মৃত্যু ছাড়ালো ৮শ, আক্রান্ত ৬০ হাজারের বেশি

আগের সংবাদ

প্রত্যেকটা সৌন্দর্যসৃষ্টিই শিল্পীর সামাজিক দায়

পরের সংবাদ

প্রবন্ধ

একজন নির্ভেজাল বাঙালির জন্য

সালেক নাছির উদ্দিন

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৫, ২০২০ , ২:৪৮ অপরাহ্ণ

২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বরে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের নীরব অনুপ্রেরণাদাত্রী স্ত্রী দীপ্তি লোহানীর প্রয়াণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন কামাল লোহানী। শরীরের বিভিন্ন অসুস্থতাও জেঁকে বসে। এরপরও সভা-সেমিনারে ছুটে যান। প্রতিনিয়ত ভোরের কাগজসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে দেশের নানা সমকালীন ইস্যু নিয়ে লিখছেন। কামাল লোহানী সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী এবং দেশপ্রেমিক পুরুষ হিসেবে অনন্য। তাঁর তুলনা কেবল তিনিই। তাঁর জীবনের সব কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মঙ্গলে নিয়োজিত ছিল এবং আজো অব্যাহত আছে।

দেশের খ্যাতিমান সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। স্বাস্থ্যের কিছুটা উন্নতি হলে গত বুধবার থেকে বাসায় অবস্থান করছেন। তাঁর ফুসফুস ও কিডনিতে সমস্যা অনেকদিন ধরে। এছাড়াও হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের সমস্যাতেও ভুগছেন তিনি। তাঁর শারীরিক অবস্থা উন্নতি হলেও তিনি ঝুঁকিমুক্ত নন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। জানা গেছে, অসুস্থ থাকা অবস্থায় কামাল লোহানীর চিকিৎসার খোঁজখবর নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শ্রদ্ধালু আপা, আপনি খোঁজ নিলে ভরসা বাড়ে আমাদের। নীতিনিষ্ঠ মানুষটির প্রতি রাষ্ট্রের নিশ্চয়ই দায়িত্ব আছে।
স্বাধীনতা-উত্তরকালের স্বাধীন সাংবাদিকতার একনিষ্ঠ মানুষ কামাল লোহানী। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তীকালের সামরিক শাসন কিংবা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ ছিল অবধারিত। কয়েকটি পত্রিকার সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সমাজে বিরাজমান অন্যায়, অনিয়ম ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সব সময় সরব ছিলেন, উচ্চকণ্ঠী ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিকের ভ‚মিকা পালন করেছেন। যিনি কালের পরিক্রমায় নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে কামাল ভাইয়ের ভ‚মিকা ছিল অত্যন্ত গৌরবজনক। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিলেন। দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এছাড়া নানা কথামালার অনুষ্ঠানসহ সংবাদ পাঠ ও কবিতা আবৃত্তিতে তিনি নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করতেন। ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কামাল লোহানী ঢাকা বেতারের প্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এর আগে ১৯৫৩ সালে নুরুল আমিনসহ মুসলিম লীগ নেতাদের পাবনা আগমনের প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলায় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে কামাল লোহানী ও তাঁর অন্য সহযোদ্ধারা গ্রেপ্তার হন। ১৯৫৫ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের সঙ্গে একই জেলকক্ষে বন্দিজীবন কাটান। তখন তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসেন। স্বাধীনতার পরও দেশের সংকটে তাঁর ভ‚মিকা অনন্য। ’৭১-এ মানবতা বিরোধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। ধর্মীয় সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার থেকেছেন। সাগর-রুনি, ত্বকী, তনুসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সামনে থেকেছেন। রাজপথে নেমেছেন। মানববন্ধনে দাঁড়িয়েছেন। মিছিল করেছেন। আন্দোলনে সাহস জুগিয়েছেন। আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি দুহাত ভরে লিখছেন। তাঁর লেখা প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে-‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কি’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এদেশ আমার গর্ব’, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘যেন ভুলে না যাই’, ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’। প্রকাশিতব্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘ভাষা আন্দোলনের কথকতা’, ‘সাংবাদিকতার সাতকাহন’, ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’। এছাড়াও তাঁর ঘটনাবহুল সাংবাদিক জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজের কথা লেখ্যরূপে প্রেস ইনস্টিটিউট অফ বাংলাদেশ প্রকাশ করেছে ‘অগ্রজের সঙ্গে একদিন’। তিনি বর্তমানে স্মৃতিকথা লেখায় নিজেকে ব্যাপৃত করেছেন।

২০০৭ সালের ২৪ নভেম্বরে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের নীরব অনুপ্রেরণাদাত্রী স্ত্রী দীপ্তি লোহানীর প্রয়াণে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন কামাল লোহানী। শরীরের বিভিন্ন অসুস্থতাও জেঁকে বসে। এরপরও সভা-সেমিনারে ছুটে যান। প্রতিনিয়ত ভোরের কাগজসহ বেশ কয়েকটি দৈনিকে দেশের নানা সমকালীন ইস্যু নিয়ে লিখছেন। কামাল লোহানী সাংবাদিক, সংস্কৃতিসেবী এবং দেশপ্রেমিক পুরুষ হিসেবে অনন্য। তাঁর তুলনা কেবল তিনিই। তিনি দেশের সাধারণ জনগণের কথা ভাবতেন এবং তাঁর জীবনের সব কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মঙ্গলে নিয়োজিত ছিল এবং আজো অব্যাহত আছে। কামাল লোহানীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরে এমন আপাদমস্তক বাঙালি আর দেখা যায় না। এখনো তিনি তাই আছেন- একান্তভাবে সোনার বাংলার মানুষ হয়েই। এই মানুষটির প্রতি আমার প্রগাঢ় শ্রদ্ধা। একজন নির্ভেজাল বাঙালির প্রতিকৃতি প্রিয় লোহানী ভাই আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরবেন- এই প্রার্থনা করছি।

এসআর