টাইগার উডসের জানা-অজানা নিয়ে ডকুসিরিজ

আগের সংবাদ

মানিকছড়িতে ইউপিডিএফ সংগঠক অস্ত্রসহ আটক

পরের সংবাদ

লাকী আখন্দের সুর বিহার

রাব্বানী রাব্বি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৬, ২০২০ , ১:০৮ অপরাহ্ণ

দলবেঁধে কোথাও ঘুরতে গেলে কিংবা সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় তরুণ-তরুণীদের মনে অজান্তেই গুনগুন করে ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে/যেখানে নদী এসে থেমে গেছে’ গানটি। এর সুরস্রষ্টা প্রখ্যাত শিল্পী লাকী আখন্দ। রবিবার (৭ জুন) এই কিংবদন্তির ৬৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৫৬ সালের ৭ জুন ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পৈতৃকবাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলায়।

নির্মাতা সৈয়দ সালাউদ্দীন জাকীর ‘ঘুড্ডি’ সিনেমার জন্য তার ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দ গেয়েছিলেন ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি। লাকীর সুরে হ্যাপীর গাওয়া এই গানটিই ফেনোমেননে পরিণত করেছিল লাকী আখন্দকে। রেডিও বা বিটিভিতে যখন গানটি প্রচার হয় তখনই শ্রোতাদের প্রাণে প্রাণ হয়ে উঠেন আখন্দ ব্রাদার্স। এই গানটি লাকী আখন্দের সঙ্গে নাটোরে বেড়াতে গিয়ে লিখেছিলেন গীতিকার এস এম হেদায়েত। আফসোসের বিষয়, মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রয়াত হন হ্যাপী আখন্দ। ক্ষণজন্মা সংগীতশিল্পী ছোট ভাইয়ের স্মৃতিতে লাকী আখন্দ গঠন করেছিলেন ‘হ্যাপী টাচ’ নামের একটি ব্যান্ড। এমনকি সহোদরের মৃত্যুতে যেন খানিকটা মরে গিয়েছিলেন লাকী আখন্দও। প্রায় একযুগ গানবাজনা থেকে দূরে ছিলেন তিনি। এতে লাকীর চরিত্রের অভিমানী দিকটাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার কথা বলতে গেলে চলে আসেন হ্যাপী আখন্দ। আর হ্যাপী আখন্দের কথা বলতে গেলে লাকী আখন্দ। সংগীতানুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠায় দুজনেই ছিলেন যুগল প্রাণ। একজনের সুর, অন্যজনের গাওয়া। কখনো কখনো ডুয়েট। দুই ভাইয়ের কণ্ঠে ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’ কিংবা ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’ গান দুটি আজো বাংলা গানের জগতে সেরা ডুয়েট। এক ভাগ অক্সিজেন আর দুই ভাগ হাউড্রোজেন মিলে যেমন পানির গঠন, তেমনই দুজনের রসায়নে সৃষ্টি হয়েছে কালজয়ী এই গান দুটি। লিরিক্যাল দিক থেকেও গান দুটি অনিন্দ্য সুন্দর।

লাকী আখন্দের গান মানেই গায়কী, সুর এবং সংগীতায়োজনের পাশাপাশি লিরিক্যাল ব্যঞ্জনা। আর ব্যঞ্জনার জন্যই ব্যান্ড সংগীতে উৎসাহী তারুণ্য এখনো গায় ‘পোড়া মনে তোরই কথা/বাড়ে বাড়ে বেজে উঠে/তাই তোকে আর ভুলা হল না রে/এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না’। অর্থাৎ ‘আগে যদি জানতাম’ গানটি। এই গানটি লাকীর প্রথম অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’তে ছিল। তার আগে আশির দশকে এই গানটি লাকীর সুরে প্রথম গেয়েছিলেন ফেরদৌস ওয়াহিদ। লিখেছিলেন নূরুল হুদা। লাকীর সুর-সংগীতায়োজনে অন্যদের গাওয়া বেশকিছু গান যেন লাকীর কণ্ঠে আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠে। ‘আগে যদি জানতাম’, ‘নীল নীল শাড়ি পড়ে’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘মা মনিয়া’ এমন অগণিত গান রয়েছে; যেগুলো অন্যদের গাওয়া হলেও লাকীর কণ্ঠে পেয়েছে বিশেষ মাত্রা।

লাকী আখন্দের পিতা এ কে আবদুল হক হারমোনিয়াম বাজাতে পারতেন। তার কাছ থেকেই লাকী পেয়েছিলেন সংগীতের প্রাথমিক জ্ঞান। ছোটবেলাতে সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন এইচএমভি পাকিস্তানে। দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে চলে গিয়েছিলেন ভারতে। সেখানে সুরকার হিসেবে কাজ করেছেন এইচএমভি ইন্ডিয়ায়। গান গেয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও। এমনকি মাত্র ১১ বছর বয়সে প্লেব্যাক করেছেন ইবনে মিজান পরিচালিত ‘আবার বনবাসে রূপবান’ চলচ্চিত্রে। পরবর্তী সময় সংগীত পরিচালনা করেছেন ‘ঘুড্ডি’, ‘কাজলের দিনরাত্রি’ এবং ‘এই সুন্দর পৃথিবী’ নামের তিনটি চলচ্চিত্রে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তার করা প্রতিটা সিনেমার আবহসংগীত ছিল অনন্য। একদম নিজস্বতার ছাপ। এমনকি দৃশ্যের সঙ্গে মনোমুগ্ধকর সামঞ্জস্য। তার সুর করা গানের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার। কিন্তু সিনেমার কাজ এতো কম কেন, এমন প্রশ্নে লাকী জানিয়েছিলেন- ‘এ দেশের বেশির ভাগ চলচ্চিত্র প্রযোজকই ভারতীয় ছবির গানের একটা অ্যালবাম ধরিয়ে দিয়ে ওটার মতো সুর করতে বলেন। এ কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। কোনো স্বাধীনতা নেই। নিজের ইচ্ছামতো কিছুই করতে পারব না। তাই চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা আমাকে কখনো আকর্ষণ করেনি।’ লাকীর এমন কথা থেকেই ধারণা করা যায়, তখনকার অধিকাংশ চলচ্চিত্রে গানের কী হাল ছিল!

বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে দেখা যায়, সে সময়ের গান-সিনেমা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে লাকীর অসন্তুষ্টি। আর সবকিছু করতেই একজন শিল্পীর জন্য প্রয়োজন স্বাধীনতা। যেমনটা তিনি সবসময় চেয়েছেন, স্বাধীনতাকে নিয়ে গান গেয়েছেন। তবে তার গানে রাজনৈতিক বৈপ্লবিক চেতনার উপস্থিতি প্রত্যক্ষ নয়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে সেসব নিয়ে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন লাকী। মূলত তিনি ছিলেন প্রচণ্ড অভিমানী। তাই হয়তো তার গানে নৈশব্দের সুর বাজে, নিসর্গের স্নিগ্ধতায় হাহাকারের গান গাইছেন যেন এই কিংবদন্তি। যার দীর্ঘশ্বাসের রং সম্ভবত নীল। অভিমান ভরা কণ্ঠে তিনি গাইছেন, ‘এই নীল মণিহার/এই স্বর্ণালি দিনে/তোমায় দিয়ে গেলাম/শুধু মনে রেখো’। অথবা তিনি বলছেন, ‘বিবাগী এই মন নিয়ে/জন্ম আমার/যায় না বাঁধা আমাকে কোনো পিছুটানের মায়ায়’। কিংবা হৃদয় নিংড়াতে গাইছেন ‘পলাতক আমি’, ‘বলেছিলে কাল তুমি আসবে’, ‘তুমি ডাকলেই আমি আসতাম’, ‘আজ আছি কাল নেই’, ‘রীতিনীতি জানি না’ এমন কিছু গান; আর সুরের মূর্ছনায় ভাসছেন সেই গানের শ্রোতা। তার গানে কথা-সুর-ছন্দে ধরেছেন অধরা কোনো আত্মার দহন। গিটার বা কিবোর্ডে যেমন পারদর্শী ছিলেন লাকী আখন্দ, তেমনই ছিলেন সংগীতের বিভিন্ন বিষয়ে মারাত্মক দক্ষতার অধিকারী। গানে যন্ত্রসংগীতের পরিশীলন ব্যবহার করতেন তিনি। আধুনিক বা পপ ঘরানার গান গাইলেও তাকে শুধু এক শিখড়ে বেধেঁ রাখা যাবে না। লোকসংগীত, ক্ল্যাসিক্যাল বা পাশ্চাত্য বিভিন্ন ধারার সংগীত নিয়েও নিরীক্ষাধর্মী কাজ করেছেন বিভিন্ন সময়। তার কণ্ঠে নিরীক্ষাধর্মী গানের মধ্যে অন্যতম ‘তুমি কে বলোনা’ গানটি। লাকী আখন্দের প্রকাশিত অ্যালবাম সংখ্যা সাতটি। তাকে নিয়ে অঞ্জন দত্ত গেয়েছেন স্মৃতিচারণামূলক ‘একজন লাকী আখান্দ’ শিরোনামের একটি গান। ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বাংলাদেশ হারায় মায়েস্ত্রো লাকী আখন্দ।

এসআর