বাবা’দের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেন তাদের গর্বিত সন্তানেরা

আগের সংবাদ

সেতু আছে রাস্তা নেই, দূর্ভোগে ১৫ গ্রামের মানুষে

পরের সংবাদ

বাবারা কি ফেসবুক দেখেন!

মাহবুবুল ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২১, ২০২০ , ৪:২৬ অপরাহ্ণ

বাবা। দুই অক্ষরের একটি শব্দ। যার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে লাখো শব্দ, হাজারো বাক্য, অসীমতম অনুভূতি। ‘বাবা’ এই শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এমন একটি চরিত্র, যার কথা বলে শেষ করার মতো শব্দভাণ্ডার হয়তো পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। তবুও বাবার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে প্রতিটা সন্তানেরই থাকে প্রাণপণ প্রচেষ্টা। তা সে প্রকাশ্যেই হোক কিংবা সঙ্গোপনে। সব সন্তানের অন্তরেই গেঁথে আছে বাবার ছবি, প্রতিচ্ছবি। কেননা, বাবা শুধু একজন মানুষই নন, স্রেফ একটি সম্পর্কের নামও নয়। বাবার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ।

বাবার কাঁধটা কি অন্য সবার চেয়ে বেশি চওড়া? তা না হলে কী করে সমাজ সংসারের এত দায়ভার অবলীলায় বয়ে বেড়ান বাবা। আর বাবার পা-ও কি অন্য সবার থেকে অনেক দ্রুত চলে? নইলে এত অল্প সময়ে এতোটা পথে কী করে প্রবল হাতে সব কিছু আগলে রাখেন? বাবার ছায়া যেন শেষ বিকেলের বটগাছের ছায়ার চাইতেও দীর্ঘ। তিনি তার সন্তানকে জীবনের সব উত্তাপ থেকে সামলে রাখেন। বাবার চোখ দেখতে পায় কল্পনার অতীত কোনো দূরত্ব। তাই তিনি সব সময় শঙ্কিত থাকেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের একটা বিখ্যাত উক্তি রয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই’। বাবাকে নিয়ে এমনই হাজারও কথা রয়েছে, মূল্যায়ন করা হয়েছে অসংখ্য উপমায়। একটি শিশু বড় হয়ে একজন বাবা হবেন। বিশালাকার মর্মার্থের এ কথাটি এক কথায় বর্ণনা করতেই হয়তো কবি গোলাম মোস্তফা বলে গেছেন, ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে। ধর্মীয় গ্রন্থগুলিতেও বাবা মাকে সবার ওপর স্থান দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে পিতা-মাতার সম্মান প্রসঙ্গে বলা আছে, ‘তাদের সঙ্গে উহ! শব্দ পর্যন্ত করো না।’ আবার সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ‘পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহী পরমং তপঃ, পিতরী প্রিতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা’ – এই মন্ত্র জপে বাবাকে স্বর্গজ্ঞানে শ্রদ্ধা করেন। প্রতিটি ধর্মই তার কর্মের সংজ্ঞায় বাবাকে উপরেই রেখেছে।

মানব হৃদয়ের না বলা কিছু কথা, কিছু উচ্চারণের যেন অবলীলায় সুযোগ করে দিয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বাবাকে নিয়ে হাজারো কথা, হাজারো উক্তি, হাজারো হৃদয় নিংড়ানো ছবিতে তলিয়ে যায় ফেসবুক, টুইটার। বাবা দিবসে ফেসবুকের দিকে তাকালে মনে হবে বাবার প্রতি সন্তানদের ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। বুকের ভেতরে থাকা আবেগ মুখের শব্দে যথাযথ প্রকাশ না করতে পারলেও তা ফেসবুকে প্রকাশ করতে ক্ষুদ্র প্রয়াস চালিয়ে যান সবাই।

বিশ্ব বাবা দিবস

অনেকে ফেসবুকে লেখেন, সারাবছর বাবাকে বলতে পারি না কতটুকু ভালোবাসি। বাবাকে বলতে পারি না, ‘বাবা কতো কষ্ট দিই তোমাকে, ক্ষমা করে দিও’। অথচ না বলতে পারা সেই কথাটুকু ফেসবুকে এসে কি অস্থির চিত্তেই না বলে ফেলেন। যে কথা একবার বললে বাবা হয়তো জীবনের সব কষ্টকে দু’ফোঁটা অশ্রুতে ধুয়ে দিতে পারেন, সে কথা আমরা বাবাকে না বলে বলি ফেলি ফেসবুকে! বাবাকে না বলতে পারার কারণেই হয়তো বাবা আর সন্তানের মাঝে থেকে যায় অনেক অজানা রহস্যময় দূরত্ব। রয়ে যায় অনেক অপ্রকাশিত অনুভূতি, কিংবা অনেক প্রশ্ন। কেন আমরা বাবার প্রাপ্যের কিয়দাংশও দিতে পারি না! কেন বাবাকে সামনা সামনি বলতে পারি না প্রাণ খুলে? ফেসবুকে এই যে আমরা বাবাকে নিয়ে আবেগ- অনুভূতির ঝড় তুলি, অনেক না বলা কথা বলি, সেগুলো কি বাবারা দেখেন?

ফেসবুকে বাবাকে নিয়ে অনুভূতি কেনই বা তীব্র হয়? এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা ভোরের কাগজ লাইভকে বলেন, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার কথা আমরা কেন বাবাকে বলতে পারি না- এ প্রশ্নটা আমাদের সংস্কৃতি, সামাজিক, পারিবারিক মণ্ডলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভালোবাসার বিষয়টা কেন অবাধ থাকে না, সেটা খুবই জটিল। ভালোবাসা প্রকাশের ভেতরে এক ধরনের জটিলতা থাকে। এটা আসলে আমাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার ভেতর থেকেই হয়।

স্রষ্টার পরেই বাবা এবং মা। তারাই সবচেয়ে শ্রদ্ধার জায়গায় থাকেন। আমাদের পারিবারিকভাবেই ভালোবাসার জায়গাটা মৃদু হয়ে যায়। আসলে বাবা মায়েরা আমাদের যে ভালোবাসেন, এ কথাটাও কিন্তু আমরা কখনো তাদের কাছ থেকে শুনি না। বরং তার শাসন, অনেক ক্ষেত্রে শাস্তি দেয়া, হয়তো এ বিষয়গুলোই বেশি প্রকাশিত হয়। কিন্তু এ সবকিছুই যে আমাদের বাবা মায়েরা আমাদের ভালোবেসেই করেন, এসব কিন্তু আমরা বয়সন্ধিকালে বুঝতে পারি না।

বাবার সঙ্গে সন্তানের জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় তুলে ধরে ড. জিনাত হুদা বলেন, আমরা যেমন শৈশব কৈশোরে এসব বিষয়গুলোর সম্মুখিন হয়েছি, আমাদের সন্তানেরাও একইভাবে হয়তো এমন অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে। যার কারণে বাবা মায়েরাও যেমন বলতে পারে না ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, সন্তানেরাও তেমন বলতে পারে না। আমাদের সামাজিকীকরণ, আমাদের পারিবারিক ও পরিবেশ পরিস্থিতির কারণেই বলতে পারি না। কিন্তু আমরা সবাই জানি, আমরা সবাই সবাইকে ভালোবাসি। যে কথাটা আসলে হৃদয়ের অনেক গভীরে থাকে, প্রকাশিত হয় না।

বিশ্ব বাবা দিবস

বাবাকে ভালোবাসার কথাগুলো কেন ফেসবুকে অবলীলায় প্রকাশ হচ্ছে- এ ব্যাপারে এই সমাজবিজ্ঞানী বলেন, এখন যেহেতু গ্লোবালাইজেশনের যুগ। ইন্টারনেট আছে, ফেসবুক আছে। মনের ভেতর চাপা থাকা সেই ভালোবাসার কথাটা আমি ফেসবুকে বলে দিচ্ছি। যেটা আমি আমার বাবা-মাকে বলতে চাই, কিন্তু বলতে পারছি না। সে কথাটা আমি ফেসবুকে বলছি। এটাই হচ্ছে ভালোবাসার শক্তি বা ভালোবাসার দুর্বলতা। এজন্যই আমি বলি, ভালোবাসা একটা জটিল প্রক্রিয়া। খুব পরিষ্কার করে ভালোবাসার কথাটা বলতে পারি না। যে কথাটা বলতে পারি না, সে কথাটাই প্রকাশ করি একটা মিডিয়া বা মাধ্যম ধরে। এভাবেই আমরা আমাদের বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান শ্রদ্ধাগুলো প্রকাশ করি। যেমনটা আমরা বাবা দিবসে করে থাকি।

এমআই