ভেন্টিলেশন সাপোর্টে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম

আগের সংবাদ

চেনা রূপের বাইরে এবার কান’র অদৃশ্য আসর

পরের সংবাদ

মাথার উপর করোনার তলোয়ার ঘুরছে

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৬, ২০২০ , ১২:৩২ অপরাহ্ণ

বিশেষ সাক্ষাৎকার
গোলাম মুরশিদ
গবেষক

গোলাম মুরশিদ। বাংলা ভাষা-সাহিত্যের শক্তিমান লেখক, গবেষক সংবাদ-উপস্থাপক এবং আভিধানিক। ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানবীবিদ্যা ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে তার বিচরণ। তিনি চিন্তার ব্যাপ্তি, গভীরতা, ঋজুতা, স্বকীয়তায় বাঙালিদের মধ্যে অনন্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। গোলাম মুরশিদের প্রবন্ধের সীমানায় পাঠ সীমাবদ্ধ রাখলে তার সৃজনশীল সত্তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় না। কেবল প্রবন্ধে আটকে থাকলে বিশাল মহাকালের বৃত্তের মধ্যে কয়েক ফোঁটা জলের অস্তিত্ব আবিষ্কারের মতো অনুভূতি হবে কেবল। তিনি গিয়েছেন সেপর্যন্ত, যেখানে সমস্ত বীজ শুরু। তিনি পৌঁছে গেছেন সেপর্যন্ত, যাকে বলে ‘ভবিষ্যৎ’, যে বিন্দুতে গিয়ে সামনের পথের রেখা দেখা যায়। শান্ত স্বরে, অন্তঃশক্তির জোরে গোলাম মুরশিদ ইতিহাসকে গল্পের মতো তুলে ধরেছেন। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত তার মাইকেল-জীবনী ‘আশার ছলনে ভুলি’তে তিনি কিংবদন্তির ধূম্রজাল থেকে মুক্তি দিয়ে মাইকেলের জীবন বস্তুনিষ্ঠভাবে পুনর্নিমাণ করেছিলেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত তার ‘হাজার বছরের বাংলা সংস্কৃতি’ এমনই একটি মননশীল এবং পথিকৃতের কাজ। এছাড়া তার প্রতিটি গ্রন্থই এক-একটি রত্ন যেন।

তিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রায় দুই দশক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৮৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি লন্ডনের বিবিসি বাংলা বিভাগে কাজ করেছেন। এছাড়া লন্ডনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষে বর্তমানে অবসর জীবনে প্রধানত লন্ডনেই বাস করেন।

বহুমাত্রিক এই লেখকের করোনাকাল কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সময়টা দুঃসময়। খুব ভালোভাবে যে কাটছে একথা বলব না। তবে আমি যখন বুঝতে পারলাম এই সময়টা এত দ্রুত চলে যাবে না। তখন আমি একটা বই লেখার পরিকল্পনা করছিলাম; সেই বইটা লিখতে শুরু করেছি। বইটার নাম ‘বাংলা গানের ইতিহাস’। আমি সময়টাকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করার চেষ্টা করছি।

আর বইটা লেখার জন্য যেসব বই পড়াশোনা করা দরকার সেসব বইই পড়ছি মূলত। করোনার এই সময়টায় আপনার চেনা পৃথিবীর কতটা বদল ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে? এর জবাবে বিশিষ্ট এই লেখক বলেন, এই পৃথিবীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই ৩ মাস। আমি বাড়ি থেকে বেরোইনি। আমাদের এই বাড়ি থেকে বাইরের কোনোও কিছু দেখাও যায় না। বলা যেতে পারে আমি অন্তরীণ। স্বেচ্ছায় অন্তরীণ বা নিজে নিজেই অন্তরীণ। সত্যিই পরিপাশর্^ সম্পর্কে আমি কোনো কিছুই আঁচ করতে পারছি না। আমি রাতে একটু নিউজ দেখি। তখন দেশের পরিস্থিতি কী সেটা বোঝার চেষ্টা করি। তবে বেশ আঁচ করতে পারছি বটে আমার চেনা পৃথিবীটা বদলে যাচ্ছে। এর গ্রাভিটি বা মাধ্যাকর্ষণ কতটা বদলে যাচ্ছে তার ফলাফল কতটা সিরিয়াস সেটা ঠিক অনুমান করতে পারছি না। তার কারণ আমাদের জীবদ্দশায় আমরা কোনোদিন এ রকম পরিস্থিতিতে পড়িনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে একটা সংকটে পড়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল চেনা পৃথিবীটা বোধহয় বদলে গেল। এবারে তার থেকেও বেশি বদলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে মাথার উপর করোনার তলোয়ার ঘুরছে। আর দুলছে। যে কোনো মুহূর্তে ছিঁড়ে পড়তে পারে। অদৃশ্য কিন্তু তার ফলাফলটা খুবই দৃশ্যমান।

এই যে করোনার তলোয়ার ঘুরছে, এর অভিঘাত থেকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলে মনে করেন কী? জবাবে এই সমাজচিন্তক বলেন, বাংলাদেশ কেন সারা পৃথিবীই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলেই আমি মনে করি। আমার ধারণা, এই করোনা যদি আইসোলেটেড ২টা/৪টা দেশে হতো তাহলে সেই দেশগুলোর পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো খুবই মুশকিল হতো। কিন্তু এর অভিঘাত যেহেতু সারা পৃথিবীজুড়ে। সমস্ত পৃথিবীকেই যেন হেঁচকা টানে ১০ বছর পিছিয়ে দিয়েছে! সেখান থেকে আবার সবাই দৌড় দেবে এবং সেই দৌড়ে যদি বুদ্ধি মতোন চলতে পারে; তাহলে সেই দৌড়ে কে জিতবে সেটা নির্ভর করে কি স্ট্যাটেজি নেবে সেই দেশগুলো তার ওপরই।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ, প্রকৃতির ওপর যথেচ্ছারের ফলে এই উন্মত্ততা? আপনার কী মনে হয়? এর জবাবে এই বিশিষ্ট লেখক বলেন, যখন করোনা শুরু হলো তখন ‘প্রকৃতির প্রতিশোধ’ নামে আমি একটা ছোট লেখা লিখতে শুরু করেছিলাম। সত্যি সত্যিই প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। প্রকৃতি দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা যে কৃত্রিমতার মধ্যে ছিলাম সেটা নিয়ে বাস করা যায় না। আমরা স্বার্থপরতার যে চরম দৃষ্টান্ত রাখছিলাম সেই স্বার্থপরতা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এজন্য সত্যি সত্যিই প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। এখন চারদিকে বন্যা হচ্ছে, সাইক্লোন হচ্ছে, সুনামি হচ্ছে, খরা হচ্ছে- এ সমস্ত জিনিস ফিরিয়ে প্রকৃতি বুঝিয়ে দিচ্ছিল তোমরা সাবধান হও। কিন্তু আমরা সাবধান হইনি। ফলে এখন প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নিচ্ছে।

আমি আবারো বলছি, প্রকৃতির ওপর আমরা অত্যাচার করেছি। প্রকৃতি তার ফল দেখাতে শুরু করেছিল নানা দুর্যোগ দৃষ্টি করে। এবারের দুর্যোগটা হচ্ছে সবচেয়ে বড়। তা না হলে পৃথিবীর সমস্ত মানুষ একটা ঘটনার কথা শুনে ঘরের মধ্যে ঢুকে গেল! এমন বিচিত্র অভিজ্ঞতা এর আগে কখনো হয়েছে বলে আমার মনে হয় না।

এসআর