মেলেনি আইসিইউ, হাসপাতাল বেডেই ২ ভাইয়ের মৃত্যু

আগের সংবাদ

লিবিয়া ট্রাজেডিতে কমলাপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আটক ১

পরের সংবাদ

ঐতিহাসিক ছয় দফা

লড়াইটা ছিল ৬ দফার সঙ্গে ৮ দফার

বোরহান বিশ্বাস

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৭, ২০২০ , ১২:০১ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’র ভূমিকা পড়ছিলাম। যেটি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লিখেছেন। হঠাৎ একটি জায়গায় এসে চমকিত হলাম। এতে উল্লেখ করা হয়েছে ‘৬ দফাকে বাদ দিয়ে কারা ৮ দফা করে আন্দোলন ভিন্নখাতে নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল, সে কাহিনিও এই লেখায় পাওয়া যাবে।’ (পৃষ্ঠা : ১৩)। বিষয়টি আমার আগে জানা ছিল না। তাই বিস্মিত হলাম। এমন ষড়যন্ত্রও তাহলে ৬ দফাকে নিয়ে হয়েছে!

বন্দিদশায় থেকে বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘‘খবরের কাগজের মারফতে দেখতে পেলাম কয়েকটি বিরোধীদল ৮ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে একটা ঐক্য জোট গঠন করেছে। ঐক্য জোটের নাম দেয়া হয়েছে ‘পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলন’। কর্মসূচি পূর্বেই আমি পেয়েছি।’’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা : ২৩৬)।

৬ দফায় আত্মবিশ্বাসী বঙ্গবন্ধু কারাগারে বসে লিখছেন, ‘‘একটা ‘দোষ’ বোধহয় আমার আছে সেটা হলো জনগণ আমাকে ভালোবাসে এবং যে ৬ দফা দাবি করেছি তাহা সমর্থন করে, তাই বোধ হয় এই অত্যাচার। দুনিয়ার ইতিহাসে দেখা গেছে যে কোনো ব্যক্তি জনগণের জন্য এবং তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কোনো প্রোগ্রাম দিয়েছে, যাহা ন্যায্য দাবি বলে জনগণ মেনে নিয়েছে। অত্যাচার করে তাহা দমানো যায় না। যদি সেই ব্যক্তিকে হত্যাও করা যায় কিন্তু দাবি মরে না এবং সেই দাবি আদায়ও হয়।’’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা : ২৩৯)।

আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও ৮ দফার ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিলেন। তাদের উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু লিখছেন, ‘‘আমাদের দলের চার নেতা জহির, রশিদ, মুজিবুর রহমান এবং নূরুল ইসলাম সাহেব তো বিবৃতিই দিয়েছে আট দফা আওয়ামী লীগের ‘মানস পুত্র’ বলে। তাদের বিবৃতিতে মনে হয় ৮ দফা দাবি ৬ দফা দাবির চেয়েও ভালো। আমি এটা স্বীকার করতে পারি নাই, তাই আমার মতামত পূর্বেই দিয়ে দিয়েছি। আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে এর মধ্যে। পূর্ব বাংলার লোকদের ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা, বিশেষ করে মওলানা মওদুদী ও চৌধুরী মহম্মদ আলী। ৮ দফা পূর্ব বাংলাকে ৬ দফা দাবি থেকে মোড় ঘুরাইবার একটা ধোঁকা ছাড়া কিছুই না।’’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা : ২৪১)।

জেলাখানায় বন্দি বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে ওই সময় তার সঙ্গে দেখা করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। কিন্তু ৬ দফায় অটল, অনঢ় ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তাদের বলেছিলেন, ‘আমার ব্যক্তিগত মত ৬ দফার জন্য জেলে এসেছি বের হয়ে ৬ দফার আন্দোলনই করব। যারা রক্ত দিয়েছে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিসনদ ও ৬ দফার জন্য, যারা জেল খেটেছে ও খাটছে তাদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে আমি পারব না।’ (কারাগারের রোজনামচা, পৃষ্ঠা : ২৪২)।

৬ দফা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানেই বঙ্গবন্ধুকে এক সময় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়। আওয়ামী লীগেরই একটি অংশ ৬ দফার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে, দলের মধ্যে ভাঙন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে মুসলিম লীগসহ অন্য সাম্প্রদায়িক দলগুলোও ৬ দফার বিরোধিতায় নামে। মওলানা ভাসানীও ৬ দফাকে সিআইএ’র দলিল বলে আখ্যায়িত করেন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ৬ দফার সমর্থনকারী বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মিকে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকানো হয়। এ কারণে আন্দোলনে রাজপথ অনেকটাই ফাঁকা হয়ে পড়ে।

ওই সময় বঙ্গবন্ধুর পরামর্শেই আন্দোলনের অগ্রণী ভূমিকায় চলে আসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। তারা ৬ দফা দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১১ দফা দাবি পেশ করে। শুরু হয় দূর্বার আন্দোলন। সেই আন্দোলনে ভীত হয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ থেকে মুক্তি দেয়া হয় বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মুষ্টিমেয় কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ ৬ দফাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করলেও বাংলার মেহনতি খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এবং যুব সম্প্রদায়ের কাছে তা ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। আর সেটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে আস্থার জায়গা।

৬ দফা দাবির মূল উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র। এতে ফেডারেল রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কথা বলা হয়। পরবর্তীকালে এই ৬ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলন জোরদার হয়। সেই আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে জন্ম হয় স্বাধীন বাংলাদেশের। এ জন্যই ৬ দফাকে ম্যাগনা কার্টা বা বাঙালির মুক্তির সনদ বলা হয়।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ৭ জুন রক্তস্নাত পথে ৬ দফার মধ্য দিয়ে তা আবার ফিরে আসে এই বাংলায়।

লেখক: সাংবাদিক

এনএম