কৃষি বাজেট বনাম খাদ্য নিরাপত্তা

আগের সংবাদ

বাজেট চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট নয়

পরের সংবাদ

করোনায় সৌদি প্রবাসীদের অসহায়ত্ব

একটু সহানুভূতিতেই রোগীদের প্রাণশক্তি বাড়ে শতগুণ

ডা. বতুল রহমান, সৌদি আরব থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১৩, ২০২০ , ৯:৩২ অপরাহ্ণ

ফোনটা ধরতেই ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলে উঠলো, ডাক্তার আপা বলছেন? হ্যাঁ, বলছি। কণ্ঠ থেকে কথা বের হচ্ছে না। বুঝলাম শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। বলেন আপনার জন্যে কি করতেপারি? আপা, আমার করোনা পজিটিভ। বলেই কাঁদতে শুরু করলো। ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম, কী বলবো!

আচ্ছা, কাঁদছেন কেন? পজিটিভ হয়েছে তো কী হয়েছে? ভালো হয়ে যাবেন ইনশা আল্লাহ। ক’দিন একটু কষ্ট হবে, তারপর সুস্থ্য হয়ে যাবেন। সে কেঁদেই যাচ্ছে, কথা বলতে পারছে না।

মিনহাজ গতরাতে রিপোর্ট পেয়েছে। রুমমেটরা সকালের মধ্যে তাকে রুম থেকে চলে যেতে বলেছে। এখন সে কোথায় যাবে? যাবার কোনো জায়গা নেই। সে ভাবতেই পারছে না, পাঁচবছর ধরে যাদের সঙ্গে এক হয়েছিল, এক সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেছে, তারাই আজ এত রূঢ় ব্যবহার করছে। রুম থেকে বের করে দিচ্ছে! অনেকক্ষণ কথা বলে তাকে আশ্বস্ত করলাম।

আরেক রোগী এমদাদের দুদিন ধরে জ্বর, কাশি। তার কোম্পানির লোক জানতে পেরেই রিয়াদ শহর থেকে দূরে একটা জায়গায় একরুমে রেখে এসেছে। যেখানে, খাবার বা পানির কোনো ব্যবস্থানেই। এখন কি খাবে? আর চিকিৎসা? কোনো উত্তর নেই। ভয়ে কাঠ হয়ে গেছে বেচারা।

একরুমে দুজন একইসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়লো। অন্যরা রুম থেকে সরে গেল। হট নাম্বারে কল করে করোনা টেস্টের জন্যে। দুদিন কেটে গেল। অবস্থা খারাপ হতে লাগলো। অ্যাম্বুলেন্স না পেয়ে পুলিশকে কল দিয়ে একজনকে হাসপাতালে নিতে পারলেও ভর্তি করার পাঁচ ঘণ্টা পরেই মারা গেল। আরেকজন পরেরদিন সকালে মারা গেল রুমের মধ্যেই। কতটা কষ্ট সহ্য করে মারা গেল, কেউ তা জানতেও পারলো না।

খালেকের কাজে যাবার পথে হঠাৎ করেই কাশি বেড়ে যায়। ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছিল না। এক পর্যায়ে রাস্তার মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। কেউ এগিয়ে আসেনি।

আসলামের করোনা পজিটিভ। তাকে নিয়ে রেখেছে একটা ভিলায় কোয়ারেনটাইনে, যেখানে আরও সব করোনা রোগী। শুরুতে কোনোই সমস্যা ছিল না। সাতদিন পর তার জ্বর, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। যেখানে তাকে রাখা হয়েছে, সেখানে শুধু দারোয়ান ছাড়া কেউ নেই। খাবার ওখান থেকে দিলেও, ডাক্তার, ওষুধের কোনো ব্যবস্থা নেই। তার শ্বাসকষ্ট বেড়েই চলেছে।

সৌদি আরবে কাছে থেকে আমার দেখা, এমন মিনহাজ, এমদাদ, খালেক হাজারে হাজার, এমন করুণ গল্পও হাজারে হাজারে। বিদেশের মাটিতে নিঃস্ব, জরাজীর্ণ জীবন-যাপন করছে এরা। অনেকেই বেতন পাচ্ছে না। এদের চিকিৎসার কোনো সুব্যবস্থা নেই। নেই থাকা খাওয়ার তেমন বন্দোবস্ত। নেই কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা। করোনা টেস্ট করার অনেক চেষ্টা করেও টেস্ট করাতে পারছে না। শ্বাস কষ্টের রোগী ও হাসপাতালে যেতে পারছে না। গাড়ি নেই। প্রাইভেটগাড়ি হাঁচি কাশি রোগীকে নিবে না। হাসপাতালে গেলেও ভর্তি হতে পারছে না। ঢুপঢুপ করে মরে যাচ্ছে। বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হার বেশি হবার আরেকটা কারণ, এদের পুষ্টি, ইমিউনিটি খুবই কম। যা আয় করে, না খেয়ে তার প্রায় পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে দেয়। স্বাস্থ্যজ্ঞান শূন্যের কোঠায়।

এখানে এরা আত্মীয়-পরিজনহীন পরিবেশে একটু অসুস্থ হলেই অস্থির হয়ে পড়ে। আর করোনাকালে অসুস্থতা ওদের নিমেষে ফ্যাকাশে করে দেয়। সর্দি-কাশি-জ্বর হলেই রুমের অন্যরা সরে যেতে বলে বা আলাদা করে দেয়। একা হয়ে মরার আগেই মনে মনে মরে যায়। করোনা আক্রান্ত সন্দেহে কেউ কাছে আসবে না। যখন একটা মানুষ জানতে পারে, সে করোনা আক্রান্ত, সংগে সংগে সে বুঝে নেয় তার জন্যে কি করুণ মৃত্যু অপেক্ষা করছে! মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। অসুস্থতায় যেখানে নড়তে পারে না, সেখানে খাওয়াটাও তার নিজেকে তৈরি করে খেতে হয়। এক গ্লাস পানি এগিয়ে দেবার কেউ থাকে না। বাথ রুমে যাবার শক্তি নেই। ঘরের মধ্যে মরে থাকলেও দেখার কেউ নেই।

পক্ষান্তরে এই রোগীদের সঙ্গে একটু মিষ্টি করে কথা বললে, একটু আশার বাণী শোনালে, একটু সাহস যোগালে ওরা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠে। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে কিছু ডাক্তার এইসব রোগীর চিকিৎসা দেয়া শুরু করেছেন গত দুমাস ধরে। তাতে এরা জানতে পারছেন কি করতে হবে, কি মেনে চলতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা নিতে পারছেন। এসব রোগীদের কাছাকাছি আসার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

এদের সঙ্গে কথা বলে মনের সাহস বাড়িয়ে দিতে, এই ভীতিকর পরিবেশে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কেউ আশার বাণী শোনালে যে কতটা সাহায্য হয়, তা রোগীদের পাশে না এলে কেউ অনুধাবন করতে পারবে না। বেশিরভাগই সুস্থ হচ্ছেন। সুস্থতার খবর পেলে মনটা এক স্বর্গীয় সুখে ভরে উঠে। হয়তো আরও আগে থেকে এই মিশন চালু করলে ভালো হতো।

বাংলাদেশ দূতাবাসের স্বয়ং রাষ্ট্রদূত মহোদয়সহ দায়িত্বশীলেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বিরূপ পরিস্থিতি আর সীমিত সুযোগের মাঝেও দূতাবাসের এই প্রচেষ্টা প্রসংশার দাবি রাখে যা করোনা সন্দেহ ও আক্রান্ত অসহায় রোগীদের চিকিৎসাসেবা, পরামর্শ, ও তাদের মনোবল বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশনেই।

মহামারী করোনা আজ বিশ্বব্যাপী একমূর্তিমান আতংকের নাম। সারা পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ করোনার কাছে অসহায়। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ হরণ করেও যেন তার এই নিষ্ঠুর খেলা কোনো ভাবেই নিবৃত হচ্ছেনা। জানিনা এর শেষ কোথায়!

ডা. বতুল রহমান
এনএম