তামাকপণ্যের দাম বাড়িয়ে সংকট মোকাবিলার তাগিদ

আগের সংবাদ

করোনা সহায়তায় ৬শ কি.মি. সাইকেল চালাচ্ছেন ফ্রেড

পরের সংবাদ

প্রজনন মৌসুম উপেক্ষিত

কোটি টাকা লেনদেনে সমুদ্রে জেলেরা

আনোয়ার হোসেন আনু,কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০২০ , ১:৪৭ অপরাহ্ণ

৬৫ দিনের প্রজনন মৌসুমের ১৪ দিনের মাথায় শত শত মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে। এসব অসাধু ট্রলার মালিক ও আড়দদার সমিতি কোটি টাকার লেনদেনে জেলেদের সমুদ্রে নামতে বাধ্য করেছে বলে জাল ও ট্রলার মেরামতের কাজে ব্যস্ত অন্তত ২০ জন জেলের সাথে কথা বলে জানাগেছে। এসব তথ্যের সত্যতাও মিলেছে ।

মঙ্গলবার (৩ জুন) শেষ বিকেলে বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় ১০-১২ টি মাছ ধরার ট্রলার আলীপুর- মহিপুর মৎস্য বন্দরের দিকে ফিরতে দেখা গেছে। দেখভালের দায়িত্বে থাকা নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, মৎস্য অফিসের টহলরত দায়িত্ববান কর্মকর্তাতের সামনে দিয়েই সমুদ্রে যাওয়া আসা করছে জেলেরা। প্রজনন মৌসুম উপেক্ষা করে সমুদ্র থেকে ধরে আনা সামুদ্রিক মাছ প্রকাশ্যে দিবালোকে মৎস্যবন্দর আলীপুর-মহিপুর ও কুয়াকাটা আড়ৎঘাটে ক্রয়- বিক্রয় করা হয়। আহরণ করা মাছ পিকভ্যান ও যাত্রীবাহী পরিবহনে দেশের বিভিন্ন এলকায় বাজারজাত হয়। মাছ ধরা থেকে বিপনন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই চলমান রয়েছে গোপন ম্যানেজ প্রক্রিয়া। আহরণ করা মাছ মজুদ ও সংরক্ষণের জন্য মৎস্য বন্দরে একাধিক বরফকলে উৎপাদন হয় বরফ। নদী ও খালে সংরক্ষনের মত মাছ ধরা না পড়লেও নদীর মাছ সংরক্ষণের অজুহাতে বরফকলগুলো বরফ উৎপাদন করছে। সরকারের তরফ থেকে বরফকল বন্ধের কোন নির্দেশনা নেই জানিয়ে এমন অবাস্তব অজুহাতে এতে সহযোগিতা করছেন উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ।

কোটি টাকার লেনদেনে প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরাসহ বিপননের প্রক্রিয়া চালু রয়েছে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। এসব বিষয়ে নিয়ে প্রজনন মৌসুম বাস্তবায়ন কমিটির কলাপাড়া উপজেলা প্রধান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহিদুল হক, উপজেলা মৎস্য অফিসার মনোজ কুমার সাহা ,নৌ-পুলিশ কুয়াকাটা জোনের ইনচার্জ এসআই মাহমুদ ও কোষ্টগার্ড নিজামপুর কন্টিনজেন্ট অফিসার নাজমুল আহসান পিপিওসহ মৎস্য অধিদপ্তরের টহলরত ক্ষেত্র সহকারি নেছার উদ্দিনের সাথে সংবাদিকদের ধারাবাহিক কথা হলেও প্রত্যেকের ভুমিকা ছিল রহজ্যজনক।

এদিকে প্রজনন মৌসুম উপেক্ষা করে অসাধু জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সমুদ্রে না গিয়ে প্রজনন মৌসুম পালনকারী সাধারন জেলেরা। লোক দেখানোর জন্য নৌ-পুলিশ দু’য়েকটি ট্রলার জব্দ করলেও বেশিরভাগ মাছধরা ট্রলার অন্তরালে থেকে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার (২ জুন) শেষ বিকেলে কুয়াকাটা সৈকত সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের পূর্ব ও পশ্চিমের সমুদ্রে তাকালে দিকবিদিক ছুটতে দেখা গেছে অন্তঃত ২০ টি মাছ ধরার ট্রলার। পূর্নিমা জোয়ার প্রাদুর্ভাবে দূর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় সৃষ্ট উত্তাল সমুদ্র থেকে এসব ট্রলার আন্ধারমানিক মোহনা আসতে ছিল।

নির্ভরযোগ্য একাধিক জেলে সুত্র জানিয়েছেন, গত দুইদিনে মৎস্যবন্দর আলীপুর- মহিপুর ও কুয়াকাটা থেকে বরফ ও প্রয়োজনীয় রসদ নিয়ে অন্তত ৫০টি ট্রলার মাছ ধরার উদ্যেশে রাতের অন্ধারে গভীর সমুদ্রে ছেড়ে গেছে। ট্রলালের আকার আকৃতি ও ধরণ অনুযায়ী (লাল জাল) প্রতিটি ট্রলার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার থেকে শুরু করে ২০হাজার টাকায় চুক্তিতে সমুদ্রে নেমেছে ওইসব মাছ ধরার ট্রলারগুলো বলে বিভিন্ন সুত্রে দাবি করছে। বর্তমানে যেসব জেলে সমুদ্রে রয়েছে প্রত্যেকেই মৎস্যবন্দর আলীপুর- মহিপুরের প্রভাবশালী ট্রলার মালিক ও আড়দদারদের ছত্রছায়ায় সমুদ্রে নেমেছে বলে সমুদ্রে না যাওয়া জেলেরা জানিয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় আমফানের প্রভাবে ও প্রজনন মৌসুম শুরুর দিকে ৫ শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার মৎস্যবন্দর আলীপুর মহিপুরের শিববাড়িয়া নদীর নিরাপদ আশ্রয় ছিল। গত দুই ধরে সেখানকার প্রভাবশালী ট্রলার মালিক আড়দদারদের ট্রলার সেই স্থান দেখা যায়নি। যেসব ট্রলারগুলো এখনও সেখানে রয়েছে তারাও প্রস্তুতি নিচ্ছে সমুদ্রে যাবার জন্য। পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন তারা। সুযোগ মতো যে কোন সময় সমুদ্রে নামবে বলে জানাগেছে। গত দুইদিনে সাংবাদিকদের একটি অনুসন্ধানী দল মৎস্যবন্দরে গেলে দেখা যায়, মহিপুরে মজনু গাজীর বরফকল, সুন্দরবন বরফকল, আলীপুরে আনোয়ার খানের বরফকলসহ কুয়াকাটা, আশাখালী এলাকায় কয়েকটি বরফকলে উৎপাদন হচ্ছে বরফ। আর এসব বরফকল থেকে বরফ নিয়ে সমুদ্রে যাচ্ছে জেলেরা।

কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয় , সোমবার (১ জুন) ভ্রাম্যমাণ আদালত বরফ উৎপাদনের দায়ে মজনুগাজীর মালিকাধীন গাজী আইসপ্লান্টে অভিযান চালিয়ে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এরপরও থেমে নেই বরফ উৎপাদন। ওইসব বরফকলে উৎপাদিত বরফ দিয়ে আহরণক করা সামুদ্রিক মাছ মজুদ, সংরক্ষণ ও বিপননের কাজ করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। এচিত্র শুধু মহিপুর কুয়াকাটা বন্দরেই নয়। পায়রা বন্দর, রাঙ্গাবালী, মৌডুবী, ফকিরহাট, পাথরঘাটাসহ সমুদ্র উপকুলের সবর্ত্র একই চিত্র বলে জানাগেছে।

এদিকে মঙ্গলবার রাতে নৌ-পুলিশ কুয়াকাটা জোনের অভিযানে আন্ধারমানিক মোহনা থেকে এফবি তিমন নামক একটি মাছ ধরার ট্রলার ১৫ জেলেসহ আটক করে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ২৫হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সমুদ্র থেকে মাছধরে আলীপুর-মহিপুর বন্দরে ফিরে আসা বাকি ট্রলারের কোন হদিস জানে না নৌ-পুলিশ কিংবা কোস্টগার্ড।

কোষ্টগার্ড নিজামপুর কন্টিনজেন্ট কমান্ডার নাজমুল আহসান পিপিও বলেন,তাদের নৌযান স্বল্পতার কারণে গভীর সমুদ্রে অভিযানে যেতে পারে না। তবে আলীপুর –মহিপুর বন্দর থেকে কোন মাছ ধরার ট্রলার সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে দেখেন নি বলে দাবি করেন তিনি। মৎস্য প্রজনন মৌসুমে জেলেদের আন্ধারমানিক ও রামনাবাদ মোহনা দিয়ে সমুদ্রে যাওয়া ও আসা প্রতিহত করার দায়িত্বে কোষ্টগার্ডের ওই কর্মকর্তার কাছে সমুদ্রে অসংখ্য ট্রলার অবস্থান করছে এমন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান তিনি।

এ বিষয়ে কলাপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোজ কান্তি বলেন, কোস্টগার্ড ,নৌ-পুলিশ ও মৎস্য অধিদপ্তরের একটি ভ্রাম্যমাণ টিম প্রজনন মৌসুম বাস্তবায়নে টহলরত আছে বিষয়টি তাদের অবহিত করতেছি।

প্রজনন মৌসুম বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসব বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, কলাপাড়া মৎস বিভাগ যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে না। তবে তিনি এসব বিষয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছেন এমনটাই জানিয়েছেন।

ডিসি