দেখতে দেখতে ৯ বছর

আগের সংবাদ

ফিরে আসতে চাই: সানি

পরের সংবাদ

বই পাঠ

আবদুল মান্নান সৈয়দ ও আধুনিক পুতুলনাচের ইতিকথা

আশরাফ উদ্দীন আহ্মদ

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৫, ২০২০ , ২:০০ অপরাহ্ণ

আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৩৯-২০১২) বাংলা সাহিত্যের বহুমাত্রিক প্রতিভার নাম। সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যেখানে তার পদচারণ হয়নি। ষাট দশকের একঝাঁক সাহিত্যসেবীর মধ্যে মান্নান সৈয়দ তার দৃষ্টান্ত রেখেছেন নির্দ্বিধায় বলা যায়। গল্প-উপন্যাসের পরীক্ষামূলক রীতিবৈশিষ্ট্য তাকে একটা স্তরে পৌঁছানোর মান নির্ধারণ করেছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বাংলাসাহিত্যকে বিশ্বদরবারে ব্যাপকভাবে পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন সন্দেহ নেই, তার চিন্তা-চেতনার বহিঃপ্রকাশ লক্ষ করা যায় সর্বত্র, অনুরূপভাবে মান্নান সৈয়দ সাহিত্যের ভাষাকে সজীব এবং প্রাণবন্ত করেছেন। তার গল্পের চরিত্রেরা বড় দুর্ভাগ্য নিয়ে অবতীর্ণ হয়, সময়ের চেয়ে দুঃসময় তাকে বড় বেশি পিছু টানে। ‘আধুনিক পুতুলনাচের ইতিকথা’কে উপন্যাসিকা বললে নেহাত ভুল হবে না। মান্নান দেশভাগের বা বাংলা বিভাজনের সারমর্ম ফুটিয়ে তুলেছেন। দেশ-মাটি প্রকৃতিহারা একজন মানুষ কতটা সুস্থ থাকতে পারে এবং তার ভেতর দিয়ে কীভাবে সে একটু-একটু বড় হয়, বিকশিত হয় তার একটা ইঙ্গিত মান্নান সৈয়দ এ উপন্যাসের আখ্যানে দিয়েছেন। যেমন করে ‘ইছামতির এপার-ওপার’ বা ‘ভাঙানৌকা’য় দেশভাগের মর্মস্পর্শী একটা ছবি তুলে এনেছেন, সেখানে মানব-মানবীর প্রেম থেকে মানুষের নিষ্ঠুর একটা হতশ্রীমার্কা ছবিও দেখতে পাওয়া যায়। মান্নান সৈয়দ জাদুস্পর্শে বাংলাসাহিত্যকে নতুন ধারায় বিকশিত করেছেন যেমন সত্য, তেমন চেনা-জানা মানুষকে নতুন পরিচয়ে নতুন আঙ্গিকে পাঠকের সামনে বা মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছেন। সেখানে তার কোনো ভণিতা নেই, যা সত্য বা যা তিনি সত্য বলে বিশ্বাস করেন, তা যেন ফুটিয়ে তুলেছেন সপ্তসুরের ঝঙ্কারে। মান্নানের চরিত্রেরা সব জীবন্ত-প্রাণবন্ত, কারো ভেতরে কোনো গোপনীয়তা নেই, সবাই সবাইকে ভালোবাসে, তারপরও সময়ের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়, আর তখনই দেশভাগের মতো করুণ আর্তনাদ পাঠকের কানে আসে। পাঠক হতবিহ্বল হয়ে সামনে-পেছনে তাকিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, দেশভাগ অনিবার্য ছিল, একশত নব্বই বছরের ব্রিটিশের কাছ থেকে অবহেলা-করুণা আর অবজ্ঞার ফলস্বরূপ দেশভাগ বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানদের একটা স্বতন্ত্র সম্মানের আসনে অধিষ্টিত করেছে এবং সে কারণে দেশভাগ বিশেষ করে বাংলা বিভাজন এ অঞ্চলের নিম্নবিত্ত বা খেটেখাওয়া মানুষের কাছে আশীর্বাদ। মান্নান সৈয়দ আধুনিক পুতুলনাচের ইতিকথায় দেশভাগের মর্মবাণী ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘আধুনিক পুতুলনাচের ইতিকথা’য় দেখা যায় দেশভাগের মর্মান্তিক পরিণতি, যার ভেতর দিয়ে একটা পরিবারের নিঃশেষ হওয়ার কাহিনী ফুটে উঠেছে। দেশভাগ বা ভারতবর্ষ বিভাজন বাঙালি মুসলমানকে একটা দীর্ঘমেয়াদি শান্তির বাতাবরণ তৈরি করে দিয়েছে সত্য, কিন্তু কিছু পরিবার তো বাস্তবিক বিলীন হয়ে গেছে। উপন্যাসের শেষভাগে দেখা যায়, আব্দুল করিম সাতক্ষীরা থেকে টেলিফোন পেয়েই ঢাকায় ছুটে আসেন, কারণ মেডিকেল কলেজের এক্স-প্রিন্সিপাল খোন্দকার আশরাফুল আলম ইন্তেকাল করেছেন। নানার সঙ্গে শেষ দেখাটা হলো না বলে আব্দুল করিম চোখের পানি ফেললেন, কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলেন ঘনঘন, সব যেন শেষ হয়ে গেল। একজন দানশীল মহান মানুষের প্রস্থান তাকে বড় বেশি ভাবিয়ে তোলে। রাবিয়ার বাড়িতে খেতে বসে অনেক গল্পের ছলে জানালো তার বড়ভাই অর্থাৎ রাবিয়ার বাপ আব্দুল রহিম হোমিওপ্যাথ করেন। বাইরের ঘরটায় যে তক্তপোশ আছে, সেখান থেকে তোশক-চাদর সরিয়ে খালি কাঠের ওপর শুয়ে থাকে রাত্রিবেলা, আর মাথার নিচে পিঁড়ি দিয়ে, যা একসময় তাদের আব্বা সৈয়দ মেহের আলীও করতেন। শেষ জীবনে মানুষ কেন এভাবে নিজেকে এতটা নিচে নামিয়ে আনে, বোঝা না গেলেও অনুমান করে নিতে হয় হীনমন্যতা, সময়ের কাছে ফাঁকি দেয়া, নিজেকে আপন খোলসে ঢুকিয়ে রাখা। বড়ভাইয়ের পরিণতির কথা বলতে গিয়ে হেসে ফেললেও কোথায় একটা যন্ত্রণার মেঘ চকচক করে ওঠে, যন্ত্রণাটা সবাইকে ছুঁয়ে গেলেও কোথায় একটা চরম গ্লানি, চরম জিজ্ঞাসা। আমরা বুঝতে পারি, মানুষ এভাবে নিজেকে পাল্টে ফেলে কখনো, সে যে মানুষ ছিল, তা কি ভুলে থাকার গোপন প্রয়াস। আধুনিক পুতুলনাচের ইতিকথায় এভাবে জীবনের কঠিন বাস্তবতার দৃশ্যগুলো ফুটে উঠেছে পাঠকের মানসপটে। মানুষ যেন মুগ্ধ বিস্ময়ে অবলোকন করছে পরের ধারাবাহিক দৃশ্যাবলি, অপেক্ষার সাত রং পেরিয়ে সত্যিই কি আর নতুন পৃথিবী জেগে উঠবে, হয়তো আর সম্ভব নয় কিংবা সবই আলেয়া ভেবে মরীচিকার পেছনে ছোটা। সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ এভাবে দেশভাগের মোক্ষম ইতিহাস তুলে ধরেছেন, যার ভেতর দিয়ে তিনি নিজেকে দেখেছেন ভিন্ন রূপে, ভিন্ন আঙ্গিকে, হয়তো সে দেখাটা তার সবটুকুই বিস্ময়ের, তারপরও তো দেখাটা একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা।

এসআর