করোনাকালে পারিবারিক সহিংসতা দুঃখজনক

আগের সংবাদ

সিসিআইর সহ-সভাপতি নির্বাচিত শেখ ফজলে ফাহিম

পরের সংবাদ

করোনা এবং বাজেট নিয়ে একজন অবিশেষজ্ঞের সামান্য মত

প্রকাশিত: জুন ১৫, ২০২০ , ৯:১৮ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ২৭, ২০২০ , ৩:২৩ অপরাহ্ণ

যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রকৃত আয় গোপন করে কর ফাঁকি দিচ্ছে তাদের করের আওতায় আনতেই হবে। অর্থ পাচার শুধু রোধই নয়, উদ্ধারও করতে হবে। করোনা প্রতিরোধে সরকারকে অর্থ, সরঞ্জাম, লোকবল ইত্যাদি নিয়ে নামতে হবে। এই যুদ্ধে জয় হতেই হবে। তবে সময় বেশি নেয়া যাবে না। অল্প সময়ের মধ্যে বেশি অর্থ খরচ করে হলেও করোনার সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। তাহলেই আগামী অর্থবছরের বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নে সময় পাওয়া যাবে, জনগণও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

করোনা সংক্রমণ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সরকারকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন, গণমাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার নানা বিধিনিষেধ জানান দিচ্ছেন। অজানা এই ভাইরাসটি সম্পর্কে এখন গণমাধ্যমের যে কোনো শ্রোতা-দর্শকই কমবেশি অবহিত বা সচেতন। সরকার গত ৩ মাসে করোনা সংক্রমণ বন্ধ করার জন্য সরকারি ছুটি ও লকডাউনসহ নানা ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। এক্ষেত্রে কখনো কখনো সরকারকে ব্যবসায়ী, কর্মজীবী মানুষ এবং ধর্মীয় বিষয়কে বিবেচনা করে ছাড় দিতে হয়েছে। গুরুত্ব পেয়েছে জীবন ও জীবিকার বিষয়টি। এতে করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বিশেষত ১০ মে-পরবর্তী সময়ে মসজিদে তারাবিহ আদায়, ঈদের বাজার এবং ঈদের ছুটিতে গ্রামে যাওয়ার সুযোগটি করে দেয়ার পর করোনার বিস্তার গ্রাম পর্যন্ত ঘটার সুযোগ পেয়েছে। গত ৩১ মে থেকে ছুটি উঠে যাওয়ার পর সীমিত আকারে অফিস, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন এবং সাধারণ মানুষের চলাচলের অনুমতি প্রদানের পর করোনা এখন সংক্রমণে সব বাধা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়েছে। এই মুহূর্তে সরকার নতুন করে আজ ১৬ জুন থেকে দেশের অনেক অঞ্চলেই লকডাউন কার্যকর করতে যাচ্ছে।

ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে লাল, হলুদ ও সবুজ এলাকাভিত্তিক বিভাজনের মাধ্যমে করোনা নিয়ন্ত্রণের বড় ধরনের আয়োজন করতে যাচ্ছে। এ ধরনের জোনভিত্তিক কার্যক্রম কোনো কোনো দেশে ভালো ফল দিলেও অনেক দেশেই তেমন সাফল্যের দাবি করা যায় না। সে কারণে লকডাউন, জোনভিত্তিক বিভাজন ইত্যাদির সাফল্য নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও পুরোপুরি মতৈক্য দেখা যাচ্ছে না। এখন সরকার লাল, হলুদ ও সবুজ জোনের ধারণায় অগ্রসর হচ্ছে। তবে এটি বাস্তবায়ন করা বেশ জটিল এবং প্রচুর লোকবলের অক্লান্ত পরিশ্রমের বিষয়। কয়েকটি এলাকা থেকে যেসব অভিজ্ঞতা আমরা পাচ্ছি তাতে আক্রান্তদের অনেকেই ঘরে থাকতে চাচ্ছে না, সুস্থদের বড় অংশই ঘর-বাইর বেড়াতে চাচ্ছে। তাদের নিবৃত্ত করতেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক, জনপ্রতিনিধিসহ নিয়োজিত ব্যক্তিদের গলদঘর্ম অবস্থা! সুতরাং এই ব্যবস্থাটি বাংলাদেশের মতো সমাজে কার্যকর করা মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। এর থেকে সুফল পাওয়া কতটা সম্ভব হবে তা বলা খুবি কঠিন। এরই মধ্যে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রায় প্রতিটি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। সেখান থেকে অনেক গ্রামে-গঞ্জেও এর বিস্তার দ্রুত ঘটতে শুরু করেছে। যারা এতদিন করোনা ভাইরাস নিয়ে ড্যাম কেয়ার ভাবে ছিল তাদেরও অনেকে হঠাৎ মৃত্যুবরণ করছে কিংবা আক্রান্ত হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে অনেক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ এর মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। তাদের বেশির ভাগই চিকিৎসা পাওয়া ও নেয়ার সুযোগ পায়নি। অনেকেই উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। অনেকেই করোনা উপসর্গ উপেক্ষা বা গোপন করেছে। ফলে এদের অনেকে যেমন মৃত্যুবরণ করেছে আবার করোনার সংক্রমণও ঘটিয়েছে। এভাবেই এখন করোনার সংক্রমণ বড় বড় শহর ছাড়িয়ে উপজেলা শহর ও কোনো কোনো এলাকার গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে। এরপরও সেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং চিকিৎসা নেয়ার বোধ খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। এই অবস্থাটি ২-৩ সপ্তাহ চলতে থাকলে পরবর্তী সময়ে সরকারের পক্ষে চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণ করার কোনোই সুযোগ থাকবে না। সুতরাং আমার ধারণা শুধু বড় বড় শহরগুলোতে সব শক্তি ক্ষয় করে শেষ পর্যন্ত আমরা ব্রাজিলের মতো অসহায় হয়ে যাই কিনা?
আমার মতে, বড়-ছোট সব শহর এবং গ্রামে যেখানে বা যে পরিবারে যারাই মৃদু করোনা উপসর্গ নিয়ে অবস্থান করছেন তাদের বাধ্যতামূলক ঘরবন্দি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং নজরদারিত্বে আনতে হবে। তাদের কার কী করা প্রয়োজন তা ডাক্তারের নির্দেশনামতো বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের একজনের কাছ থেকেও যেন পরিবারের সদস্য ও নিকটজনের মধ্যেও যেন করোনা সংক্রমণের সুযোগ না পায়। যারা পরিবারে কক্ষ বরাদ্দ করতে পারবেন না এমন উপসর্গ গ্রহণকারীদের নিকটস্থ কোনো কমিউনিটি সেন্টার বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা করা দরকার। যাদের এর চেয়ে জটিল উপসর্গ বা লক্ষণ দেখা দিয়েছে তাদের নিকটস্থ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা জরুরি। এমনটি উপজেলা এবং সংক্রমিত গ্রামাঞ্চলেও করা দরকার। আমাদের দেশে এই মুহূর্তে করোনা উপসর্গ বা জটিল আকার ধারণকারী মানুষের সংখ্যা দেড়-দুই লাখ হলেও তাদের সবাইকে নজরদারিত্বে আনার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনের কয়েক হাজার ব্যক্তি যথেষ্ট, ডাক্তার এবং নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবীদের কয়েক হাজারই হয়তো নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু আমরা যদি নজরদারিত্ব ও চিকিৎসার বাইরে রেখে চলতে দেই তাহলে করোনার সংক্রমণ, লকডাউন বা জোনভিত্তিক করেও খুব বেশি সফল হওয়া যাবে বলে মনে করি না। সংশ্লিষ্টদের কাছে বিষয়টি ভাবতে অনুরোধ করব।
গত ১১ জুন সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। করোনার এই দুর্যোগকালে তিনি একটি বড় অঙ্কের বাজেট উপস্থাপন করেছেন। এর পক্ষে এবং বিপক্ষে বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন। বিশেষত রাজস্ব আহরণ করার ভিত্তি এবার বেশ নড়বড়ে। দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন কবে স্বাভাবিক হবে তার ওপর সরকারের রাজস্ব আহরণের ভাগ্য অনেকটাই নির্ভর করে। তবে করোনা উপলক্ষে দেশে অনলাইন পদ্ধতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে ধারা সূচিত হয়েছে সেটিকে কাজে লাগাতে পারলে ভ্যাট ও করের একটি অংশ আহরণ করা সম্ভব হতে পারে। তবে রাজস্ব বিভাগে কর্মকর্তাদের দুর্নীতি রোধ করা গেলে, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভ্যাট ও কর সংগ্রহের ব্যবস্থা করা গেলে সরকারের রাজস্ব আহরণ নিয়ে অতীতের সমালোচনা কমে আসতে পারে। কর্মসংস্থানের যে বিষয়টি নিয়ে সব মহল উদ্বিগ্ন তার একটি প্রত্যাশিত সমাধান কৃষি, মৎস্য, কৃষিজ পণ্য সরবরাহ ও বিপণন ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত করা গেলে তাতে লাখ লাখ বেকার, শ্রমিক ও স্বল্প পুঁজির মানুষ যুক্ত হতে পারে। এই সময়ে করোনা ভাইরাসের কারণে খোলা ও কাঁচাবাজার নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে গ্রাম থেকে শাকসবজি, মাছ, মাংস রান্নাবান্নার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যাদি সরবরাহে স্বল্প পুঁজির মানুষদের সহযোগিতা প্রদান, সরবরাহ চেইন সরকারি উদ্যোগে তৈরি করা, বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, গ্রামে-গঞ্জে কৃষির বৈচিত্র্যে সম্পৃক্ত করা গেলে দেশের লাখ লাখ বেকার যুবসমাজ যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। এর ফলে গ্রামীণ কৃষি ও অর্থনীতি নতুনভাবে জেগে উঠতে পারে, একইভাবে এর সুফল শহরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ পেতে পারে। আগামী অর্থবছরে সরকার অনানুষ্ঠানিক এসব পেশাকে প্রণোদনাদানের মাধ্যমে শক্তিশালী করতে পারে। এর ফলে বিশাল এর অর্থনীতি আমাদের জিডিপিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারবে। এটিকে কেন্দ্র করে শহরে নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীনদের জীবিকার নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। শহরগুলোতে আগে মাফিয়া কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য ভাঙার এই সুযোগ সরকারকে কাজে লাগাতে হবে। দেশে শিল্প উৎপাদন বৈশ্বিক বাস্তবতার নিরিখে প্রতিনিয়ত ঢেলে সাজাতে হবে। এছাড়া প্রশাসনে অপচয়, দুর্নীতি ও প্রয়োজনীয় ব্যয় সম্পূর্ণরূপে রোধ করতে হবে। অবশ্যই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে।

দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলো জাতীয় এই দুর্যোগময় মুহূর্তে কতটা মানবিক আচরণ করেছে সেই নিরিখেই প্রতিটি হাসপাতালের কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিতে হবে। যারা সেবার বিনিময়ে বিপুল বাণিজ্য করছে তাদের কাছ থেকে কড়ায়-গণ্ডায় রাজস্ব আদায় করতে হবে। ওষুধ ও অক্সিজেন নিয়ে যারা কারসাজি করছে তাদের কঠোর হস্তে দমন এবং বড় অঙ্কের জরিমানা আদায় করা প্রয়োজন। অবশ্যই যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রকৃত আয় গোপন করে কর ফাঁকি দিচ্ছে তাদের করের আওতায় আনতেই হবে। অর্থ পাচার শুধু রোধই নয়, উদ্ধারও করতে হবে। করোনা প্রতিরোধে সরকারকে অর্থ, সরঞ্জাম, লোকবল ইত্যাদি নিয়ে নামতে হবে। এই যুদ্ধে জয় হতেই হবে। তবে সময় বেশি নেয়া যাবে না। অল্প সময়ের মধ্যে বেশি অর্থ খরচ করে হলেও করোনার সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে। তাহলেই আগামী অর্থবছরের বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়নে সময় পাওয়া যাবে, জনগণও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

নকি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়