আইসিইউতে নাসিম , শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল

আগের সংবাদ
প্লাজমা

প্লাজমা থেরাপিতে আগ্রহ বাড়ছে সবার

পরের সংবাদ

সরকারের সামনে ৩ চ্যালেঞ্জ

ঝর্ণা মনি:

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০২০ , ১২:০৮ অপরাহ্ণ

আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া
ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা
অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বে চাকরিচ্যুতদের কর্মসংস্থান

করোনা সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। বিশেষজ্ঞদের কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও জীবন ও জীবিকার রশি টানাটানিতে তুলে নেয়া হয়েছে অঘোষিত ‘লকডাউন’। এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে মোটা দাগে তিনটি বিষয়কে সামনে এনেছে সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রয়েছে- দীর্ঘদিনের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া, ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং অভ্যন্তরীণ ও বহির্বিশ্বে চাকরিচ্যুতদের কর্মসংস্থানের বিশাল দায়। তবে সরকার পক্ষের মতে, চ্যালেঞ্জ যতই কঠিন হোক, সবাই মিলেই তা মোকাবিলা করা হবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে দেশের অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে ৯৯ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ প্যাকেজ বাস্তবায়ন করাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এমনকি গত দুই দশকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসা অনেক পরিবার আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। গত কয়েক দিনে প্রায় দেড়শ কোটি ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে। ফলে ১২ লাখ পোশাক শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। করোনা ভাইরাসের এই চ্যালেঞ্জ সামলাতে যদি কারখানা স্থবির হয়ে যায় এবং শ্রমিকদের বেতন বন্ধ হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ভুগবেন পোশাক শ্রমিকরা। এদের প্রায় সবাই মাসিক বেতনের ওপর নির্ভরশীল। অধিকাংশ শ্রমিকেরই আপদ মোকাবিলার জন্য তেমন কোনো সঞ্চয় নেই- যা দিয়ে এই কঠিন সময় পার করবেন। ফলে এদের সবাই জীবন ধারণে চরম সংকটের মুখে পড়বেন। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে পোশাকশিল্পের কর্মীদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছেন। এখন এই টাকার সঠিক ও সময়োচিত ব্যবহার প্রয়োজন। এ ব্যাপারে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ ভোরের কাগজকে বলেন, সরকারের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ- স্বাস্থ্য, পোশাক এবং প্রবাসীরা। পোশাক খাতে প্যাকেজ দেয়ার পরিবর্তে সরাসরি দরিদ্র জনগণকে টাকা দেয়া প্রয়োজন ছিল। বিপদের সময় যদি জনগণ টাকা না পায় তাহলে পরে পাওয়াটা হাস্যকর। পোশাক খাতে যা খুশি তাই চলছে। অন্যদিকে প্রবাসীরা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসবে। এদের কৃষিতে কাজে লাগনো যায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে হেলথ কেয়ার সিস্টেম দাঁড়ায়নি। করোনা টেস্ট হচ্ছে না। সর্বত্র বাণিজ্যিকীকরণ। চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোকে সরকারের আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন।

দেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক। ‘দিন আনে দিন খায়’ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাইভেট সেক্টরসহ পার্টটাইম কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তদের অধিকাংশই সব হারাবেন। সেই সঙ্গে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তরা কোনো প্রণোদনার তালিকায় নেই। তারা লাইনে দাঁড়িয়ে ওএমএসের খাবারও নিতে পারবে না। তাদের ছেলেমেয়ের পড়াশোনা, বাসা ভাড়া, পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার টাকা কোথা থেকে আসবে? এ ব্যাপারে অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। তাদের কথাও ভাবতে হবে। প্ল্যানিং কমিশনের উচিত এখন শিক্ষকদের নিয়ে একটি পরিকল্পনা তৈরি করা। দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে পলিসি তৈরি করা। অর্থনৈতিক বিকল্প চিন্তা করে আপদকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ভারতের আদলে ‘আধার কার্ড’ করে দেয়া।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১১ বছরে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখাই ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। আর এখন এই অর্থনীতিই পড়েছে মন্দার মুখে। এটা মোকাবিলাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে সরকারের উচিত কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং সংক্রমণ হার আস্তে আস্তে কমিয়ে আনা। যাতে এ অবস্থা থেকে দেশকে বের করে আনা যায় এবং কাউকে যেন খাবারের অভাবে না পড়তে হয়। অন্যদিকে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে সেটিও পূরণ করে আনতে হবে। জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা। সরকার ঘুড়ির সূতা একটু একটু করে ছাড়ছে। করোনা টেস্ট বাড়ানো প্রয়োজন। চিকিৎসা বাড়ানো প্রয়োজন। স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন আসছে। শুধু করোনাই নয়, টোটাল চিকিৎসা খাতে পরিবর্তন প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্রণোদনা জরুরি। ভ্যানে, ফুটপাতে ব্যবসা বাড়ছে। ব্যবসায় পরিবর্তন আসছে। পাশাপাশি আগামীর বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। দুর্নীতি যেন এই বিনিয়োগ খেয়ে না ফেলে, এই চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতে ঋণ বাড়াতে হবে।

করোনা সরকারের জন্য খুব একটা চ্যালেঞ্জ নয় বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীনরা। তাদের দাবি, সরকার ও আওয়ামী লীগ যৌথভাবেই করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমর্থ। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব.) ফারুক খান ভোরের কাগজকে বলেন, আম্ফান মোকাবিলা হয়ে গেছে, করোনা চলমান প্রক্রিয়া। এ ক্ষেত্রে সরকার ও আওয়ামী লীগ উভয়ই দায়িত্বশীল। এখন প্রয়োজন হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বাড়ানো, পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও চিকিৎসা সরঞ্জাম বাড়ানো। টেস্টিং কিট বাড়ানো এবং জনগণকে সচেতন করে তোলা। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যেই আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন। অপ্রয়োজনে কেউ যেন বাইরে না যায়। সরকার ফাইট করছে। আমাদের নতুন পদ্ধতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়া প্রয়োজন। রেমিট্যান্স কমলেও ততটা প্রভাব পড়বে না। আশা করছি, প্রবাসীরা যে যেসব বিষয়ে এক্সপার্ট, তারা সেসব বিষয়ে ইতোমধ্যেই কাজ খুঁজে নেবেন। নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবেন।

সংকট সমাধানে সরকার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, খাদ্য সহায়তা, আর্থিক সহায়তাসহ নানা উদ্যোগের ফলে এখন পর্যন্ত একজন মানুষও না খেয়ে মরেনি। তিনি বলেন, হুড়োহুড়ি, বাড়তি যাত্রী হওয়া, স্বাস্থ্যবিধি না মানা দেশকে আরো সংকটে নিমজ্জিত করতে পারে। পরিস্থিতির যদি আরো অবনতি হয়, তাহলে জনস্বার্থে সরকার আবারো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।

এমআই