চলে গেলেন ‘মেমসাহেব’র স্রষ্টা

আগের সংবাদ

যিনি সকলের স্যার

পরের সংবাদ

লকডাউন ড্রামা

স. ম. শামসুল আলম

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২৫, ২০২০ , ৬:২৫ অপরাহ্ণ

: তোমার বাবা কেন বাসায় এলেন?
: এটা কী ধরনের কথা? আমার বাবা কি তোমারও বাবা হয় না?
: আমার বাবা হলে বিবেকবান হতেন। এই লকডাউনের মধ্যে বাসায় আসতেন না।
: তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছো, আমার বাবার বিবেক নেই?
: সরাসরি বলিনি। তবে ইঙ্গিত দিয়েছি।
স্বামী-স্ত্রীর চাপা-ঝগড়া চলছে। গলার আওয়াজ বাড়ানো যাচ্ছে না। কারণ ড্রইংরুমেই বসে আছেন মনিরুল হাসানের শ^শুর। অর্থাৎ মেহেরুনের বাবা। তিনি শুনতে পেলে কষ্ট পাবেন। এটা দুজনেই বোঝে। তবুও চাপাস্বরে ঝগড়া করে। মনিরুলের যুক্তি হচ্ছে, এই লকডাউনের মধ্যে ঘর থেকে বের হওয়া ঠিক নয়। তাছাড়া পথে কার সাথে ঘেঁষা লেগেছে, কার হ্যাচ্চো শরীরে লেগেছে তার ঠিক নেই। করোনা ভাইরাস নিয়ে সবাই শঙ্কিত। এখন একে অপরের বাসায় কেন যাবে? তাছাড়া এখানে আইসোলেশন সম্ভব নয়। হোম কোয়ারেন্টাইনেরও ব্যবস্থা নেই। মেহেরুনের যুক্তি হলো, আত্মীয়-স্বজন একে অপরকে না দেখে থাকতে পারে না। মেয়ে-জামাই আর নাতি-নাতনিকে দেখতে বাবা আসতেই পারেন। তা নিয়ে এত হইচই কী দরকার?
সবার কথাই যুক্তিসঙ্গত। তারপরও অনেক কথা বাকি থেকে যায়। সেই বাকি কথা নিয়ে বেধে যায় আরো দ্ব›দ্ব। মনিরুল বলল, তোমার বাবা এসেছেন, সেটাও মেনে নিলাম। কিন্তু ছেলেমেয়ে দুটি তার কোলে উঠল কেন? যদি একটা কিছু হয়ে যায়? করোনায় কত লোক মারা যাচ্ছে তার হিসাব আছে?
মেহেরুন বলল, আশ্চর্য! নাতি-নাতনি নানার কোলে উঠবে না, এটা কেমন কথা? অফিসের কাজকর্ম ফেলে, বাসায় বসে থেকে তোমার মাথাটাই গেছে।
দিদারুল আর অবনিতা হইচই করতে করতে ঘরে ঢুকল। দিদার বলল, দেখ না আব্বু, আমার আঁকা ছবি নিয়ে অবনি ছিঁড়ে ফেলছে।
অবনি বলল, ওর ছবি কিছুই হয় না আব্বু। আকাশ এঁকে সেখানে নৌকা ভাসায়। নৌকা কি আকাশে ভাসতে পারে? সাগর এঁকে সেখানে বিমান চালায়। বিমান কি সাগর দিয়ে চলতে পারে?
ছেলেমেয়ের কথা কানে ঢুকল না মনিরুলের। এটাই স্বাভাবিক। ঝগড়ারত থাকলে সেখানে তৃতীয়পক্ষের আগমন ভালো লাগে না। মেজাজ আরো খিটমিটে হয়। তার ইচ্ছে হলো, দুজনকে দুটো থাপ্পড় দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেন নানার কোলে উঠেছো? কিন্তু সে রাগ সামলে জিজ্ঞেস করল, ঝগড়া করছো কেন? তোমাদের পড়ালেখা নেই?
দিদার বলল, একা একা কত পড়ব?
অবনি বলল, স্কুল তো বন্ধ।
মনিরুল বলল, কেন, টিভিতে বা অনলাইনে পড়াচ্ছে না এখন?
অবনি হেসে বলল, ওখানে তো ভুল শেখায়। তার চেয়ে আমরাই ভালো পারি।
দিদারও হেসে বলল, ওনারা যোগ অঙ্কও পারে না আব্বু। টিচার ভাইরাল হয়ে গেছেন ভুল অঙ্ক করে।
মেহেরুন বলল, যাও তোমরা, তোমাদের ঘরে যাও। পাকা পাকা কথা বলতে শিখেছো। যাও, পড়ালেখা করো গিয়ে। ভাইরাল বোঝো, আর সোশ্যাল ডিসট্যান্স বোঝো না?
কথাটা মেহেরুন বলল স্বামীর প্রতি রাগ থেকে। মনিরুল সেটা বুঝতে পারলেও ছেলেমেয়ে দুটি বুঝল না। দিদার বলল, সোশ্যাল ডিসট্যান্স বুঝি আম্মু।
: এত বোঝো যদি, নানাভাইয়ের কোলে গিয়ে বসলে কেন?
: নানাভাই আমাদের ফ্যামিলির লোক না?
: সেটা তোর বাবাকে বুঝা। উনি ফ্যামিলির লোক নাকি বাইরের লোক?
মনিরুল একটু ঠাণ্ডা মেজাজে বলল, উনি ঘরের লোক, তাই মাস্ক খুলে ঘরে ঢুকেছেন। হয়েছে? যাও, এবার তুমিও তোমার বাবার কোলে উঠে বসে থাকো গিয়ে।
ছ্যানাৎ করে জ্বলে উঠল মেহেরুন। ছেলেমেয়ে দুটি হেসে উঠল। ওরা সামনে থাকায় যুৎসই কথা বলতে পারল না। ছেলেমেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল, যাও তোমরা নিজের ঘরে যাও।
দিদার বলল, তোমার মেয়েকে বলে দাও যেন আমার আঁকা ছবি না ছেঁড়ে।
অবনি বলল, তোমার ছেলেকে বলে দাও যেন আমার রঙপেন্সিল দিয়ে না আঁকে।
মনিরুল বলল, একটি কথাও হবে না। কেউ ঝগড়া করবে না। যাও।
দিদারুল ও অবনি ঘর থেকে বের হয়ে নিজেদের ঘরে গেল। মেহেরুন বলল, বাচ্চাদের বললে ঝগড়া না করতে। নিজে তো ঝগড়া ছাড়া থাকতে পারো না।
: আবার কথা বাড়াচ্ছো কেন? বললাম না, বাবার কোলে গিয়ে বসে থাকো। কোভিড-১৯ খুব খুশি হবে।
: ঠিক আছে। আমার বাবাকে নিয়ে তোমার যখন এত অসুবিধা। তাকে এখনই বিদায় করে দিচ্ছি। ঢোকার সময় বাবার হাত স্যানিটাইজার দিয়ে ধুইয়ে নিলাম। সাবান দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিতে বললাম। নিজের বাবাকে নিয়ে কেউ এমন সন্দেহমূলক আচরণ করে? তবুও আমি তোমার কথা ভেবে এসব করলাম। ছেলেমেয়ের কথা ভেবে করলাম।
কেঁদে ফেলল মেহেরুন। করোনা যেন একে অপরকে পর করে দিচ্ছে। মনিরুল বলল, পারো তো শুধু ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে। সিচুয়েশন বুঝার চেষ্টা করো না। ২৫ মার্চ যখন লকডাউন আর সাধারণ ছুটির ঘোষণা শুনে বাসায় ঢুকি, তখন সারাবিশ্বে মৃতের সংখ্যা ছিল সাড়ে তেরো হাজার। আর আজ ২১ জুন সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। বিষয়টা ভাবতে হবে সবাইকে।
ঠিক তখন কলিং বেলের আওয়াজ শোনা গেল। এ সময় আবার কে এলো? মেহেরুন দরজা খুলতে গেল। পেছন পেছন মনিরুল। দরজা খুলতেই উচ্ছ¡সিত জাহাঙ্গীর বাসায় ঢুকল। জাহাঙ্গীর হলো মনিরুলের ছোট ভাই। ডাক্তার। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেছে। মিটফোর্ড হাসপাতালে প্র্যাকটিস করছে, ওর শিক্ষক রফিক উদ্দিনের অধীনে। জাহাঙ্গীর খুব হাসিখুশি এবং ছটফটে প্রকৃতির মানুষ। ওকে দেখেই মনিরুল জিজ্ঞেস করল, তুই হঠাৎ কী মনে করে এলি?
ভাইয়ের কথার জবাব না দিয়ে জাহাঙ্গীর বলল, ভাবি, এগুলো ধরো তো। আনন্দের সংবাদ আছে, পরে বলছি। দুপুরে ভালোমন্দ কিছু রান্না করো। খাবার খেয়ে যাব।
জাহাঙ্গীর ওর হাতের প্যাকেট দুটো মেহেরুনের দিকে এগিয়ে দেয়। মেহেরুন ধরতে ইতস্তত বোধ করে। তখন জাহাঙ্গীর বলল, ও হো- করোনার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ঠিক আছে আমি নিজেই রাখছি। তবে ভয়ের কিছু নেই ভাবি। মিষ্টি আনতে চেয়েছিলাম-। দোকান কোথায় খোলা আছে না আছে, কে খুঁজবে? তাই আম আর লিচু নিয়ে এলাম। এই লকডাউনের মধ্যে এগুলো যে ঢাকায় এসেছে, কম কী? ফরমালিন আছে কি নেই বলতে পারি না।
জাহাঙ্গীর প্যাকেট দুটো নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখল। ততক্ষণে দিদার আর অবনি ছুটে এসেছে। কাকু কাকু বলে ডাকতে ডাকতে। জাহাঙ্গীর ওদের বলল, না, না কোলে নেয়া যাবে না। দেখছো না মাস্ক পরা, হ্যান্ড গ্লাভস পরা, পিপিই পরা? খবরদার কাছে আসবে না। দূর থেকে কথা বলো। আর তোমার আম্মুকে বলো, ফলগুলো স্প্রে করে ধুয়ে তারপর যেন খেতে দেয়।
দিদার ও অবনির উৎসাহে ভাটা পড়ে। ওরা একটু দূরে সরে যায়। জাহাঙ্গীর ড্রইংরুমে ঢুকতেই দেখে মেহেরুনের বাবা বসে আছেন। সালাম জানিয়ে বলল, তাওই কেমন আছেন আপনি?
: আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?
তিনি হাত বাড়িয়ে দিলে জাহাঙ্গীর বলল, হাত মেলানো যাবে না তাওই, কোলাকুলির তো প্রশ্নই ওঠে না।
হাত সরিয়ে নিয়ে তাওই বললেন, কী করব, মনে থাকে না বাবা। অভ্যাস হয়ে গেছে।
: অভ্যাস বদলাতে হবে, কিছু করার নেই।
জাহাঙ্গীর একটু দূরে গিয়ে সোফায় বসল। মনিরুল বলল, তুই কেন হঠাৎ করে বাসায় এলি তা তো বললি না? একটা ফোন করতে পারতি?
: সারপ্রাইজ দেব বলে এসেছি ভাইয়া।
: কী সারপ্রাইজ?
: আমি এখন রফিক স্যারের আন্ডারে নেই। মহাখালীতে ডিএমডি হাসপাতালে চাকরি হয়েছে। করোনা রোগীদের চিকিৎসা করা। ৯০ হাজার টাকা বেতন। এক সপ্তাহ হলো সেখানে জয়েন করেছি।
: বলিস কী? তুই এখন কোভিডের ভেতরে ঢুকে গেছিস? আর মহাখালী তো রেড জোনে পড়েছে। তুই বেঁচে না থাকলে টাকা দিয়ে কী হবে? আমাকে একবার জানাতে পারতি।
: জানাতেই তো এলাম ভাইয়া।
মনিরুল আর কোনো কথা বলতে পারে না। নিজের ঘরে গিয়ে ঢোকে। পেছন পেছন মেহেরুনও যায়। মেহেরুন বলে, আমার বাবাকে সহ্য করতে পারছিলে না। এবার তোমার ভাইকে সহ্য করছো কীভাবে? সে তো করোনার মধ্য থেকে ডুব দিয়ে এসেছে। এবার ঠেকাও?
: ফোন করে আসতে চাইলে ঠিকই ঠেকাতাম। ঢুকে পড়লে ঠেকাব কীভাবে?
: এবার বোঝো।
: বোঝার কিছু নেই। এই দেখো, তোমাকে একটা জিনিস দেখাচ্ছি।
মনিরুল মোবাইল হাতে নিয়ে একটি ছবি বের করে ম্যাসেঞ্জার থেকে। তার বন্ধু নাজিম সাহেব পাঠিয়েছে। ছবিটি অশ্লীল। ছবিটি দেখে মেহেরুন হেসে ফেলল। করোনাকে কেন্দ্র করে কত আনন্দের খোরাক পেয়েছে মানুষ তার ঠিক নেই। মানুষের জীবনটা তো এমনই- আনন্দ আর কষ্ট পাশাপাশি থাকে।

এসআর