করোনায় ক্যান্সার রোগীদের করণীয়

আগের সংবাদ

৬ দফা নিয়ে বিদেশিদের ভাবনা

পরের সংবাদ

এই সময়টা একটা বিরাট বিচ্ছেদ

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২০ , ৮:৫৭ অপরাহ্ণ আপডেট: জুন ৭, ২০২০ , ৮:৫৭ অপরাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাতকার
ইনাম আল হক
পাখি বিশেষজ্ঞ

ইনাম আল হক। পাখি বিশেষজ্ঞ, আলোকচিত্রী, লেখক ও পর্যটক। সব ছাপিয়ে একজন নিসর্গপ্রেমী মানুষ। উত্তর মেরু ও অ্যান্টার্কটিকা জয়ী এই একমাত্র বাংলাদেশি পর্যটক। এক সময় কাজ করতেন বিমান বাহিনীতে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসতেন পাখি। সেই ভালোবাসা হয়ে উঠল নেশা। পাখি দেখতে তিনি এখন যান বাংলাদেশের বন বাদাড় থেকে শুরু করে বিশ্বের শেষ সীমা গহীন মেরু অঞ্চল পর্যন্ত।

বার্ড ওয়াচিং এর সাথে সাথে ইদানীং পাহাড়েও চড়েন। তরুণ প্রজন্মকে এই দুটো বিষয়ে আগ্রহী করতে সংগঠক হিসেবেও কাজ করছেন। পাখি ও প্রকৃতি বিষয়ক সচেতনতা তৈরির প্রয়াসে তিনি দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাখিমেলার আয়োজন করে চলেছেন। তিনি বাংলাদেশের ৭০০ প্রজাতির পাখির প্রমিত বাংলা নামের তালিকা প্রস্তুত করেছেন যা জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। ‘বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ’-এর ২৬তম বিভাগে তিনি বাংলাদেশের ৬৫০ প্রজাতির পাখির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছেন। এসব কাজের জন্য পুরস্কৃতও হয়েছেন।

এই পাখি বিশেষজ্ঞের করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপনারা জানেন আমি পাখি নিয়ে কাজ করি। আমাদের কাজই হলো বাইরে যাওয়া। যেমন আমরা গত দশ বছর ধরে মে জুন জুলাই এই তিন মাসে পনেরটা বনে যাই। মধুপুরসহ অনেক বন। বেশিরভাগই চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায়। বনে গিয়ে বনের পাখি গুনি। বনের পাখি গোনা খুবই কঠিন কাজ। জলচর পাখি গোনা খুব সোজা। তারা পানিতে বসে থাকে। দূর থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে তাদের গোনা যায়। যেটা আমরা জানুয়ারি মাসে করি। উপকুল অঞ্চলেও করি। ওই অঞ্চলেও কাজটা করা খুবই সোজা এবং সহজ। কিন্তু বনের পাখি গোনা খুবই কঠিন কাজ। কারণ তাদের দেখা যায় না। তারা পাতার মধ্যে থাকে। হঠাৎ ভাগ্যক্রমে চোখে পড়লে সুবিধা। ওটারও একটা বৈজ্ঞানিক নিয়ম আছে। যা স্যাম্পল নিয়ে গুনে সারা বনের উপর হিসাব করেই করা হয়। এই বছরও আমাদের পাখি গোনার জন্য বনে যাওয়ার কথা ছিল। মে জুন জুলাই তিনটা মাসই অধিকাংশ সময়ই আমাদের বনেই থাকার কথা। সেটা এবার হলো না। আমরা যারা পাখি নিয়ে কাজ করি এটা আমাদের জন্য বিরাট একটা ঘাটতি।

ঘাটতিটা কেমন যদি একটু শেয়ার করতেন? জবাবে এই প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, যেমন অন্যরা আমাদের মতো খুব বড় কিছু মিস করছে না। একজন শিক্ষার্থী স্কুলে কিম্বা কলেজে যেতে পারলো না।কিন্তু তাদের বাবা মা সময় দিলেন, পড়ালেন কিংবা কেউ কেউ অফিসে না গিয়েও বাসা থেকে কানেক্টেড হচ্ছেন। আমি তো এমন কিছুই করতে পারছি না। আমি যদি বনে না যাই তাহলে বনের পাখি গোনা কিছুতেই হবে না। তাই এই সময়টা আমাদের জন্য একটা বিরাট বিচ্ছেদ। এটার কোনো বিকল্প পথ নেই। করোনার কারণে এই কাজটা হচ্ছে না। কিন্তু আমি মার্চের ২০ তারিখ থেকে ঘরেই। প্রায় আড়াই মাস। এই আড়াই মাসে আমি একটা মিনিটও নষ্ট করি নি। খুব তৃপ্তির ব্যাপার। নিজেকে সাজিয়ে নিতে কিছুটা সময় লেগেছে। তবে জীবনটা আগের চেয়ে অনেক সুন্দর এবং গোছানো হয়েছে। হাতে অনেক সময় এসেছে। ফলে অনেক বেশি লিখতে এবং পড়তেও পারছি। পড়া আর লেখাদুটো মেশানো। পড়তে পড়তে হয়তো মনে হলো একটু লিখি। তখন লিখতে বসে যাই।

কি লিখছেন জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই লেখক বলেন, অর্ধেক লিখেছিলাম একটা বই। সেটার কাজ শুরু করেছি। বাংলাদেশের যেসব পাখি খুব কমে গেছে বা হারিয়ে গেছে বলা যায়। একজন বৃটিশ লেখক ফরিদপুরে দুইশ পাখি নিয়ে গবেষনা করেছিলেন। দুইশ পাখি গুলি করে মেরে সেসব শনাক্ত করে সেই পাখিদের নিয়ে ‘বার্ডস অব ফরিদপুর’ নামে একটা বই লিখেছিলেন। সর্বভারতের পুরো অঞ্চলে সবচে প্রাচীন পাখির বই এটি। ঠিক বই হিসেবেও নয়, ওটা ছিল একশ পাতার একটা পত্রিকা। পাখি গবেষকদের পত্রিকা। ওই পত্রিকায় পাখির ওপরে ওই একটাই লেখা ছিল। সেই লেখাটা আমি অনুবাদ করে রেখেছিলাম অনেক আগে। ওখান থেকে আমি একশ পাখি বেছে নিয়েছি। বাংলাদেশে এখন ওই একশ পাখির কী অবস্থা এবং উনি কি বলেছিলেন আজ থেকে একশ ষাট বছর আগে কী অবস্থায় ছিল। ওই দুটো বই প্রকাশিত হবে। এই সুযোগে দুটো বইয়ের কাজ অনেকখানিই শেষ করে এনেছি। শিঘ্রই এর কাজ সম্পন্ন হয়ে যাবে। এছাড়া শিশুদের জন্যও একটা গল্পের বই লিখেছি।

ইনাম আল হক

এছাড়া আমি যতো বই পড়ি তারচে অনেক বেশি বই কিনি। আমার এমন না পড়া অনেক বই আছে। প্রায় দুই বছর পড়ার মতো জরুরী এবং ভালো বই আমার সংগ্রহে আছে। জানি না করোনার এই অভিঘাত কতোদিন চলবে। তবে এই সুযোগে বইগুলো পড়বো।

আমি দুই বছর পাকিস্তানের জেলে ছিলাম। সময়টা হলো ১৯৭১ সালের নভেম্বর থেকে শুরু করে ১৯৭৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। আমি পাকিস্তান এয়ার ফোর্সের অফিসার ছিলাম। সেসময় আমাকে ধরে নিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ওই দুই বছর আমার এক মিনিটের জন্য মনেই হয়নি যে আহা আমি কী করি এখন। কারণ জেলে যখন গেছি, তখন সেখানে যাওয়ার সময় লাগেজ ভর্তি করে না পড়া বই নিয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে বই পড়েছি এবং জেলে অন্যান্য যেসব অফিসার ছিল তাদের কাছ থেকেও বই সংগ্রহ করে পড়তে পড়তে আমার দুই বছর কেটে গেছে। একটা দিনও আমি মিস করিনি। সেই যে লেখাপড়া করেছিলাম ওইটুকু দিয়েই জীবন চালিয়ে গেছি।

করোনার কারণে আপনার চেনা পৃথিবীটা কি বদলেছে বলে মনে করেন? এর জবাবে বিশিষ্ট এই প্রকৃতিপ্রেমী বলেন, বিরাট পরিবর্তন হয়ে গেছে। একটা খুবই বড়ো পরিবর্তন হয়েছে। পাখির সঙ্গে মানুষের দূরত্ব কমে গেছে। আমি সকালে হাঁটতে গেলে দেখতাম, একটা দোয়েল আমার কাছ থেকে দূরত্ব রাখতো দশ বারো ফিট, একটা চড়ুই দূরত্ব রাখতো সাত আট ফিট কিংবা শালিক দূরত্ব রাখতো দশ ফিট, কাক রাখতো পাঁচ ফিট। এখন ওই দূরত্ব কমতে কমতে ওই দূরত্ব একেবারেই কমে গেছে। এখন হাঁটতে গিয়ে দেখি দোয়েল, শালিক, চড়ুই দেড় ফিট দূরত্বে বসে আছে, উড়লও না। যেহেতু মানুষ কম, কেউ তাদের তাড়াও দিচ্ছে না। এই এক দুমাসের মধ্যে পাখিরা ওদের স্বভাবও বদলে ফেলেছে। কারণ গত দুমাস ধরে ওদেরকে উত্যক্ত করার মানুষ নেই। এতে করে আস্তে আস্তে মানুষের সঙ্গে দূরত্বটা কমিয়ে ফেলেছে। এটা আনন্দের খুবই আনন্দের ব্যাপার।

এসবি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়