পেঁপে চাষে হালিমের বাজিমাত

আগের সংবাদ

আবারও কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা, পুলিশ প্রধানের পদত্যাগ

পরের সংবাদ

এখনো মুত্যুকুপে বসবাস করছে ওরা

প্রকাশিত: জুন ১৪, ২০২০ , ১:৫৫ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ১৪, ২০২০ , ১:৫৫ অপরাহ্ণ

রাঙ্গামাটিতে পাহাড় ধ্বসের তিন বছরেও ঝুঁকি কাটেনি পাহাড় বাসীর। এখনো মুত্যুকুপে বসবাস করছে পাহাড়ের ২০ হাজারের বেশী পরিবার। পাহাড়ের মানুষ গুলোকে মৃত্যুকুপে থেকে বের করতে প্রশাসনের উদ্যোগের কথা থাকলেও ৩ বছরেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীরা মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে পাহাড়ের খাদে। আবারো বৃষ্টিপাত শুরু হলে বড়ো ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে রাঙ্গামাটির মানুষ।
গতকাল ছিলো ভয়াবহ ১৩ জুন। ২০১৭ সালের এই দিন পাহাড় ধবসে রাঙ্গামাটিতে প্রাণ হারায় নারী ও শিশু সহ ১২০ জন। উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গিয়ে প্রাণ হরায় ৫ সেনা কর্মকর্তা। এই দিনটির কথা মনে পড়লে মানুষের মনে চলে আসে অঝোড়ে কান্না।
পাহাড় ধ্বসের তিন বছর পার হলেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ। নিরাপদ আশ্রয়ে আসা দ্বারে ঘুরে আজো পাহাড়ের পাদদেশে প্রাণের ঝুঁকিতে বসবাস করছে আশ্রয়হীন পাহাড়ের মানুষ।
২০১৭ সালের ৯ জুন থেকে অবিরাম বৃষ্টি শুরু হয়। ১২ জুন বিকালে রিজার্ভ মুখ এলাকায় পাহাড় ধ্বসে একজনের প্রানী হানী ঘটে। রাত যতই বাড়তে থাকে বৃষ্টি ও বজ্রপাত আরো বেশী বৃদ্ধি পায়। এ অবস্থায় রাতভর পাহাড় ধ্বসের ফলে রাঙ্গামাটি শহরের রিজার্ভ বাজার, তবলছড়ি, ভেদভেদী, আসামবস্তী, মানিকছড়ি, সাপছড়ি, কাপ্তাই, নানিয়ারচর, বিলাইছড়ি সহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় ধ্বসে মারা যায় ১১৫ জন। সকালে রাঙ্গামাটি শহরের মানিকছড়ি এলাকায় রাস্তা পরিস্কার করতে গিয়ে পাহাড় ধ্বসে পড়ে নিহত হয় মেজর মোঃ মাহফুজুল হক, ক্যাপ্টেন মোঃ তানভীর সালাম শান্ত, কর্পোরাল আজিজুল হক, সৈনিক মোঃ শাহীন আলম ও মোৎ আজিজুর রহমান।
এদিকে ২০১৮ সালে নানিয়ারচর উপজেলাও পাহাড় ধ্বসে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। নাণিয়ারচর উপজেলার সাপমারা এলাকায় পাহাড় ধ্বসে একই পরিবারের ৪ জন সহ মারা যায় ১১ জন।
তিন বছর আগে ভারী বর্ষণের ফলে পাহাড় ধসের ঘটনায় ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের মৃত্যূ হয়। কিন্তু সেই মৃত্যু কূপে পূনরায় ঘরবাড়ি নির্মাণ করে ঝুকিপূর্ন অবস্থায় বসবাস করছে। মানছে না প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাঙ্গামাটি শহরের ৩৩টি স্থানকে ঝুকিপূর্ন এলাকা হিসেবে চিহিৃত করে সচেতনামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দিয়েছে।
২০১৭ সালের ১৩ জুন ভারী বর্ষনের ফলে পাহাড় ধসের ঘটনায় মাটি চাপা পড়ে ভেদভেদীর যুব উন্নয়ন বোর্ড এলাকা, মুসলিম পাড়া, শিমুলতলী এলাকা, সাপছড়ি, মগবান, বালুখালী এলাকায় এবং জুরাছড়ি, কাপ্তাই, কাউখালী ও বিলাইছড়ি এলাকায় ৫ সেনা সদস্যসহ ১২০ জনের মৃত্যূ হয়। এতে জেলায় ১৬শ থেকে ১৭ শ ঘরবাড়ি সম্পূর্ন ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পাহাড় ধসের কারণে সারাদেশের সাথে সড়ক যোগযোগের এক সপ্তাহ বিচ্ছিন্ন থাকার পর হালকা যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এছাড়া পাহাড় ধসে ২০১৮ সালে নানিয়ারচর উপজেলার বুড়িঘাট ইউনিয়নে ১১জন এবং ২০১৯ সালে কাপ্তাই উপজেলায় ৭জন প্রাণ হারায়।
শহরের রুপনগর, পশ্চিম মুসলিম পাড়া,নতুন পাড়া, রুপনগর, রেডিও স্টেশন এলাকা, ভেদভেদি এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, তিন বছর আগে ভয়াবহ পাহাড় ধসের প্রাণহনি ঘটেচলো সেই মৃত্যুকূপে পুনরায় ক্ষতিগ্রস্তরা ঘরবাড়ি নির্মান করে বসবাস করছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুকিপুর্ন এলাকা বসবাস ও স্থাপনা নির্মাণ না করতে নিষেধ করে সাইন টাঙিয়ে দিয়ে সর্তক করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ক্ষতিগ্রস্থরা সেই নিষেধাজ্ঞা মানছেন না। তারা জীবনের ঝুকি নিয়ে বসবাস করতে দেখা গেছে।
রুপনগরের বাসিন্দা মোঃ ইসলাম, মোঃ জাহাঙ্গীর, নুরুল কবির ও মরিয়ম বেগমের সাথে কথা বলে তারা জানান, বৃষ্টি হলে ভয় লাগে। কিন্তু যাওয়ার মতো তাদের কোন জায়গা নেই। অতি বৃষ্টিপাত হলে নিকটবর্তী নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে। সরকার যদি তাদের থাকার জন্য সমতল জায়গা ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে এই ঝুকিপূর্ন স্থানে বসবাস করবেন না।
ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনায় রুপনগর এলাকায় নিহত সালাহ উদ্দীন ও রাহিমা বেগমের বেঁেচ যাওয়া দুই মেয়ে মিমের বয়স এখন ৭ বছর আর সুমাইয়ার বয়স প্রায় ৫ বছর। মিম এখন দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়াশুনা করছে। মিম তার বাবামাকে মনে আসে। তাই বাবামাকে মনে পড়লে এখনো খুজে আর কেঁদে উঠে।
সরেজমিনের সময় কথা হয় মিম ও সুমাইয়ার ফুফু মিনারা বেগমের সাথে। তিনি জানান, মিম আর সুমাইয়া বাবামা মারা যাওয়ার পর তারারই এখন দেখা শুনা করছেন। ঘটনার পর সুমাইয়া আর মিমের খচর চালানোর দায়িত্ব নেয় জেলা প্রশাসন । তবে সে সময় তাৎক্ষকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান মিম আর সুমাইয়ার খরচ দিতেন। কিন্ত তিনি বদলি হওয়ার কারণে নতুন জেলা প্রশাসক আসলে কয়েক মাস খরচ দিলেও বর্তমানে কোন খরচ পাচ্ছে না। তিনি আরো জানান, মিম আর সুমাইয়ার খচরচের জন্য জেলা প্রশাসনে গিয়ে অনেকবার ঘুরাঘুরি করলেও কোন সহায়তা পাননি। বর্তমানে কষ্টের মধ্যে তাদের খরচ চালাতে হচ্ছে।
করে ওইসব এলাকার লোকজনদের সচেতনামূলক অংশ হিনেবে পাহাড় ধস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতনা সৃষ্টিসহ ঝুকিপূর্ন এলাকায় বসবাস ও স্থাপনা নির্মানের নিষেধাজ্ঞা জারি করে সাইন বোর্ড টানিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া জনসাধারনকে সচেতনা সৃষ্টি করতে লিফলেটও বিতরণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনে পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুকিপূর্র্ন লোকজনদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ২৬টি অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয়ের সময় খাওয়া-দাওয়া ও চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া যেস সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যায় তার জন্য বসবাসের প্রস্তুত রাখতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাঙ্গামাটি পৌর সভা এলাকায় ৩৩টি স্থানে ঝুকিপূর্ন তালিকা করেছে। এছাড়া ঝুকিপূর্ন এলাকায় বসবাসকারীদের পাশ্ববর্তী আশ্রয় নেয়ার জন্য রাঙ্গামাটি পৌর এলাকায় ২৬টি আশ্রয় কেন্দ্রের তালিকা করেছে। রাঙ্গামাটি পৌরসভার ঝুকিপূর্ন স্থানগুলো হলো রিজার্ভ বাজার এলাকার মধ্যে রয়েছে চম্পানির মার টিলা, চেংগিমুখ, আব্দুল আলী একাডেমী সংলগ্ন ঢাল, এসপি অফিস সংলগ্ন ঢাল, মাতৃমঙ্গল এলাকা ঢাল, পুলিশ লাইন সংলগ্ন ঢাল। তবলছড়ি এলাকার মধ্যে এডিসি হিল সংলগ্ন রাস্তার ঢাল, দুর্নীতি দমন কমিশন অফিস সংলগ্ন ঢাল, ওয়াপদা কলোনীর ঢাল, স্বর্ন টিলা, বিএডিসি পাহাড়ের ঢাল। বনরুপা এলাকার মধ্যে দেওয়ানপাড়া পাহাড়ের ঢাল, কাঠালতলী মসজিদ কলোনী পাহাড়ের ঢাল, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সংলগ্ন পাহাড়ের ঢাল, আলম ডক পাহাড়ের ঢাল, গর্জনতলী মুখ, চম্পক নগর এলাকার পাহাড়ের ঢাল, পাবলিক হেলথ এলাকা পাহাড়ের ঢাল। ভেদভেদী এলাকার মধ্যে রয়েছে মুসলিম পাড়া পাহাড়ের ঢাল, রাজমনি পাড়া পাহাড়ের ঢাল, পোষ্ট অফিস কলোনী এলাকা, নতুন পাড়া, শিমুলতলী, রুপনগর, বিদ্যানগর, লোকনাথ মন্দির এলাকা,কিনারাম পাড়া, সিলেটি পাড়া, আলুটিলা ও আনসার ক্যাম্প সংলগ্ন পাহাড়ের ঢাল।
জেলা প্রশাসক একেএম মামুনুর রশীদ বলেন, রাঙ্গামাটিতে ২০১৭,১৮ ও ১৯ সালেও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছিল। এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত এক মাস যাবত বর্ষাকে কেন্দ্র করে পাহাড় ধস বিষয়ে জনগনকে সচেতন করার জন্য সকল কার্যক্রম গ্রহন করে আসছি। রাঙ্গামাটি পৌরসভা ও প্রতিটি উপজেলায় যে সমস্ত পাহাড়ে ঝুকিপূর্ন বসবাস রয়েছে সেগুলো চিহিৃত করেছি। এসব এলাকায় বসবাসকারী ঝুকিপূর্ন লোকজনদের ভারী বর্ষনের সময় অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যেতে পারি তার কাজ শুরু করেছি। এছাড়া ঝুকিপূর্ন এলাকাগুলো চিহিৃত করে সাইন বোর্ড ও লিফলেট বিতরণ করেছি।
তিনি আরো বলেন, ইতোমধ্যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সাথে মিটিং করেছি। এতে সকল প্রস্তুতি গ্রহন করেছি যখন দুর্যোগ আসবে পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটবে সেই সব এলাকা থেকে লোকজনদের অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে নেওয়ার যায় তার জন্য কমিটি গঠন, সেচ্ছাসেবদক দল গঠন করে দিয়েছি। এছাড়্ওা আশ্রয় কেন্দ্রে আশ্রিতদের চিকিৎসার সেবা দেয়ার জন্য মেডিকেল টিম গঠন করেছি। এখানে প্রশাসন,পুলিশ সেনাবহিনীসহ সবাইয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে এইসব কাজ করা হবে।
জেলা প্রশাসক বলেন, যেহেতৃ করোনা ভাইরাসের প্রকোপ রয়েছে সেহেতু আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে তাদেরকে কিভাবে রাখতে পারি সেই বিষয়ে আমাদের মাথায় আসে। সেজন্য এবারের অনেকগুলো অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করেছি। শুধু রাঙ্গামাটি পৌরসভাবে ২৬টি অস্থায়ী কেন্দ্র নির্নয় করেছি। এছাড়া যত প্রাইমারী বিদ্যালয়, উচ্চা বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও কলেজ রয়েছে এবং সরকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাতে আমরা অনুরোধ করেছি যখনি ভারী বর্ষন হবে সে সমস্ত অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রগুলো ব্যবহার করতে পারি সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে চিঠি দিয়েছি। সেইসব কেন্দ্রগুলো যাকে বসবাসের উপযোগী, স্যানিটেশন উপযোগী করে রাখার জন্য জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিসারসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি।

ডিসি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়