পুরান ঢাকায় কারখানায় আগুন

আগের সংবাদ

নৈশপ্রহরীকে খুন, পুলিশের গুলিতে ৩ ডাকাত নিহত

পরের সংবাদ

সমমর্মিতার অনন্য নজির

স্বপন হাই’র পরিবার পেল ১৪২০০ ডলার

শামীম আহমেদ, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২৫, ২০২০ , ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

২০১৪ সাল। নিউইয়র্কে বেড়াতে গিয়েছিলেন দৈনিক মানবজমিনের সিনিয়র ফটোসাংবাদিক এম এ হাই স্বপন। ভালোই কাটছিলো সময়টা। হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। ব্যথা বাড়তে তাকে। নেয়া হয় হাসপাতালে। ডাক্তার জানান হার্ট অ্যাটাক হয়েছে তার। দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অপারেশন লাগবে। পরিবারের সদস্যরা সম্মতি দেন। অপারেশন হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন।

খুব বেশিদিন গড়ায়নি। আবারও অসুস্থবোধ করেন এই পেশাদার সাংবাদিক। ডাক্তারি পরীক্ষায় জানা যায়, তার দু’টি কিডনিই নষ্ট। হঠাৎ যেন আকাশ ভেঙে পড়ে মাথায়। চোখে মুখে অন্ধকার নেমে আসে তার। দেশে ফিরে যাবেন তারও জো নেই। ডাক্তার বলেছেন লম্বা জার্নি করা যাবে না। এতে মারাত্মক ঝুঁকি আছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশে হার্ট এবং কিডনি দু’টো চিকিৎসই ব্যয়বহুল। তাই অনেকটা উপায়ান্তহীন স্বপন ইচ্ছা না থাকলেও বনে যান নিউইয়র্কার। কিন্তু বাসায় বসে সময় কাটে না তার। তাই আবারও কাঁধে তুলে নেন ক্যামেরা। যোগ দেন নিউইয়র্কের জনপ্রিয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। ফটোসাংবাদিক স্বপনের সময় কাটতে শুরু করে পেশাগত ব্যস্ততায়।

কর্মব্যস্ত এই সাংবাদিকদের প্রাণচাঞ্চল্য থমকে যায় আবার। কিডনি রোগ বেড়ে যায়। ঠিক ভেবে পাচ্ছিলেন না কী করবেন। জীবন কি তাহলে এখানেই থেমে যাবে? কিন্তু বাঁচতে যে বড় ইচ্ছে হয়। আকুতি জানান নিউইয়র্কের সাংবাদিক সমাজের কাছে। খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারেন আমেরিকাতে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্ভব নয়। কিডনি দাতা পাওয়া যেমন মুশকিল তেমনি ব্যয়ও নাগালের বাইরে। তাই ভারতই ভরসা। জানেত পারেন ভারতের ভেলরে গেলে ৩০/৪০ লাখ টাকায় প্রতিস্থাপন করা যাবে কিডনি।

নিউইয়র্কের সাংবাদিকরা অভয় দেন। স্বপনকে তারা আশ্বাস দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে তারা অন্যদের কাছে হাত পাতবেন। দ্বারে দ্বারে যাবেন। সহকর্মী ও একজন মৃত্যু পথযাত্রীর জীবন বাঁচাতে অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে লজ্জা কিসের। এরপর যা হলো তা জানা যাক আমেরিকা বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের বরাতে।

নিউইয়র্কের মিডিয়ায় কর্মরত ওই সাংবাদিক সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানান হয়, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে গত ৩০ মার্চ মারা যান বাংলাদেশ ও প্রবাসের জনপ্রিয় ফটো সাংবাদিক এবং আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য এ. হাই. স্বপন (স্বপন হাই)। সেই স্বপন হাইয়ের পরিবারকে নিউইয়র্কের সাংবাদিক সমাজ ১৪২০০ ডলার দিয়েছে। স্বপন হাই হার্ট ও কিডনি রোগেও আক্রান্ত ছিলেন। নিয়মিত ডায়ালিসিস করতেন। তাঁর কিডনি প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে নিউইয়র্কের সাংবাদিক সমাজ গত ৬ মার্চ এক সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। উডসাইডের কুইন্স প্যালেসে অনুষ্ঠিত সংগীতানুষ্ঠানে ১০০ ডলার অনুদান মূল্যের টিকিট বিক্রয়ের চেষ্টা করেছিলেন সাংবাদিকরা।

অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী বেবী নাজনিন, চন্দন চৌধুরী, শাহ মাহবুব ও কৃষ্ণা তিথি পারিশ্রমিক ছাড়া সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। বৈরী আবহাওয়া এবং করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল একেবারে কম। এতেও দমে যাননি সাংবাদিকরা। তারা ছুটে গিয়েছেন বিত্তশালী ও হৃদয়বান ব্যবসায়ীদের কাছে। উত্তোলন করেছেন অনুদান।

স্বপন গত ২৮ মার্চ বাংলাদেশে ফিরে যাবার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু এর আগে তিনি ফের অসুস্থ হয়ে পড়েন। জ্বর নিয়ে নিউইয়র্কের কুইন্স হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার রক্ত পরীক্ষায় কোভিড-১৯ রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ঐ হাসপাতালে স্বপন ৩০ মার্চ মারা যান। তার মরদেহ বাংলাদেশ সোসাইটির সহযোগিতায় নিউজার্সির এক কবরস্থানে দাফন করা হয়। স্বপনের মৃত্যু হলেও অনুদান সংগ্রহ অব্যাহত থাকে।

বুধবার (২৪ জুন) অবধি সাংবাদিক সমাজ স্বপনের পরিবারের জন্য ১৪ হাজার ২শ’ ডলার উত্তোলন করেছেন এবং তা বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) তার পরিবারের কাছে পাঠানো হবে। উত্তোলন করা অর্থের মধ্যে ৫শ’ ডলার আগে স্বপনের স্ত্রী’র একাউন্টে পাঠানো হয়েছিল। এই অর্থ উত্তোলনের লক্ষ্যে গঠিত কমিটি’র সমন্বয়ক ছিলেন আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি দর্পণ কবীর।

এদিকে সংগঠনের কার্যকরী সদস্য স্বপন হাইয়ের জন্য নিউইয়র্ক সাংবাদিক সমাজসহ যারা সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছেন তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি দর্পণ কবীর ও সাধারণ সম্পাদক শাহাব উদ্দিন সাগর। তাঁরা বলেন, এ কৃতিত্ব নিউইয়র্কের সাংবাদিক সমাজের। স্বপনের জন্য নিউইয়র্কের সাংবাদিক সমাজ ও কমিউনিটির লোকজন অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখিয়েছেন যা ভোলার নয়, আমরা তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

উল্লেখ্য, কবি কাজী জহিরুল ইসলামও তার জন্মদিনের দিন উপহারের পরিবর্তে স্বপনের জন্য অর্থ সহায়তা নিয়ে তার পরিবারের কাছে ২ হাজার ডলার দিয়েছিলেন।

সাংবাদিক স্বপন ঢাকায় দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা ও দৈনিক মানবজমিনে কাজ করেছেন। তিনি ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। এখানে অসুস্থ হলে হাসপাতালে তাঁর ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি (নিজ ভাইয়ের বাসায়) জ্যামাইকাতে বাস করছিলেন। তিনি সর্বশেষ সাপ্তাহিক আজকাল পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া প্রথম আলো উত্তরামেরিকা এবং টিবিএন-২৪ টিভিতেও কাজ করেছেন স্বপন হাই। মৃত্যুকালে স্বপন হাই স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ অসংখ্য আত্মীয় স্বজন রেখে গেছেন।

এনএম