প্রধান বিচারপতি সিএমএইচে ভর্তি

আগের সংবাদ

করোনার মধ্যে অনভিপ্রেত-নিন্দনীয় ঘটনা

পরের সংবাদ

বিশ্ব-অর্থনৈতিক ভূমিকম্প

বাংলাদেশের সংকট ও সম্ভাবনা

ড. মো. মামুন আশরাফী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০২০ , ৯:১৯ অপরাহ্ণ

করোনা ভাইরাসের আকস্মিক ও প্রবল ধাক্কায় শুধু বাংলাদেশ নয়; টালমাটাল হয়ে উঠেছে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতি। ধাক্কাটা এতই আকস্মিক যে, পৃথিবীর কোনো দেশই এটিকে মোকাবিলা করার যথেষ্ট সময় পায়নি বরং এটির প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির প্রভাবের বিষয়টি উপলব্ধি করার আগেই এই দানব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। ফলে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে পুরো পৃথিবীর সামগ্রিক অর্থনৈতিক উৎপাদনের সব কর্মকাণ্ড এবং এটিকে মোকাবিলা করতে একমাত্র উপায় লকডাউনের কবলে পড়েছে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ ও তার অর্থনীতি এবং মানুষ। বলা যায় পৃথিবীজুড়ে একযোগে একটি অর্থনৈতিক ভ‚মিকম্প আঘাত হেনেছে।
এই অনাকাক্সিক্ষত অর্থনৈতিক ভ‚মিকম্প সহ্য করার এবং তা থেকে উঠে দাঁড়ানোর সক্ষমতা বাংলাদেশের কতটা রয়েছে তা আমরা অদূর ভবিষ্যতে দেখতে পাব। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে তিনটি শক্তিশালী স্তম্ভ রয়েছে সেগুলো যদি ঠিকমতো দাঁড় করিয়ে রাখা যায় তাহলে এর অনুমিত ক্ষয়ক্ষতি হয়তো খুব শিগগিরই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। এই তিনটি স্তম্ভ হলো- জনশক্তি রপ্তানি, কৃষি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি।
প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছেন এবং মূলত তারাই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের ক্ষেত্রে প্রধান ভ‚মিকা পালন করে আসছেন। অর্থনৈতিক ভ‚মিকম্পের কারণে বাংলাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি মারাত্মকভাবে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ সঙ্গত কারণেই এখন বিদেশি শ্রমিক ছাঁটাই করছে কারণ তাদের ব্যয় এখন নিজ দেশের অর্থনীতিকেই চাপের মুখে ফেলছে। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিকরা চাকরিচ্যুত হয়ে দেশে ফিরে আসতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধি এবং বেকারত্বের জন্য এটি অত্যন্ত বিপর্যয়কর ব্যাপার।
বিদেশ ফেরত এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা কারিগরি জ্ঞানসমৃদ্ধ তাদের জন্য কারিগরি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ সৃষ্টি এবং বাকিদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কৃষি খাতে বা তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। যারা সামর্থ্যবান, তাদের কৃষি খাতে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে এবং তাদের প্রকল্পে এসব শ্রমিককে কাজের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্য এজন্য কৃষি খাতে সরকারের এবং ব্যাংকগুলোর বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে এবং সেগুলোকে সহজ শর্তে আদায়যোগ্য ঋণ প্রদানপূর্বক বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিছুটা হলেও এই বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভবপর হবে।
এটি মনে রাখতে হবে যে, এ সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী নয় এবং আপদকালীন এই সময়ে ধৈর্যের সঙ্গেই এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে। কিছুদিন পর বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনেই আমাদের দেশের শ্রমিকদের ডাক পড়বে। পাশাপাশি সরকারকেও নতুন নতুন শ্রমবাজারের সন্ধান অব্যাহত রাখতে হবে, কারণ আমাদের শ্রমিকরাই এখনো পর্যন্ত আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বড় উৎস।
বিশ্বজুড়ে কালবৈশাখীর মতো সম্মুখে ধেয়ে আসছে যে প্রবল অর্থনৈতিক মন্দা এবং খাদ্যাভাব, সেখানে আমাদের নিজস্ব কৃষি উৎপাদন অর্থনীতির ঘোর কালো আকাশে বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝলসে উঠতে পারে; দেখাতে পারে অন্তত দুমুঠো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার আশার আলো। এ বছর বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং আবহাওয়া উপযোগী থাকায় এবং সরকারের গৃহীত নানারকম পদক্ষেপ ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ ধান কৃষকের ঘরে উঠেছে। তাছাড়া সামনে অন্যান্য ফসলও রয়েছে। সার, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি, ভর্তুকি ও প্রণোদনাসহ কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক গৃহীত অন্যান্য বেশকিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপের ফলে কৃষকরা যেমন তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে এবং তেমনি পরবর্তী মৌসুমেও তারা আগ্রহের সঙ্গেই ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখবে বলে আশা করা যায়। ধান ছাড়াও পেঁয়াজ, রসুনসহ অন্যান্য মৌসুমি ফসল তথা শাক-সবজির ব্যাপারেও একই আশাবাদ ব্যক্ত করা যায়। সুতরাং অনুমিত খাদ্যাভাব মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে এবং খাদ্য আমদানিতে নির্ভরতা বহুলাংশে হ্রাস পাওয়ায় এটি একটি টেকসই অর্থনীতি বিনির্মাণে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করবে।
তবে শুধু উৎপাদনই শেষ কথা নয়, পণ্যের ন্যায্যমূল্য এবং সুষ্ঠু বিপণন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে এর ফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে না এবং সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা ও আন্তরিকতা প্রশ্নের মুখে পড়বে, যার ফলে কৃষক এবং জণগণ এর সুফল পাবে না। মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা দেবে। ফলত, এক্ষেত্রে সম্ভাবনার সবটুকু সফল করতে সরকারের সামনে ব্যর্থতার বিরাট এক ঝুঁকি রয়ে যাবে। সুষ্ঠু বণ্টন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যর্থ হলে অর্থনীতির একটি বৃহৎ অংশও সামনে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সুতরাং এক্ষেত্রে ইপ্সিত ফল পেতে হলে সরকারের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কঠোর তদারকি অপরিহার্য।
রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পও বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ধাক্কাকে সামলে নিয়ে রপ্তানি আয়ের উন্নয়নে রাখতে পারে ব্যাপক ভ‚মিকা। প্রায় চার দশকের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই তৈরি পোশাক শিল্প এখন বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানকে দ্বিতীয় স্থানে উন্নীত করেছে এবং এনে দিয়েছে বিরাট অর্থনৈতিক সাফল্য। একই সঙ্গে বেকারত্ব হ্রাস এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পিছিয়ে পড়া নারী সমাজ তথা অনুৎপাদনশীল এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীলতার মহীসোপানে যুক্ত করেছে, যা অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে সারা বিশ্বে এক বিশাল পরিচিতি এনে দিয়েছে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে সরকারের বিভিন্ন শিল্পসহায়ক নীতি ও পরিবেশ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ইত্যাদির মতো বিশেষ ভ‚মিকা এই শিল্পের অগ্রগতিতে ও সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, যার সুফল ভোগ করছে দেশের জনগণ। নানাবিধ সমস্যা এবং ঘটনা-দুর্ঘটনার ভেতর দিয়ে এই শিল্প তার ভিত এতটাই মজবুত করেছে যে আজ এই শিল্প একটি টেকসই শিল্পে পরিণত হয়েছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখছে।
করোনা সৃষ্ট বর্তমান অর্থনৈতিক ভ‚মিকম্পের কারণে একটি বৃহৎ অর্থনীতির দেশ পশ্চিমা দেশগুলোর তৈরি পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে ধারণা করা যায়। যদিও তারা একাই বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ জোগান দিত, যেখানে বাংলাদেশ জোগান দিত প্রায় ৭ শতাংশ। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ এবং সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচন করে দিতে পারে। যদিও বিশ্বব্যাপী বিলাসী পোশাক ও পণ্যের বাজার কিছুটা সংকুচিত হবে এই অর্থনৈতিক ভূমিকম্পের অভিঘাতে, তথাপি পশ্চিমা দেশগুলোর আমদানি ও প্রস্তুতকারক দেশগুলোর রপ্তানির পরিমাণ পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, সেই বিশেষ দেশটির সর্বমোট রপ্তানির এত বড় অংশ হুমকিতে পড়লে বাংলাদেশের রপ্তানির অংশ যোগ-বিয়োগের ফলাফলে এগিয়েই যাবে অর্থাৎ এই নতুন মেরুকরণে বাংলাদেশই শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে। সাময়িক সময়ের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি হয়তো কিছুটা কমলেও কমতে পারে চলমান ভ‚মিকম্পের আপাত ফলাফলে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাজনীতির নতুন মেরুকরণে বাংলাদেশই হয়তো অবস্থাদৃষ্টে রপ্তানিতে প্রধান হয়ে উঠতে পারে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সুচিন্তিত ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে তাদের সামর্থ্য বাড়াতে এবং নতুন নতুন কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়াতে, যাতে নতুনভাবে স্থানান্তরিত হওয়া এই বাজার বাংলাদেশ লুফে নিতে পারে। এক্ষেত্রে এই ব্যবসার কাঁচামাল সংগ্রহ এবং পশ্চাৎ সংযোগ কারখানা গড়ে তোলা হবে বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশ যদি সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে, তাহলে এই শিল্পই বদলে দিতে পারে অর্থনীতির সব হিসাব-নিকাশ আর গতিপ্রকৃতি। তাই এখন সরকার ও এই শিল্প সংশ্লিষ্ট সবাইকেই ভাবতে হবে, তৈরি পোশাক রপ্তানির যে অপ্রত্যাশিত বাজার না চাইতেই বাংলাদেশের হস্তগত হতে যাচ্ছে, বাংলাদেশ কি উপযুক্ত সামর্থ্য নিয়ে তাকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

ড. মো. মামুন আশরাফী : রাষ্ট্রচিন্তক ও পর্যটন বিশেষজ্ঞ।
[email protected]

এসআর