় না। দেশের স্বাস্থ্য খাত চিকিৎসা কার্যক্রমের নামান্তর; অথচ চিকিৎসা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি শাখা মাত্র। দেশের স্বাস্থ্য খাত যে অন্ধকারে রয়েছে ওই অন্ধকারেই থেকে যাবে। ন্যূনতম উন্নতির কোনো লক্ষণ দেখছি না।

তবে এসডিজি চলমান প্রকল্প মন্তব্য করে সরকারপক্ষ বলছে, ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিছু ২০২০ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এগুলোর সময় বাড়াতে হবে। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান ভোরের কাগজকে বলেন, রূপকল্প -২০৪১, এসডিজির পাশাপাশি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো নিয়েই বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। পাশাপাশি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নেবে বাংলাদেশ। সেইসঙ্গে সুশাসন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, জঙ্গিবাদ দমন ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা হবে।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়