দেবিদ্বারে করোনায় মৃত ১০ লাশ দাফনে ছাত্রলীগ

আগের সংবাদ

প্লিজ, কিছু একটা করুন

পরের সংবাদ

সাময়িক সুখে নদী-খাল-বিল

প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২০ , ৯:২৩ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ১২, ২০২০ , ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

মানুষকে অবরুদ্ধ করে প্রকৃতিকে সাময়িকভাবে মুক্তি দিয়েছে করোনাভাইরাস মহামারি। করোনার ছোবল থেকে বাঁচতে গত ২৫ মার্চ থেকে বাংলাদেশে সরকারিভাবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। ফলে বন্ধ হয়ে যায় স্থল-জল-আকাশ পথের সব প্রকার পরিবহন চলাচল, শিল্প-কারখানা, অফিস-আদালত সবকিছু। বন্ধ আছে আগ্রাসী মানুষের পরিবেশ বিনাশী কর্মকাণ্ড। নদী-খাল দখল, ভরাট, শিল্প-কারখানার দূষণ সবকিছু স্তব্ধ আজ। বাহিরের কাজকর্ম সব বন্ধ করে আতঙ্কিত মানুষ নিজ ঘরে অবরুদ্ধ আছে। সবকিছু স্থবির। মানুষ জীবন বাঁচাতে এখন ব্যস্ত। সবাই আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে। পরিবেশের ওপর মানুষের অত্যাচারের সুযোগ কমে গেছে। আর এই সুযোগে প্রকৃতি যেন শান্তিতে আনন্দের সঙ্গে সময় অতিবাহিত করছে।

গত ডিসেম্বরে চীনের উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে চলেছে। করোনার তাণ্ডবে ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর ২১২টি দেশ বিপর্যস্ত। এসব অঞ্চলের সব শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো করোনা মোকাবেলায় নাস্তানাবুদ, কোনোভাবেই বাগে আনা যাচ্ছে না এই ভাইরাসকে। এ পর্যন্ত প্রায় সোয়া চার লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর আসছে বিশ্ব মিডিয়ায়।

প্রাণ ও প্রকৃতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠেছে চলমান লকডাউন আর শাটডাউন। গেল মার্চেই আমরা বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত খবরে দেখতে পেয়েছি কীভাবে ডলফিনেরা আপনমনে খেলা করছে জনশূন্য কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কাছে। মানুষের পদচিহ্নহীন উন্মুক্ত সৈকতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে লাল কাকড়া। ডিম পাড়তে আসছে নানা প্রজাতির কচ্ছপের দল। নির্জনতার সুযোগে প্রায় দুই দশক পর কক্সবাজার সৈকতের বালিয়াড়িতে ফিরে এসেছে সাগরলতা। সেখানে বিপন্নপ্রায় কালিমা পাখিদের ডিম পাড়তে দেখা গেছে। এমনকি ময়লা আবর্জনার বিরতিতে সৈকতের পানিও এখন অনেক পরিষ্কার।

অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে এতদিন এদের দেখা মেলেনি। মানুষের অবাধ বিচরণের কারণে সমুদ্র সৈকতের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য হুমকীর মুখে। করোনার এই দুর্যোগে নির্জনতায় প্রকৃতি তার নিজের পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে এবার রেকর্ড পরিমাণ মাছের ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। হালদা পাড়ের দূষণকারী শিল্পকারখানা এবং বালু উত্তোলন বন্ধ থাকায় হালদার দূষণ রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তাই মা মাছেরা নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ পেয়েছে। এবার হালদা থেকে প্রায় ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি ডিম সংগ্রহ করেছেন স্থানীয় জেলেরা। বুড়িগঙ্গার পানির কাজল কালো রং মুছে গিয়ে ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক রং বর্ষাকালের অনেক আগেই। নদী দখলের প্রতিবেদন আর চোখে পড়ছে না পত্রিকায়।

পদচারণাহীন সৈকতে ডান মেলেছে সবুজ গাছেরা। ছবি: সংগ্রহ।

গত মার্চ মাসে আমি গুগলে “নদী দখল-দূষণ” লিখে সার্চ দিয়ে ১৪টি প্রতিবেদন খুঁজে পেয়েছিলাম। সে সব প্রতিবেদনে নদী দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ, পঞ্চগড়ের ৩৩টি নদী দখল-দূষণের শিকার, সুপেয় পানির সংকট, নদী খননের চিত্র, নদীর অস্তিত্ব সংকট, বালু দিয়ে নদী ভরাটের তথ্যসম্বলিত খবর উঠে এসেছে। অথচ মানুষের গতি থমকে যাওয়ার মাত্র দুই-আড়াই মাসের ব্যবধানে আমরা প্রকৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনজনিত প্রতিবেদনগুলো দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলোতে।

আমরা মানুষ যথেচ্ছাচারভাবে পরিবেশের ওপর অত্যাচার করছি। নদীর স্বচ্ছ পানিতে গৃহস্থালী ময়লা-আবর্জনা এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য ফেলে দূষিত করছি, শিল্প, বাণিজ্য, নগরায়ন ও আবাসনের জন্য নদী জবরদখল করছি, বালু দিয়ে নদী-খাল, জলাভূমি ভরাট করছি। কলকারখানা ও যানবাহনের বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় বায়ু দূষণ করছি। ইচ্ছেমতো গাছ কেটে বন উজার করছি নিজেদের স্বার্থে। একবারও ভাবছি না প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ অন্যান্য প্রাণীদের নিয়ে, যাদের আবাসস্থল এই বন-নদী-গাছপালা প্রকৃতি। বিপন্ন করছে নানা প্রাণীর অস্তিত্ব।

প্রকৃতি সুরক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ টেকসই উন্নয়নের পথে না হেঁটে আমাদের কর্মকাণ্ড পরিবেশকে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। পরিবেশ ধ্বংস করে নিজেদের অস্তিত্ব বিনাশ করার পথকে প্রশস্ত করছি। অথচ, আমাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে সুরক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি না। মুখে বললেও আমাদের সদিচ্ছার কোনো প্রতিফলন দেখছি না।

করোনা আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে আমরা মানুষেরা কীভাবে অন্যান্য প্রাণের জায়গা দখল করে নিয়েছি। পরিবেশ প্রকৃতির ওপর করোনাভাইরাসের প্রভাব হয়তো খুব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কিন্তু মানুষের জীবনে ও দেশের অর্থনীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন আসবে। করোনার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী পুনরুদ্ধার অভিযান আপাতত বন্ধ রয়েছে। এই সুযোগে আবার যেন কোনো দুষ্টচক্র নদী দখল করতে না পারে সেদিকে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রকৃতির এই সাময়িক পরিবর্তন কার্যকরী হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হবে। আচরণের পরিবর্তন সচেতনভাবেই হতে হবে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

এনএম

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়