ঢাকাতেই নীরবে বিশ্রাম নিচ্ছেন এন্ড্রু কিশোর

আগের সংবাদ

টেস্ট ও রিপোর্টের চক্কর!

পরের সংবাদ

বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার প্রয়োগ নিয়ে হুলুস্থূল

আজিজুর রহমান জিদনী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২২, ২০২০ , ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ

ডেক্সামেথাসনসহ অন্যান্য ওষুধের মতোই কোভিড-১৯ চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথির প্রয়োগ নিয়ে হুলুস্থূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের দাবি আর্সেনিক অ্যালবামসহ আরো কিছু ওষুধ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে কাজ করছে। অধিকাংশ জেলার পুলিশ সুপারসহ প্রায় অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের ওষুধ ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছেন। এমনকি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালেও তাদের একজন চিকিৎসক কাজ করছেন। এমতাবস্থায় করোনা চিকিৎসায় নিবেদিত হাসপাতালগুলোতে ছোট পরিসরে হলেও আলাদা হোমিওপ্যাথি ওয়ার্ড খুলে চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রমাণের সুযোগ চাইছেন তারা। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি গাইডলাইন শিগগিরই জমা দেয়া হবে বলেও জানানো হয়েছে।

এদিকে করোনা প্রতিরোধে হোমিও চিকিৎসার বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই বাজারে ওষুধ মিলছে না। দোকানে গিয়ে অনেকেই খালি হাতে ফিরছেন। তবে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। তাছাড়া পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত সমীক্ষায় বা গবেষণায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যে, হোমিওপ্যাথি ওষুধ করোনা চিকিৎসায় কার্যকর। যেহেতু এখনো করোনার স্বীকৃত কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি, তাই স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণই যথেষ্ট।

হোমিও চিকিৎসকরা বলছেন, কিছু ওষুধ রয়েছে যা শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা) সক্রিয় করে কোভিড-১৯ ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করাসহ এ
মহামারির বিস্তার রোধে সক্ষম। করোনা ভাইরাস উপসর্গ রয়েছে বা আক্রান্ত হয়েছে এমন রোগীদের লক্ষণসমূহ বিশ্লেষণ করে প্রচলিত হোমিওপ্যাথিক ওষুধগুলোর মধ্যে থেকে বেশি ব্যবহৃত হতে পারে এমন কয়েকটি ওষুধ হলো একোনাইট, আর্সেনিক অ্যালবাম, রাসটক্স, ব্রায়োনিয়া, বেলডোনা, জাস্টিসিয়া, ইনফ্লুয়িজেনাম, ইউপেটোরিয়াম, কারগোভেজ ক্যামফোর, জিলসিমিয়াম, এন্টিম টার্ট, নেট্রাম মিউর ও পালসেটিলাসহ ইত্যাদি। তবে করোনা সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পেতে ‘আর্সেনিক অ্যালবাম-৩০’ নামের একটি হোমিও ওষুধের ব্যবস্থাপত্র বেশি দেয়া হচ্ছে। ওষুধটি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে ভাইরাস আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে পারে। যা রোগের মহামারি আকারে বিস্তার রোধে সক্ষম। সপ্তাহে ৩ থেকে ৫ দিন দৈনিক ৪-৫ বার সেবন করতে হবে ওষুধটি। তবে করোনায় আক্রান্ত হলে চিকিৎসা করা হবে ভিন্নভাবে। সে ক্ষেত্রে উপসর্গের ভিত্তিতে ওষুধ দেয়া হবে। যদি গলাব্যথা হয় তবে ব্রায়েনিয়া সেবন করতে হবে ৭ দিন। শ্বাসকষ্ট হলে সেবন করতে হবে আর্সেনিক অ্যালবাম-৩০ ও কারগোভেজ ক্যামফোর। কাশি হলে টিউবার ক্যালিনাম ও পেটের সমস্যায় জিলিসিমিয়াম সেবনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। ভালো ফল পেতে জার্মানি থেকে আমদানিকৃত নির্ভরযোগ্য হোমিও ওষুধ সংগ্রহের কথাও বলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ রায় গতকাল রবিবার ভোরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে আমরা করোনা মহামারির শুরু থেকেই চিকিৎসা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেই। অধিকাংশ জেলার পুলিশ সুপারসহ প্রায় অনেক প্রতিষ্ঠানই হোমিওপ্যাথি ওষুধ ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছেন। এমনকি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালেও রাশিদুল হক নামে একজন হোমিও চিকিৎসক কাজ করছেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় করোনা প্রতিরোধ ও দেহের সক্ষমতা বড়ানো সম্ভব, তা প্রমাণের সুযোগ চাই আমরা। সে জন্যই করোনা চিকিৎসা চলছে এমন হাসপাতালগুলোতে ছোট পরিসরে হলেও আলাদা হোমিওপ্যাথি ওয়ার্ড খুলে কাজ করতে চাই।

তবে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মনোয়ার হাসানাত খান গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, বেশ আগে কয়েকজনকে টুকটাক হোমিও চিকিৎসা দেয়া হয়েছিল। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কখনোই শুরু করা হয়নি। কারণ হোমিওপ্যাথির মাধ্যমে করোনা থেকে সেরে ওঠার বিষয়টি এখনো পরীক্ষিত নয়। এরপরও কোনো পুলিশ সদস্য যদি স্বেচ্ছায় হোমিওপ্যাথি নিতে চায়, সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়। আমরা এটাকে উৎসাহিত করছি না, আবার নিষেধও করছি না।

এদিকে করোনা উপসর্গ রয়েছে এমন দুজন রোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেলিফোনে ভোরের কাগজকে জানান, রাজধানীর হাটখোলা রোডে বসবাস করেন তারা। তাদের স্বজনরা এলাকার দোকানগুলোতে খোঁজ করে ‘আর্সেনিক অ্যালবাম-৩০’ নামের হোমিওপ্যাথ ওষুধটি পায়নি। অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র। সাপ্লাই নেই বলে জানাচ্ছেন দোকানদাররা।
এ বিষয়ে হোমিওপ্যাথি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. দিলীপ কুমার রায় বলেন, ওষুধগুলো আনা হয় জার্মান থেকে। হঠাৎ চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় হয়তো স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। দোকান মালিকদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতেও ওষুধ আমদানির কাজ শুরু করছেন তারা। কেউ এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি মুনাফার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবেও বলে হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

তবে হোমিও চিকিৎসকদের দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, আমরা সাধারণত কথা বলি বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত, সমীক্ষা ও গবেষণার ভিত্তিতে। হোমিওপ্যাথি ওষুধ করোনা চিকিৎসায় কার্যকর পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত সমীক্ষায় বা গবেষণায় এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, নিরাপদ থাকতে একটি ভ্রান্ত ধারণা থেকেই মানুষ হোমিওপ্যাথির দিকে ঝুঁকছে। যা করার কোনো প্রয়োজন নেই। তিনি আরো বলেন, অনেক দিন ধরেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দাবি করা হচ্ছে ক্যান্সারের চিকিৎসায় হোমিওপ্যাথি কার্যকর। তবে কোনো গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য নেই। তাই বলব, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তাদের হোমিওপ্যাথ খাওয়ানো মোটেই নিরাপদ নয়। কারণ, আমরা জানি করোনায় আক্রান্ত অনেক রোগী শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনেই ভালো হচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ফার্মাকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সায়েদুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, বিশ্বব্যাপী আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় হোমিওপ্যাথিকে মূলধারার বাইরে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এমন মহামারিতে এ ধরনের ওষুধ খেলে আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আক্রান্তরা। যেখানে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণই সুরক্ষা দিতে পারে, সেখানে অবৈজ্ঞানিক বিষয়ের পিছে আমরা কেন হাঁটব? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপও কামনা করেন তিনি।

ডিসি