অনিন্দ্য সুন্দর ভাস্কর্যের অপেক্ষায় ইবি

আগের সংবাদ

অ্যাথলেটিকসের সাধারণ সম্পাদক করোনায় আক্রান্ত

পরের সংবাদ

কামাল লোহানী

বাংলাদেশ তাঁর কাছে ঋণী

অনুপম হায়াত

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২৫, ২০২০ , ৬:৪২ অপরাহ্ণ

কতভাবেই না বিকশিত ছিলেন তিনি : নৃত্যশিল্পী, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক, উদীচীর সভাপতি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং সর্বোপরি মানবিকতার কণ্ঠস্বর। আমি সর্বজন শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানীর কথা লিখছি। শ্রদ্ধেয় কামাল লোহানী গত ২০ জুন তিনি প্রয়াত হয়েছেন।

(ক)
স্কুল পাঠ্যবইয়ে তাসাদ্দুক হোসেন লোহানীর গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। বেতারে কণ্ঠস্বর শুনে, চলচ্চিত্রে অভিনয় দেখে, পত্র-পত্রিকায় লেখা পড়ে অভিভ‚ত হয়েছিলাম ফতেহ লোহানীর, পরবর্তীকালে পত্র-পত্রিকায় লেখা পড়ে এবং টেলিভিশনে উপস্থাপনা দেখে উপকৃত হয়েছিলাম ফজলে লোহানীর। লোহানীর পরিবারের বংশ লতিকার আরেক উজ্জ্বল দীপ্তিমান তারকা কামাল লোহানী। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে। ওই সময় আমি খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার-সাংবাদিক-সম্প্রচারক-সাহিত্যিক-অভিনেতা ফতেহ লোহানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে জীবনীগ্রন্থ রচনার জন্য তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম। প্রথম সাক্ষাৎ মুহূর্তেই তিনি আমাকে অভিভ‚ত করেছিলেন আমার সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য করে। সেই থেকে শুরু তাঁর সঙ্গে আমার নান্দনিক আত্মীয়তা। ওই দিনই তিনি তাঁর জাতিবোন খ্যাতিমান কীর্তিমান লেখক-সংগীতশিল্পী হুসনা বানু খানম, দিলারা মেসবাহ ও ভাতিজি সুমনা লোহানীর টেলিফোন নম্বর নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেন। অতঃপর কামাল লোহানীর ভাইয়ের সঙ্গে নানা সূত্রে সম্পর্কের গভীরতা বাড়তেই থাকে।

(খ)
কামাল লোহানীর পরিবার ও বংশলতিকার শেকড় গ্রোথিত আফগানিস্তান, ইরান সীমান্তের কাছাকাছি। অতঃপর মস্কো-লঙ্কা-রেঙ্গুন-কলকাতা-করাচি-ঢাকার রাজনীতি-সাংবাদিকতা-সাহিত্য-মঞ্চ-বেতার-টেলিভিশন-চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে-ছড়িয়ে আছেন এই বংশের লোকজন। লোহানী বংশের লোকজন যেখানে যে ক্ষেত্রেই ছিলেন, অকৃত্রিম সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন- প্রত্যেকেই যেন স্বর্ণখণ্ড। কামাল লোহানীও তাই।
(গ)
কামাল লোহানী ভাইয়ের সৃজনকণ্ঠের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই ১৯৬৭ সালে আউটার স্টেডিয়ামের এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটি ছিল ‘ক্রান্তি’ সাংস্কৃতিকগোষ্ঠী পরিচালিত। এই সংগঠনের মধ্যমণিও ছিলেন লোহানী ভাই। জীবনে প্রথম নৃত্যনাট্য দেখি ‘জ¦লছে আগুন খেতে ও খামারে।’ কী অদ্ভুত চেতনা জাগানিয়া নাম- খেত ও খামারে আগুন জ¦লছে। এসব ছিল বিপ্লবী ও জাগরণমূলক শব্দ-ছন্দ-নৃত্য-সুরের সংরাগে নন্দিত উপস্থাপনা। ওখানে আরেকটি পর্ব ছিল ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে। কৃষক-শ্রমিকের স্বপ্ন-প্রত্যাশা-ঘাম নিষিদ্ধ এসব উপস্থাপনা আমার কাছে ছিল একেবারেই নতুন। পরে জেনেছি ‘ধানের গুচ্ছে রক্ত জমেছে’ লাইনটি প্রখ্যাত সাংবাদিক-রাজনৈতিক কর্মী (পরে টিভি উপস্থাপক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক) ফজলে লোহানীর কবিতা থেকে নেয়া।

(ঘ)
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ ও ফতেহ লোহানীর জীবনী লিখার তথ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ করতে গিয়ে জানতে পারি যে, এফডিসির প্রথম চলচ্চিত্র ফতেহ লোহানী পরিচালিত ‘আসিয়া’ (১৯৫৭-১৯৬০) ছবির নৃত্য দৃশ্যে অংশ নিয়েছিলেন কামাল লোহানী। এ ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ঝর্না বসাক (পরবর্তীকালের প্রখ্যাত নায়িকা শবনম)। তার মানে বিষয়টি দাঁড়াচ্ছে কামাল লোহানী যেমন ১৯৪৭-উত্তর ঢাকা তথা বাংলাদেশের সাংবাদিকতা-নৃত্যের অন্যতম অগ্রগামী সৈনিক তেমন চলচ্চিত্রেরও। জানা নেই আমার, লোহানী ভাই পরে আর কোনো চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন কিনা। আসিয়ার সূত্রে তাঁর কাছে জমা হয়ে আছে সেকালের চলচ্চিত্র জগতের কত অজানা খবর, রোমান্স, বিরহ…।

(ঙ) ১৯৫৫ সালে ‘দৈনিক মিল্লাত’ ও দৈনিক অর্ধ সাপ্তাহিক পাকিস্তান ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকায় শুরু তাঁর সাংবাদিকতা জীবন। পরে কাজ করেছেন আরো কত পত্র-পত্রিকায়। সাংবাদিক হিসেবে কামাল লোহানীর স্বর্ণখচিত অধ্যায় হয়েছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগদান। এই কেন্দ্রের বার্তা বিভাগের অন্যতম বালক ছিলেন তিনি। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সেই বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণে এবং পাকবাহিনীর পরাজয় মুহূর্তের ঘোষণাটি স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন কামাল লোহানী; বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে, পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। আর বিজয়ের সেই গানটি ‘বিজয় নিশান উড়েছে’ তাঁর প্রেরণায় লিখেছিলেন কবি ও গীতিকার শহীদুল ইসলাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সেই ‘শব্দসৈনিক’ কামাল লোহানী পরবর্তীকাল সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন সততার সাথেই।

(চ)
কামাল লোহানী আমাদের সাংবাদিকতা-মুক্তিযুদ্ধ-সংস্কৃতি-মানবতার সাহসী কণ্ঠস্বর, সাহসী সূর্যে বিচ্ছুরিত অম্লান আলো। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশ, জাতি, সমাজ ও বিবেক তাঁর কাছে ঋণী। আমার সমস্ত শ্রদ্ধা নিবেদিত এই কীর্তিমান নক্ষত্রের প্রতি।

এসআর