মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান কামাল লোহানী’র

আগের সংবাদ

চিরসংগ্রামী সংস্কৃতি সারথী কামাল লোহানী’র বিদায়

পরের সংবাদ

কামাল লোহানী বাংলা মায়ের প্রকৃষ্ট সন্তান

আতাউর রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২০, ২০২০ , ৭:০১ অপরাহ্ণ

কামাল লোহানী আমাদের দেশে কীর্তিমান পুরুষ, যিনি কালের পরিক্রমায় নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন। তিনি দেশে অনেক মানুষের কাছে লোহানী ভাই নাম খ্যাত কিন্তু ষাটের দশকের প্রথম দিকে যখন তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়; তখন থেকে মনের টানে তাকে পোশাকি নামে সম্বোধন না করে; কামাল ভাই নামে ডাকতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। যখন আমি তাকে প্রথম দেখি, তখন থেকেই আমার রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য শ্যামার বজ্রসেনের মতোই মহেন্দ্র নিন্দিত কান্তিময় মনে হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালায় ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্য মঞ্চায়িত হয়েছিল। সেই নৃত্যনাট্যে কামাল লোহানীকে বজ্রসেনের  ‍ভূমিকায় এবং মন্দিরা নন্দীকে শ্যামার ভূমিকায় দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। এর আগে জানতে পারিনি যে, কামাল ভাই একজন নৃত্যশিল্পী। ঢাকায় আসার পরপরই কামাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে, শিল্প ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমার আগ্রহ ও লগ্নতার কারণে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৬০ সালে বিএসসি ক্লাসে ভর্তি হই। আমি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএসসি পাস করে ঢাকায় আসি। প্রথম দর্শনে আমি কামাল ভাইয়ের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ বোধ করি। ঢিলা পায়জামা ও সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষটিকে আমার কাছে শুভ্রতার সুস্মিত প্রতীক মনে হয়েছিল এবং পাশাপাশি সংস্কৃতিবান এই মানুষটিকে মনে হয়েছিল মৃত্তিকা লগ্ন, দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমিক এক ঋত্বিক পুরুষ।
আমি মনে মনে কামাল ভাইকে আমার পথপ্রদর্শক হিসেবে হৃদয়ে গ্রহণ করেছিলাম। এই নির্ভেজাল চরিত্রের সাদাসিধে মানুষটিকে আমাদের বাংলা মায়ের প্রকৃষ্ট সন্তান বলে আমাদের মনে হতো। আমি তার অন্যতম ভক্ত হয়ে উঠেছিলাম। আজ আমি এই পরিণত বয়সে এ স্বীকারোক্তি দিচ্ছি। সেদিন এই কথাটি বলতে পারিনি যে, কামাল ভাই আপনি আমার মনের মতো মানুষ, যাকে পথপ্রদর্শক নেতা হিসেবে আনন্দচিত্তে গ্রহণ করা যায়। আমি গুরুবাদে বিশ্বাস করি না। কামাল ভাই আর আমি যৌবনে যে রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়েছিলাম তাতে গুরুর কোনো স্থান ছিল না। সেখানে কেবল স্থান ছিল সহযোদ্ধা ও সহকর্মীর। তার সংস্কৃতিলগ্নতা, মুক্তচিন্তা, দেশপ্রেম ও মানবপ্রেম দেখে আমি জানতে চেষ্টা করিনি ওনার পেশা কী? কীভাবে ওনার সংসার চলে? পরে জেনেছিলাম, উনি পেশায় একজন জাঁদরেল সাংবাদিক। পরে আরো জেনেছি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে উনি কোনোদিন নীতির প্রশ্নে আপস করেননি।
স্মৃতি যুগপৎ বড় আনন্দের ও কষ্টের হয়। দুঃখ হয় এই ভেবে যে, ষাট আর সত্তর দশকের উদ্বেলিত সময়টাকে আর কোনোদিন খুঁজে পাব না; কামাল ভাইয়ের ছত্রছায়ায় আইয়ুব খান। তথা পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের সময়টাকে। আমাদের যৌবনের তখন উত্তাল সময়। আমরা তখন জানতাম আমাদের শত্রু কে বা কারা?

পায়জামা ও পাঞ্জাবির ওপর শীতের দিনে চিকন পাড়ের পশমি শাল গায়ে দিয়ে উনি অফিস করতেন। এর আগে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম হোটেল পূর্বাণীতে। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কামাল ভাইয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গৌরবজনক। উনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। আমার কাছে কামাল লোহানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরে এমন আপাদমস্তক বাঙালি আমি জীবনে কমই দেখেছি। তিনি আমাদের কাছে থাকবেন একান্তভাবে সোনার বাংলার মানুষ হয়েই; একজন চিরন্তন বাঙালি মহৎ পুরুষ হিসেবে। তিনি আমাদের অক্ষয় গৌরব হয়ে থাকবেন। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

কামাল ভাইয়ের বাসায় ছিল আমার নিত্য আসা-যাওয়া। অনেক সময় দুপুরের খাবারসহ তার বাসায় বিকেলের নাস্তা করেছি। খুব সম্ভবত তার বাসা ছিল তখন পল্টনে। তার বাসার লাল সিমেন্টের ঝকঝকে ফ্লোরে বসেই আমরা আড্ডা দিয়েছি সকালে, বিকালে, দিনের পর দিন। দীপ্তি ভাবির স্নেহ ছায়া আমাদের ছিল বড় আশ্রয়স্থল। আমাদের প্রায় সব সময় চা-নাস্তা খাবার আবদার উনি হাসিমুখে সহ্য করতেন। উনি ছিলেন সর্বংসহা ধরিত্রীর মতো। উনি অকালে চলে গেলেন, আমরা স্বজনরা তার প্রয়াণে খুব দুঃখ বোধ করেছিলাম। কামাল ভাই ও দীপ্তি ভাবি দম্পতির তিন ছেলেমেয়েকে আমি খুব ছোট দেখেছি। সাগর লোহানী আজ তরতাজা যুবক; তাকেও আমি খুব ছোট দেখেছি। বন্যা ও উর্মি তখন খুবই ছোট ছিল। উর্মিকে আমি ফ্লোরে হামাগুড়ি দিতে দেখেছি।
বর্ধিত বয়সে অনেক স্মৃতি হারিয়ে যায় অথবা ম্লান হয়ে যায় কিন্তু আমার স্মৃতিগুলো কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর ‘ডেফোডিল’ কবিতার সে ফুলের মাঠের মতো অবকাশে ও অলস মুহূর্তে আমার মনের মণিকোঠায় ময়ূরের পুচ্ছ বিস্তার করে। কামাল ভাই গতকাল পার্থিব জীবন ছেড়ে চলে গেলেন। আমিও তার অনুগামী হয়ে আছি- চলেছি পিছে পিছে। আমি ৭৯ বছর ছুঁই ছুঁই করছি। আমাদের জীবনের যুদ্ধগুলো এখন সোনায় মোড়ানো পাতের মতো মনে হয়। কামাল ভাইয়ের অনুসারী হয়ে আমরা মৃত্তিকালগ্ন জনগণের সংস্কৃতি চর্চায় ছিলাম নিয়োজিত।
কামাল ভাইয়ের অনুগামী হয়ে আমি তার সৃষ্ট ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীতে যোগদান করি। ক্রান্তি ছিল জনগণের কল্যাণে প্রতিষ্ঠিত একটি শিল্প-সৃজনের প্রতিষ্ঠান। মার্কসবাদী আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিল এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যবৃন্দ। আমার নাট্য প্রীতির উদ্ভব ঘটেছিল আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবন থেকেই। তার নির্দেশিত ‘আলোর পথযাত্রী’ নাটকে আমি আর সুলতানা রেবু প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। পল্টন ময়দানে হাজার দর্শক সেই নাটকের মঞ্চায়ন দেখেছিল এবং প্রশংসা করেছিল। মনে আছে ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর প্রযোজনায় এবং প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী আমানুল হকের নির্দেশনায় জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে বিপুলভাবে দর্শক নন্দিত হয়েছিল। আমি ক্রান্তি শিল্পীগোষ্ঠীর ব্যানারে আব্দুল্লাহ আল মামুন রচিত ও নির্দেশিত কাব্য নাটক ‘শপথ’-এ অভিনয় করে কিছুটা প্রশংসিত হয়েছিলাম। আমি যুদ্ধের ভ‚মিকায় ও সুলতানা রেবু শান্তির ভ‚মিকায় অভিনয় করেছিল। কামাল লোহানী সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী এবং দেশপ্রেমিক পুরুষ হিসেবে অনন্য। তার তুলনা কেবল তিনিই। তিনি দেশের সাধারণ জনগণের কথা ভাবতেন এবং তার জীবনের সব কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মঙ্গলে নিয়োজিত ছিল এবং আজো অব্যাহত আছে।
১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কামাল ভাইয়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গৌরবজনক। উনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া নানা কথামালার অনুষ্ঠানসহ সংবাদ পাঠ ও কবিতা আবৃত্তিতে উনি নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কামাল লোহানী ঢাকা বেতারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আমি তার শাহবাগের অফিস একাধিকবার গিয়েছি। পায়জামা ও পাঞ্জাবির ওপর শীতের দিনে চিকন পাড়ের পশমি শাল গায়ে দিয়ে উনি অফিস করতেন। এর আগে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম হোটেল পূর্বাণীতে। তার সঙ্গে ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত ভাষ্যকার ও সংবাদ পাঠক দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
আমার কাছে কামাল লোহানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরে এমন আপাদমস্তক বাঙালি আমি জীবনে কমই দেখেছি। তিনি আমাদের কাছে থাকবেন একান্তভাবে সোনার বাংলার মানুষ হয়েই; একজন চিরন্তন বাঙালি মহৎ পুরুষ হিসেবে। তিনি আমাদের অক্ষয় গৌরব হয়ে থাকবেন। তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

আতাউর রহমান : নির্দেশক, নাট্যকার ও অভিনেতা।

এসআর