বিশ্ব পরিবেশ ও করোনা

আগের সংবাদ

মার্কিনি বর্ণবাদ সহসা মুছে যাবার নয়

পরের সংবাদ

স্বাধীনতার বাণী সমুন্নত রাখতে হবে

ড. মিল্টন বিশ্বাস

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৫, ২০২০ , ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির যুগে এসেও আমেরিকায় বর্ণবাদের ঘটনা করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে আমাদের বিহ্বল ও ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। আসলে শ্বেতাঙ্গরা সত্য থেকে অনেক দূরে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের বিশাল পরিবর্তন, অগ্রগতি এখনো শ্বেতাঙ্গদের চোখে পড়ে না। তারা বিশ্বকে ককেশীয় চশমা, গোলাপ রংয়ের ভেতর দিয়ে দেখে।

‘প্রতিটি মানুষই সমান এবং একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি’- এই বাণীকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বাণী রচিত হয়েছিল আজ থেকে ২৪৩ বছর আগে। অথচ ২০২০ সালে যেখানে করোনা ভাইরাসের মহামারিতে দিশাহারা পৃথিবী, যখন আমরা ভাবছি মানুষ পাল্টে যাবে ব্যাধি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কর্তৃক ঘৃণ্য হত্যাকাণ্ড বিশ্বকে হতবাক করে দিয়েছে। খোদ আমেরিকায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে লক্ষাধিক মানুষ। ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো জর্জ ফ্লয়েডের হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও লুটপাটে সাধারণ মানুষকে কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রে এ ধরনের হত্যা মানুষকে সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে বাঁচার সুযোগ নষ্ট করে হতাশার সাগরে নিক্ষেপ করেছে। ঘাড়ে হাঁটু বাঁধিয়ে মাটিতে ঠেসে ধরে জর্জ ফ্লয়েড নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির হত্যার ভিডিও দেখে আমরা যন্ত্রণায় কাতর হয়ে উঠেছি। কেবল মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনেপোলিস শহরে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েড খুন নয় জর্জিয়ায় প্রতিবেশী এক শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তির গুলিতে ২৫ বছর বয়সী নিরস্ত্র কৃষ্ণাঙ্গ যুবক আহমুদ আরবেরির মৃত্যুর ঘটনারও আমরা প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
আসলে ২৫ মে পথচারীদের ভিডিও এবং সিসিটিভিতে ধারণকৃত ফুটেজে দেখা যায় ফ্লয়েডকে (৪৬) গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশ অফিসার তার ঘাড় চেপে রাখায় শ্বাস নিতে কষ্ট হলেও মুক্ত না করায় তার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। ওই অফিসারের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এবং এ সপ্তাহে আদালতে হাজির হবেন তিনি। অপর তিন পুলিশ অফিসারকেও বরখাস্ত করা হয়েছেন। ১ জুন এক অফিসিয়াল ময়নাতদন্তের মাধ্যমে ফ্লয়েডের মৃত্যুকে একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
জর্জ ফ্লয়েডের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৭৫টিরও বেশি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। করোনা ভাইরাস মহামারিজনিত কারণে যেসব রাস্তা নির্জন ছিল, তা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিক্ষোভকারীদের দ্বারা পূর্ণ হয়েছে। বিক্ষোভের মুখে ৪০টিরও বেশি শহর তাদের কারফিউ আরোপ করেছে বা বাড়িয়ে দিয়েছে। নিউইয়র্কের হাজার হাজার মানুষ মিছিল করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ভিডিও ফুটেজে বিখ্যাত শহরগুলোর বড় বড় দোকানে লুটপাট দেখানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেকদিন থেকেই আফ্রিকান-আমেরিকানদের মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেসব ঘটনায় পুলিশ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে সেগুলোর জন্য পরিসংখ্যান বলে দেয়, মার্কিন জনসংখ্যার শ্বেতাঙ্গদের সামগ্রিক সংখ্যার তুলনায় মারাত্মকভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কৃষ্ণাঙ্গদের অনেক বেশি। ২০১৯ সালের আদমশুমারির পরিসংখ্যান অনুসারে আফ্রিকান-আমেরিকানরা জনসংখ্যার মাত্র ১৪ শতাংশ, অথচ তারা পুলিশের গোলাগুলির শিকার ২৩ শতাংশের বেশি। ২০১৭ সাল থেকে শ্বেতাঙ্গ আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কমেছে, বেড়েছে কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতন।
দ্বিতীয়ত, মাদকের অপব্যবহার তথা সেবনের জন্য শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে উচ্চতর হারে গ্রেপ্তার হয় কৃষ্ণাঙ্গরা। হিস্পানিকদের কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া বিরূপ আচরণের শিকার হন এশিয়ান, আমেরিকান-ভারতীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের লোক। ২০১৮ সালে মাদক সেবনের জন্য যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তাদের মধ্যে প্রতি এক লাখে আফ্রিকান-আমেরিকান ছিল প্রায় ৭৫০ জন এবং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান ৩৫০ জন। অর্থাৎ মাদক সেবনের ক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গরা কৃষ্ণাঙ্গদের মতোই অপব্যবহারে অভ্যস্ত হলেও কিংবা তাদের সংখ্যা সমহারে চিহ্নিত হলেও গ্রেপ্তার করার ক্ষেত্রে আফ্রিকান-আমেরিকানদের সংখ্যাটা বেশি। একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের গাঁজা রাখার দায়ে সাদাদের চেয়ে ৩.৭ গুণ বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে যদিও বর্ণগতভাবে উভয় জনগোষ্ঠীর গাঁজা সেবনের হার তুলনামূলকভাবে একই ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে দশকের পর দশক ধরে বর্ণবাদ চলে আসছে। পুলিশের বর্বরতার বিরুদ্ধে লড়াই করা নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো স্পষ্টত বলেছে- ‘আপনি যদি কালো বর্ণের হন, তাহলে আপনি হত্যার শিকার হবেন।’ শ্বেতাঙ্গের চেয়ে তিনগুণ বেশি কৃষ্ণাঙ্গ মারা যান পুলিশের হেফাজতে। পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতার বেশির ভাগ শিকার হন কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিরা। নিউইয়র্কে সামাজিক দূরত্ব নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে পুলিশ যাদের গ্রেপ্তার করেছে, তাদের ৮০-৯০ শতাংশই কৃষ্ণাঙ্গ বা লাতিনো।
অর্থাৎ করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের দিকে তাকালেও শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গেও বৈষম্য স্পষ্টভাবে বোঝা যাবে। করোনায় সাদা চামড়ার মানুষের চেয়ে কালোরা অনেক বেশি আক্রান্ত হয়েছে। এই তথ্য শুধু করোনো মহামারিকালেই নয়, অন্য সময়েও খাটে। দেশটিতে শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের গড় আয়ু তিন বছর কম। ঘনবসতি, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং অপরাধপ্রবণ নগরে বসবাস করে অনেক কৃষ্ণাঙ্গ। আর্থিক অনটন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। ফলে সন্তানদের সাধারণ স্কুলে পড়াতে বাধ্য হয় এসব মানুষ। স্বাভাবিক সময়েও যুক্তরাষ্ট্রে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে সাদা-কালোর বৈষম্য রয়েছে। শ্বেতাঙ্গরা কারাগারে কম সময় বাঁচে। আর কারাগারের বাইরে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিদের চেয়ে কারাগারে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যুহার কম। এর অর্থ হলো, বাইরের চেয়ে কারাগারে ভালো চিকিৎসাসেবা পায় কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিরা।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভ‚তপূর্ব সমৃদ্ধির যুগে এসেও আমেরিকায় বর্ণবাদের ঘটনা করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে আমাদের বিহ্বল ও ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। আসলে শ্বেতাঙ্গরা সত্য থেকে অনেক দূরে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বের বিশাল পরিবর্তন, অগ্রগতি এখনো শ্বেতাঙ্গদের চোখে পড়ে না। তারা বিশ্বকে ককেশীয় চশমা, গোলাপ রংয়ের ভেতর দিয়ে দেখে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশি ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হবে আর বিক্ষোভ প্রশমনের জন্য জনগণকে ন্যায্য বিচার পাওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করতে হবে। কারণ গণবিক্ষোভকে শুধু বামপন্থিদের অরাজকতা বলে উড়িয়ে দিলেও কিংবা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরাপত্তাবাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও করোনা ভাইরাস মহামারির মধ্যে দেশটি যখন বিপর্যস্ত, তখন বিশাল এই বিক্ষোভ নতুন বিপদে ফেলেছে দেশটিকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ঐক্যবদ্ধ জাতির কথা বারবার উচ্চারিত হচ্ছে। আর এই ঐক্য যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার বাণীতে পরিশ্রুত হতে হবে। তাহলেই মিলবে মুক্তি।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

এসআর