জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের মায়ের মৃত্যু

আগের সংবাদ

করোনায় মারা গেলেন ইব্রাহিম মেডিকেলের ডা. মহিউদ্দিন

পরের সংবাদ

প্রণোদনা বাস্তবায়নে ধীরগতি

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৪, ২০২০ , ১০:০১ পূর্বাহ্ণ

করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি চাঙা রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। নিজস্ব তহবিল থেকেই এ অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে ব্যাংকগুলোকে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। কিন্তু খুব বেশি অগ্রগতি নেই। শুধু তৈরি পোশাক খাতে বেতন-ভাতা দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের অর্থ ছাড় করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন ব্যাংক কত টাকা চলতি মূলধন ঋণ দিতে পারবে, তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশেষজ্ঞরা তাই প্রশ্ন তুলেছেন, প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন আর কতদূর!
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত এপ্রিলে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন। এর মধ্যে শিল্পঋণ খাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রপ্তানি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) ১২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা, কৃষি খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রেফারেন্স স্কিম নামে ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ সুবিধা ও রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ৫ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এ ছাড়া নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নগদ সহায়তা ৭৬১ কোটি টাকাসহ ২১ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা দেয়া হয়। প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত গঠন করা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল। নিজস্ব তহবিল থেকেই এ অর্থের জোগান দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সব মিলিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে অর্থনীতিতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি নতুন ঋণ জোগানোর লক্ষ্য নিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে। গ্রাহক পর্যায়ে এসব ঋণের প্রায় সবই দেবে সরকারিসহ বিভিন্ন ব্যাংক। আর সুদ ৯ শতাংশ হিসাব করা হলেও ঋণগ্রহীতারা দেবেন অর্ধেক সুদ। বাকি অর্ধেক সরকার ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে। তবে ব্যাংকগুলো কীভাবে এত টাকার জোগান দেবে, তা নিয়েও কথা উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকগুলোর চাহিদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত প্রণোদনা প্যাকেজের ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে। বাকি অর্থ দ্রুত ছাড় করা হবে। পোশাক কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের এপ্রিল মাসের বেতন-ভাতা দেয়ার জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থের জন্য আবেদন জমা পড়েছিল বলে জানান তিনি। মে ও জুন মাসের বেতন-ভাতার জন্য নতুন করে আবেদন করতে হবে জানিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন,  সে ক্ষেত্রে যদি প্রণোদনা প্যাকেজের ৫ হাজার কোটি টাকায় না হয় সেটা সরকার বিবেচনা করবে।
অন্যদিকে বড় শিল্পঋণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোতে খুব বেশি আবেদন জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। তারা বলছেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল হলে এই আবেদন শুরু হবে। এ ঋণের সঙ্গে অনেক প্রক্রিয়া রয়েছে। সাধারণ ছুটির মধ্যে এসব প্রক্রিয়া শেষ করা অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব ছিল। এখন অফিস খুলেছে, কাজ চলছে। এই ঋণের সঙ্গে যেহেতু জামানতের বিষয় জড়িত, তাই শুরু করতে একটু সময় লাগতে পারে বলে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহমান প্রধান বলেন, সরকারি নির্দেশনার আলোকে প্রণোদনা বাস্তবায়নে ঋণের আবেদন এখনো যথেষ্ট নয়। সোনালী ব্যাংকে এ পর্যন্ত ১৬টি আবেদন জমা পড়েছে। অন্যান্য প্রণোদনা প্যাকেজের বিষয়ে এ ব্যাংকার বলেন, অন্যগুলোর অর্থছাড় শুরুর প্রক্রিয়ায় আছে। প্যাকেজের মধ্যে সবগুলোর আবেদনই আসতে শুরু করেছে। কৃষি খাতের ২১০ কোটি টাকার প্যাকেজের কাজ বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এখনো যেহেতু স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়নি, সে জন্য বিতরণের সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক কম।
এদিকে করোনা ভাইরাসের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন ব্যাংক কত টাকা চলতি মূলধন ঋণ দিতে পারবে, তার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সবচেয়ে বেশি ঋণ দেয়ার অনুমতি পেয়েছে ইসলামী, সোনালী ও ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকগুলো সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে ব্যাংক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংকের। ব্যাংকটি প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। এ জন্য অর্থনৈতিক ক্ষত মোকাবিলায় সবচেয়ে বেশি চলতি মূলধন ঋণ দিতে পারবে ইসলামী ব্যাংক, যার পরিমাণ ২ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। ব্যাংকটি থেকে যারা ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন, তারা ইতোমধ্যে যোগাযোগ শুরু করেছেন। অনেকে আবেদনও জমা দিয়েছেন।
আমানতে ব্যাংক খাতের শীর্ষে অবস্থান করলেও সোনালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য ব্যাংকটি ১ হাজার ৬২২ কোটি টাকা চলতি মূলধন দেয়ার সীমা পেয়েছে। যদিও এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশকে ১ হাজার কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেছে ব্যাংকটি।
অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংকের ১ হাজার ৬১৩ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ১ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা ও ডাচ্বাংলা ব্যাংকের ১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা চলতি মূলধন ঋণ দেয়ার সীমা নির্ধারণ হয়েছে। দি সিটি ব্যাংকের ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সীমা ঠিক হয়েছে।
জানা গেছে, এক্সিম ব্যাংক ৯৯৪ কোটি টাকা, ইস্টার্ণ ব্যাংক ৯৮৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ৯১৪ কোটি, প্রাইম ৯১২ কোটি, ব্যাংক এশিয়া ৮১৯ কোটি, রূপালী ৭৮৭ কোটি, মার্কেন্টাইল ৭৭৪ কোটি, সাউথইস্ট ৭৬৬ কোটি ও ঢাকা ব্যাংককে ৭৫৮ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সীমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ৭২৪ কোটি টাকা ও কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনকে ৩৩৪ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সীমা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর নতুন ব্যাংকগুলোর মধ্যে মিডল্যান্ড ব্যাংক ২২৮ কোটি টাকা, মধুমতি ১৯০ কোটি টাকা, এনআরবি কমার্শিয়াল ১৭৫ কোটি টাকা, মেঘনা ১৪২ কোটি টাকা, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ব্যাংক ১৩০ কোটি, এনআরবি ১১১ কোটি, পদ্মা (সাবেক ফারমার্স) ১০৪ কোটি, এনআরবি গেøাবালকে ৭৭ কোটি টাকা ঋণ দেয়ার সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এসআর