হালদা থেকে সাত হাজার মিটার ঘেরা জাল জব্দ

আগের সংবাদ

বিএসটিআইকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার নির্দেশ

পরের সংবাদ

বই পাঠ

জোনটানে ও আমাদের যাপিত জীবচিত্র

আশিক বিন রহিম

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২৫, ২০২০ , ৬:০৬ অপরাহ্ণ

শ্যামসন বুড়ন। গল্পের ছৈয়াল। মূলত সমাজ বাস্তবতা সাথে মিথস্ক্রিয়ার সংমিশ্রণে যাপিত জীবনভিত্তিক গল্প লিখেন তিনি। ‘জোনটানে’ এ কথাশিল্পীর প্রথম ছোটগ্রন্থ। বইটি হাতে পেয়ে ধীরেসুস্থে পাঠ, লেখক আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন একটা থেকে আরেকটা গল্পে। এই যে একটা থেকে আরেকটা গল্পে যাত্রা; তাতে এতটুকুন ক্লান্তি ছিল না, ছিল ঘোর, কৌত‚হল আর গল্পের শেষ লাইন অবদি অপেক্ষা, কী হয়। আর কী কী চমক থাকছে শেষাংশে। বইটিতে গ্রন্থিত এগারটির গল্পের একটি থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ আলাদা আর ব্যতিক্রম। প্রতিটি গল্প পাঠে লেখকের মুন্সিয়ানায় আমি কেবল মুগ্ধ হয়নি, রীতিমতো আশ্চর্য হতে লাগলাম। জীবনের নির্যাস ঢেলে আমাদের চারপাশে এতসব বিচিত্র গল্প লিখে যাচ্ছে একেকজন মানুষ, একেকটি গোষ্ঠী-সম্প্রদায়। শ্রেণি কিংবা জাত-পাতের ভিন্নতায় তাদের গল্পগুলো একই রকম অথচ কত আলাদা। নিজের অবস্থানে দাঁড়িয়ে যা আন্দাজ করা সহজ কিন্তু অনুভব করা কখনোই সম্ভব না। কত বিচিত্র আমাদের জীবনকর্ম-কীর্তি। যুদ্ধ-স্বপ্নে আমাদের প্রতিটা জীবন কেমন করে একেকটা গল্প হয়ে আছে- লেখক শ্যামসন বুড়ন তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন।
গ্রন্থটির প্রথম গল্প ‘নায়করাজ রাজ্জাকের পালায়নপর্ব’তে দেখতে পাই রাজ্জাক নামে সর্বহারা এক যুবকে। শ্রমিক-মজুরের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন চোখে তার পালিয়ে বেড়ানোর সংগ্রাম। রাজ্জাক চরিত্রে লেখক তুলে ধরেছেন সমাজের নিপীড়িত মানুষের ওপর শাসকশ্রেণির শোষণকথা। পাশাপাশি এর থেকে উত্তরণের পথও বাতলে দিয়েছেন নানা ভঙ্গিতে।
‘সোনা মুর্মুর ফেস যেখাবে ফেয়ার এন্ড লাভলী হয়ে উঠলো’ গল্পে লেখক এ দেশের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র-সংগ্রাম এঁকেছেন চমৎকার দক্ষতায়। ‘কোকের বোতলের মতো তেল চিকচিকে কালো’ শরীর-মুখের একজন স্যাঁওতাল যুবতীর ভুল স্বপ্নের নৌকোতে পা রাখা, তাদের হাজার বছরের কালো রংকে ফর্সা করার লোভে শহুরে এক বাঙালি যুবকের হাত ধরে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে গিয়ে নিজের দুই পা হারিয়ে পুনরায় সাঁওতাল পল্লীতেই প্রস্থান। এ গল্পে লেখক আমাদের সমাজ বাস্তবতায় কথিত নিম্নজাতের এই মানুষগুলোর জীবনচিত্র আঁকতে গিয়ে এসব জনগোষ্ঠী কী কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, কেন তারা অন্যজাতে কনভার্ট হচ্ছে সে কথাই তুলে ধরেছেন সুনিপুণভাবে।
নিজের স্বভাবসুলভ অভ্যাসে বইটির নামকরণ গল্পটি (জোনটানে) সব শেষে পাঠ করি। এবার গ্রন্থটির প্রচ্ছদচিত্রে শকুন দেখার মতোই চমকে যাই জোনটানে পাঠে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ে বসবাস করা জনগোষ্ঠীকে নিয়ে বেশ কৌত‚হল রয়েছে আমার। সে কৌত‚হল মেটাতেই সিলেটের একদম প্রত্যন্ত এক সীমান্ত এলাকায় এক সপ্তাহ ছিলাম, মাটির ঘরে। সেখানকার মানুষের জীবনকর্ম আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম আমাকে বেশ আহত করেছিল। বর্তমান সময়ের উন্নত জীবন ব্যবস্থার কতটা বিপরীতে তাদের অবস্থান তা নিজের চোখে না দেখলে অনুমান করা কঠিন। ভারতের সোনাই নদীর তীরে বাংলাদেশের গাড়াখালী গ্রাম। নদীর দুই পাড়ে দুই দেশের যুবক-যুবতী মোসারফ ও টুম্পা। মোসারফের ঘরের পাশে ১৩ নম্বর সীমান্ত পিলার ঘেঁষা তালগাছে বাসা বেঁধে থাকা একটি শকুন দিয়ে গল্পের শুরু এবং শেষ। এ গল্পের নির্মাণশৈলী, প্রতিটা শব্দে, বাক্য আর কথায় আমি যেন স্পষ্ট দেখছি প্রতিটা চরিত্র। তালগাছের শকুন, সোনাই নদীর জল, পাহাড়-অরণ্য। আমি দেখছি দুটি দেশের সীমান্তের এপাড় থেকে ওপাড় দুজন যুবক-যুবতীর প্রেম বিনিময়, বেঁচে থাকার তাগিদে অসহায় পাহাড়িদের জোনটানা-মাদক পাচার। ওপাড়ের সীমান্তবাহিনীর গুলিতে এপাড়ের গতরখাটা যুবকের লাশ। আর মাথার ওপর তালগাছে বসা একটা শকুনের খক খক ডাক-উল্লাস।
জোনটানে গ্রন্থে এছাড়া দরিদ্র জেলেপাড়া নিয়ে মাটির মানুষ, ফাঞ্জ কাফফার বিখ্যাত গল্প মোটামরফোসিসকে উপলক্ষ করে মোটামরফোসিস-একবিংশ, গলাকাটা বাদশা, পিঁপড়া রাজ্যের রূপকথাসহ এগারোটি গল্প রয়েছে। প্রতিটি গল্পের প্লট, আঙ্গিক, নির্মাণচিন্তা সম্পূর্ণ আলাদা। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় কীর্তনখোলা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় জোনটানে। লেখক হিসেবে নয় একজন পাঠক হিসেবে ভালো একটি বই পাঠে অন্য পাঠকদের উদ্বুদ্ধ করা আমারও নৈতিক দায়িত্ব। সে দায়িত্ববোধ থেকেই জোনটানে নিয়ে দুকথা লেখার প্রয়াস। আমি বিশ্বাস করি গল্পকার শ্যামসন বুড়ন বেঁচে থাকবেন তার সৃষ্টিতে।

এসআর
বিষয়: