আজ থেকে চলছে আরও ৯ জোড়া ট্রেন

আগের সংবাদ

আগের ঢাকাটাকেই ফেরত পেয়েছি

পরের সংবাদ

অব্যবস্থাপনা-দুর্নীতির চক্রে লণ্ডভণ্ড স্বাস্থ্য ব্যবস্থা

সেবিকা দেবনাথ:

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ৩, ২০২০ , ১২:০৬ অপরাহ্ণ

উত্তরণে প্রয়োজন সুশাসন বরাদ্দ ও সক্ষমতা বাড়ানো

অদৃশ্য করোনা ভাইরাস বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তুলে ধরেছে চিকিৎসাসেবার দুর্বলতার চিত্র। করোনার তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বাংলাদেশের গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দৈন্যদশার ওপর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের যে আর্থিক ও সামাজিকসহ নানাধরনের ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে এবং এতে আমাদের উন্নয়ন ধারা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সময়ই বলে দেবে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে যদি যথাযথ বরাদ্দ না বাড়ানো হয়, আমরা যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি তা নিশ্চিত করা যাবে না। এ ভাইরাস বুঝিয়েছে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা। তবে বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। এই খাতে চলে আসা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বাড়াতে হবে সক্ষমতাও। সরকারের পক্ষ থেকে যেমন বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর সময় এসেছে। অপর দিকে সরকারের পক্ষ থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ালেও সেই অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা নেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

সম্প্রতি নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, সামরিক খাতে নয়; বরং স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বরাদ্দ বাড়ানোর সময় এসেছে। আর গত ২০ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভার পর সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন, করোনা মোকাবিলায় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর দাবি উঠলেও তা ‘বাস্তবসম্মত নয়’। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যাকে টাকা দেব, তিনি কোথায় কীভাবে খরচ করবেন? তারা একটা গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ভালো মানের প্রকল্প নিয়ে আসুক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দক্ষতার প্রশ্ন আছে, তার ব্যবহার করার সক্ষমতার প্রশ্ন আছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ মনে করেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ধারণার যে খোল সেই ধারণা বদলানোর সময় এসে গেছে। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেখানে বলে মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কথা; সেখানে আমাদের দেশে বিগত কয়েক দশক ধরে এই বরাদ্দ তার ধারে কাছেও নেই। উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা চার শতাংশের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে এত কম বরাদ্দ এই ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। বিশেষত সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা যদি বলি- তাহলে দেখব কত দৈন্যতা সেখানে। লোকবল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি, ল্যাবরেটরি, ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা, বিশেষায়িত সেবা দেয়ার ক্ষমতা- সব ক্ষেত্রে তা প্রতিভাত হয়েছে। প্রতিবছর যে বরাদ্দ থাকে সেখানে, একদিকে যেমন তা পুরোপুরি ব্যয় হয় না; অন্যদিকে যেগুলো ব্যয় হয় তা যে সর্বোচ্চ ব্যয় তাও বলা যাবে না।

বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দকৃত বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়ে এই বিশিষ্ট চিকিৎসক বলেন, যে জায়গাগুলোতে ঘাটতি আছে যেমন, হাসপাতালের মান, স্বাস্থ্যসেবার মান, স্বাস্থ্য কর্মীদের জন্য সুরক্ষা, বিভিন্ন ধরনের ল্যাবরেটরি টেস্ট করা, বিশেষায়িত সেবা- আমাদের সবগুলো জায়গায় মনোযোগ দেয়া দরকার। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী পরিকল্পনা করে যদি অগ্রসর হই, তাহলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে ভঙ্গুর দশা- তা থেকে রেহাই পেতে পারি। স্বাস্থ্য খাতে যে বেনিয়াবৃত্তি চলছে সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এ খাতে যে নানা ধরনের দুর্নীতি চলছে, কমিশন বাণিজ্য চলে এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোর যে বেপরোয়া আচরণ তা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এক অশনি সংকেত। সেখান থেকে আমাদের দ্রুত বেরিয়ে আসা দরকার।

সম্প্রতি বাজেট সংক্রান্ত এক ভার্চুয়াল মিটিংয়ে যুক্ত হয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবায় অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আর শিথিলতা দেখানোর সুযোগ নেই। সিপিডির পক্ষ থেকে আমাদের চাওয়া জিডিপির ২ শতাংশ যেন স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হয়। সম্পদের গুণগত ব্যবহার নিশ্চয়তার সময় এসেছে। দুর্নীতির চক্র এ খাতকে ঘিরে ধরেছে। এই চক্র ভাঙা না গেলে এবং ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতাও দূর করতে না পারলে বরাদ্দকৃত অর্থ জনগণের কাজে লাগবে না।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও রাজশাহী জেলার স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ডা. চিন্ময় দাস বলেন, বড় বড় আধুনিকমানের তারকা হাসপাতালও যে বৈশ্বিক মহামারিতে মানুষের চিকিৎসা দিতে ব্যর্থ তা করোনা মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দেখাল অর্থ, সম্পদ ও ক্ষমতা কোনো কিছুই বিপদে কাজে লাগে না। জনস্বাস্থ্যে বিনিয়োগকে কখনোই লাভজনক মনে করেনি কর্পোরেট পুঁজি। অথচ এটা পরিষ্কার, যে দেশের জনস্বাস্থ্য যত বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে অর্থাৎ জনবান্ধব সে সব দেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় অনেক বেশি সফল এবং তাদের মৃত্যুর হারও কম। সুযোগ এসেছে পুরো পৃথিবীর পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর। সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়েই কেবল গড়ে উঠতে পারে একটি দেশের জনবান্ধব চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার সুফল ভোগ করে সবাই। আশা করব, আমাদের দেশের সরকার ও পুঁজির মালিকরা তাদের নিজেদের স্বার্থেই একটি গণমুখী জনবান্ধব চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবেন।

এমআই