লকডাউনে ইনস্টাগ্রামে সর্বোচ্চ আয় রোনালদোর

আগের সংবাদ

আমলাতন্ত্র নির্ভরতা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না

পরের সংবাদ

গণপরিবহনে নৈরাজ্য

অতিরিক্ত ভাড়া আদায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত

দেব দুলাল মিত্র 

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৬, ২০২০ , ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

সড়কে গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়ার নৈরাজ্য চলছেই। কোনোভাবেই পরিবহন কর্মীদের বেশি ভাড়া নেয়া ঠেকানো যাচ্ছে না। শহরে লোকাল বাসের কর্মীরা যাত্রীদের কাছ থেকে প্রতিদিনই দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে। দাঁড়িয়েও যাত্রী বহন করা হচ্ছে। একই অবস্থা দেখা গেছে দূরপাল্লার বাসে। ৬০ শতাংশ বর্ধিত ভাড়া আদায়ের কথা থাকলেও পরিবহন কোম্পানিগুলো যাত্রীদের কাছ থেকে ৯০ শতাংশ আবার কেউ কেউ ১০০ শতাংশ বেশি ভাড়া আদায় করছে। ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীর সংখ্যা কমে গেছে। ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া আদায় করলেও স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে কেউ তোয়াক্কা করছে না।
এদিকে বাসে বাড়তি ভাড়া আদায়, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার বিষয়টি স্বীকার করে গণপরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের কঠোর সমালোচনা করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শুক্রবার ( ৫ জুন ) সকালে তার সরকারি বাসভবন থেকে আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপকমিটির করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ ও চিকিৎসা সহায়তা নিয়ে অনলাইন প্রশিক্ষণে যুক্ত হয়ে এই সমালোচনা করেন তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি না মানা এবং ভাড়া বাড়ানো নিয়ে জনগণ এখন সমালোচনামুখর। এই অবস্থায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং অর্ধেক আসনের বেশি যাত্রী উঠানো পরিবহন মালিকদের প্রতিশ্রুতি ভঙের শামিল।
জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে একজন যাত্রী নওগাঁ থেকে ৪০০ টাকায় ঢাকা আসতে পারতেন। ভাড়া বাড়ানোর পর সরকারের হিসাব অনুযায়ী ৬৪০ টাকা হয়েছে। কিন্তু এই রুটের প্রায় সব পরিবহন কোম্পানি যাত্রীদের কাছ থেকে দ্বিগুণ অর্থাৎ ৮০০ টাকা নিচ্ছে। কয়েকদিন আগে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কারণে শ্যামলী পরিবহনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু তারপরও অতিরিক্ত ভাড়া আদায় অব্যাহত রয়েছে।
পরিবহন কর্মী হেলাল ও এরশাদ জানান, লোকাল ও দূরপাল্লার বাসে যাত্রী কমেছে। যাত্রী কমে যাওয়ায় ট্রিপের সংখ্যাও কমেছে। স্বাভাবিক সময়ে গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বড় পরিবহন কোম্পানিগুলোর কমপক্ষে ১৫টি বাস ছেড়ে যেত। অনেক সময় এক ঘণ্টা পর পর বাস ছাড়াত। যাত্রী সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন ৩ ঘণ্টায়ও একটি বাস ছাড়ছে না। যাত্রীর স্বল্পতা প্রকট। সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে স্বাভাবিক সময়ে ৩০ মিনিট পর পর বাস যাত্রী নিয়ে টার্মিনাল ত্যাগ করত। এখন আড়াই ঘণ্টায়ও একটি বাস ছাড়া যাচ্ছে না। গুলিস্তান থেকেও ৩০ মিনিট পর পর বাস বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যেত। এখন ২ ঘণ্টাতেও তা সম্ভব হচ্ছে না। যাত্রী স্বল্পতার কারণে দূরপাল্লার বাসগুলো অর্ধেক সিট পূর্ণ করতে পারছে না। নন-এসি বাসে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে আগে ৪৭০ টাকা ভাড়া ছিল এখন তা বাস বিশেষে ৬৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এসি বাসের ১২০০ টাকার ভাড়া বেড়ে এখন ২০০০ থেকে ২২শ টাকা হয়েছে। একদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া এবং অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়ার কারণেই যাত্রী কমেছে।
পরিবহন শ্রমিকরা আরো জানান, টার্মিনালগুলো এখনো ফাঁকা। যাদের বেশি জরুরি প্রয়োজন আছে শুধু তারাই যাতায়াত করছে। ছোট পরিবহন কোম্পানিগুলো কিছুটা কম ভাড়ায় যাত্রী নিতে চাইলেও তারা যাত্রী পাচ্ছে না। ঢাকা-সিলেট রুটেও বাস ভাড়া একই হারে বেড়েছে। নন-এসি বাসের ভাড়া ৪৮০ টাকা থেকে সাড়ে সাতশ এবং এসি বাসে ২ হাজার টাকা হয়েছে। নোয়াখালীগামী বাসে ৩০০ টাকার ভাড়া এখন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়েছে। গুলিস্তান থেকে মানিকগঞ্জ যাওয়ার ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। একটি বাসে ৪০ সিটে ৪ হাজার টাকা আয় হতো। এখন অর্ধেক যাত্রী নেয়ার পরও যাত্রী প্রতি ২০০ টাকা অর্থাৎ দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
রাজধানীর লোকাল বাসেও বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে বাস কন্ডাক্টর ও যাত্রীদের মধ্যে তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটছে। বাসের লোকজন দ্বিগুণ ভাড়া আদায় করছে। গাবতলী থেকে উত্তরায় যাওয়ার জন্য ৬০ টাকার ভাড়া এখন ১২০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এদিকে গণপরিবহনগুলো স্বাস্থ্যবিধিরও কোনো তোয়াক্কা করছে না। দূরপাল্লার বাসে স্বাস্থ্যবিধি কিছুটা মানা হলেও লোকাল বাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী ওঠা-নামা করানো হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোনো গণপরিবহনেই স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না। নামকাওয়াস্তে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রথম দুইদিন বাসের ভেতরে জীবাণুনাশক ছিটানো হলেও এখন তা আর দেখা যাচ্ছে না। বাসের কর্মী ও যাত্রী উভয়ের কাছেই স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত। বাসগুলো স্ট্যান্ডে এসে থামার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীরা আগের মতোই হুড়মুড় করে গায়ে গা লাগিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন। বাস থেকে নামার সময়ও একই অবস্থা। মোহাম্মদপুর-ডেমরা রুটের স্বাধীন পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে চালক এবং যাত্রীদের কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। ফার্মগেট থেকে ডেমরা পর্যন্ত সব বাসস্ট্যান্ডেই সিটের অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে দেখা গেছে। সব রুটের লেগুনাগুলোতে সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করা হচ্ছে। এতে জীবাণুনাশক স্প্রে ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহার হচ্ছে না।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, গণপরিবহনের ভাড়া বাড়িয়ে সরকার সড়কে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি আরো বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। বাড়তি ভাড়ার নামে যাত্রীদের পকেট কাটা হচ্ছে। সরকার ভাড়া না বাড়িয়ে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে দিলে যাত্রীরা হয়রানির শিকার হতেন না। এখন মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও নেই।
যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সামসুদ্দীন চৌধুরী জানান, দেশের ৮৫ শতাংশ যাত্রী গণপরিবহনে চলাচল করে। করোনার এই দুর্দিনে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত একেবারেই অযৌক্তিক এবং জনস্বার্থবিরোধী।

এসআর