করোনায় নিজ হাসপাতালেই চিকিৎসকের মৃত্যু

আগের সংবাদ

ভাড়া নিয়েও ভাবতে হবে

পরের সংবাদ

কোন পরিণতির অপেক্ষায় আমরা?

আহমেদ আমিনুল ইসলাম

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০২০ , ৫:২৯ অপরাহ্ণ

গত ৩১ মে থেকে সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার হয়ে গেছে। চালু হয়ে গেছে ‘সীমিত আকারে’ গণপরিবহনও। অবস্থাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে আগামী দুয়েকদিন বা সপ্তাহখানেকের মধ্যে ‘সীমিত আকার’ কোনোভাবেই আর সীমিত থাকবে না। সহসাই তা যে ‘বৃহদাকার’ রূপ লাভ করবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ‘সীমিত আকার’ থেকে মানুষের জীবনসংগ্রাম দ্রুতই ‘নিরাকার’ ও ‘শয়ম্ভু’ অবয়ব ধারণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রকে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে আগের মতো ঘন সমাবেশসম্পন্ন নগরীতে পরিণত করবে। গত দুয়েকদিনের ঢাকা শহরে সাধারণ মানুষের চলাচল ও গতিবিধি লক্ষ করলেই এ কথা উপলব্ধি করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করা যায় আমাদের দেশে প্রকৃতপক্ষে ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মেনে চলা কঠিন একটি কাজ। অত্যন্ত কঠিন এখানে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে চলা! স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা আমাদের সম্মুখে নানাভাবে বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথমত, ছোট্ট এই দেশে মানুষের বসবাসের ঘনত্বই ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মেনে চলার অন্যতম অন্তরায়। এই মানবঘনত্বের কারণে রাস্তাঘাট কিংবা গণপরিবহনে ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রাখাও সম্ভব নয় কোনোক্রমেই। এটিই বাংলাদেশের সামগ্রিক বাস্তবতা। শুধু রাস্তাঘাট বা গণপরিবহনই নয় আমাদের অনেক কর্মক্ষেত্রও এরকম আছে যেখানে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা কঠিনই শুধু নয়, অসম্ভবও বটে। ঈদ উদযাপনসহ সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের পর আমরা গত কয়েক দিনেই স্বাস্থ্যবিধি তোয়াক্কা না করে মানুষের যে চলাচল দেখেছি তাতে আগামী অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং একই সঙ্গে মৃত্যুবরণকারী মানুষের সংখ্যারও ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান দেখতে পাবো। রূঢ় শোনালেও এ কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ বর্তমানে আমরা আক্রান্ত ও মৃত্যুহারের যে পরিসংখ্যান পাচ্ছি তা কিন্তু কথিত ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মেনে এবং ‘সামাজিক দূরত্ব’ বজায় রেখে চলার প্রতিশ্রুতিতে মধ্যপর্বে পোশাকশিল্প কারখানা খুলে দেয়ারই ফসল। তাই লকডাউন ও সাধারণ ছুটি প্রত্যাহারের অশুভ ফলাফল আগামী অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই আমরা দেখতে পাবো। ‘জেনে শুনে বিষ পানের’ করুণ পরিণতি যে আগামী এক মাসের মধ্যেই যে দেখা যাবে এ কথা মোটেই কষ্ট-কল্পনা নয়। দ্বিতীয় কারণ অর্থনীতিনির্ভর। উন্নত রাষ্ট্রসমূহের মতো দীর্ঘস্থায়ী লকডাউন আমাদের দেশে সম্ভব নয়। এদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এত ব্যাপক যে, কর্মহীন অবস্থায় তাদের জীবনধারণ সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক এই গুরুত্ব বিবেচনায় লকডাউন প্রত্যাহার সরকারের পক্ষে খুবই স্বাভাবিক অযৌক্তিকও নয়। তৃতীয়ত, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য মাস্ক বা গ্লাভস ব্যবহারের পরামর্শ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন থেকে আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু সেসব মাস্ক বা গ্লাভস নিয়েও সাধারণের মধ্যে আছে ভুল বোঝাবুঝি। সাধারণ মানুষের পক্ষে স্বাস্থ্যসম্মত মাস্ক বা গ্লাভস ব্যবহার নিয়ে আছে বিস্তর ধোঁয়াশা। অন্যদিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্বাস্থ্যসম্মত মাস্ক ও গ্লাভসের সহজ্য প্রাপ্যতা! কোথায় স্বাস্থ্যসম্মত মাস্ক বা গ্লাভস আমরা পাবো তা নিয়েও আছে বিস্তর বিভ্রান্তি। হাটে-বাজারে যেসব মাস্ক ও গ্লাভস পাওয়া যায় সেগুলোর স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে যেমন সন্দেহ ও বিতর্ক আছে তেমনি সেসবের দাম নিয়েও আছে নানা রকমের হঠকারিতা। চতুর্থত, সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মানবার প্রবণতা একেবারেই নেই। এ বিষয়ে উৎসাহও কম। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জনসমাবেশ যেমন রাস্তাঘাট, কাঁচাবাজার, ফেরি পারাপার, গণপরিবহন কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মানার দৃশ্য দেখা যায়নি। পোশাক শিল্পকারখানার প্রবেশদ্বারেও ‘স্বাস্থ্যবিধি’ অনুসরণে রয়েছে বিস্তর ফাঁকফোকর। মাঝে মাঝে কিছুসংখ্যক মানুষকে মাস্ক পরিহিত অবস্থায় দেখা যায় বটে কিন্তু এসব স্থানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মানসিক ইচ্ছা, প্রবণতা কিংবা সহনশীল মনোভাবের কোনো কিছুই আমাদের চোখে পড়েনি। উল্টো দেখা গেছে টেলিভিশনের সংবাদদাতা যখন পথচলতি কোনো মানুষের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করছেন তখন সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর বক্তব্যে সামাজিক দূরত্ব তথা স্বাস্থ্যবিধি প্রসঙ্গের কথা থাকলেও তা মেনে চলার দৃশ্যত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আমাদের ‘হুজুগেপনা’ থেকে টেলিভিশনের ক্যামেরা ও সাংবাদিকরাও রেহাই পান না। এরূপ অবিমৃষ্যকারী ‘হুজুগ’ থেকে কে আমাদের মুক্ত করবে? আমরা অনেক সময়ই হুজুগে মাতি, হুজুগে চলি। হুজুগকেই মনে করি সর্বস্ব। সে আনন্দঘন মুহূর্ত হোক কিংবা নিরানন্দের আতঙ্কগ্রস্ত মুহূর্ত হোক। আমাদের কর্ম ও ভাবনার কোনো স্তরেই স্থিরতা নেই, স্থিরতা নেই ছোট-বড় যে কোনোরূপ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও। আমরা শত আতঙ্কের মধ্যেও চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলি জীবনের মরণেরও। তাই সরকারি সিদ্ধান্ত যেমন উপেক্ষা করি তেমনি উপেক্ষা করে চলি নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও। এ কথা আমাদের কম মানুষই ভাবেন যে, একজনের আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই করোনা ভাইরাসের জীবনচক্র শেষ হয়ে যায় না। আশপাশের, সঙ্গী-সাথী ও স্পর্শসীমার মধ্যে যাওয়া-আসা করা আত্মীয়-স্বজনদেরও করোনা ‘ছেড়ে’ যায় না তাদের মধ্যে ‘ছড়িয়ে’ যায়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট দূরত্বসীমায় বসবাস ও চলাচল না করলে করোনার আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এই কথাটিই আমরা ‘জীবিকা’র তাগিদে অস্বীকার করি, জীবন-মরণের চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফেলি। জীবন ও জীবিকার কোনটি বেশি গুরুত্বের সেই ‘কনফিউশন’ থেকে এখনো আমরা মুক্ত হতে পারছি না।
লকডাউন উঠে গেছে। স্বাভাবিক হয়ে উঠছে মানুষের চলাচল। আমরা বলব ‘অস্বাভাবিক রকমের’ স্বাভাবিকতা! এটিই কী মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি! একদিকে খেটে-খাওয়া মানুষ জীবন ও জীবিকার অজুহাতে বেরিয়ে এসেছে। অপরদিকে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের অজুহাতে সরকারও সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার অজুহাতে সাধারণ ছুটি এবং একই সঙ্গে লকডাউন প্রত্যাহার দেখলাম আমরা। এ নিয়ে সরকারকে নানা রকমের সমালোচনারও সম্মুখীন করছি আমরা। আমরা এও বলছি যে, সরকার কেন ‘জেনে শুনে বিষ পানে’ আগ্রহী হয়ে উঠল? এদেশে করোনা সংক্রমণের মধ্যপর্বে আমরা পোশাক শিল্পকারখানা ও ‘সীমিত আকারে’ শপিংমল খুলে দেয়ার পরিণতি সম্প্রতি দেখা শুরু করেছি। শুধুমাত্র এ দুটি কারণেই কোভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যুর বর্তমান হার দেখছি। সাধারণ ছুটি এবং একই সঙ্গে লকডাউন প্রত্যাহার-পরবর্তী সময়ে সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই হার কোথায় গিয়ে পৌঁছায় তা দেখার সময় ধীরে ধীরে আসছে!
সাধারণ ছুটি এবং একই সঙ্গে লকডাউন প্রত্যাহার নিয়ে যে যার জায়গা থেকে আমরা সরকারের তীর্যক সমালোচনা করছি ঠিকই কিন্তু এও তো সত্যি যে, লকডাউন চলাকালে কথিত কড়াকড়ির মধ্যে সাধারণ মানুষকে লাগামহীন চালচলনে মারিয়া হয়ে উঠতেও আমরা দেখেছি। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা নিশ্চিত করেই বলা সম্ভব যে, নিকট ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যবিধি মান্য করাও আমাদের অনেকের পক্ষে দুরূহ হয়ে উঠবে উঠবেই। কারণ আমরা যে হুজুগেপনার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করি করোনাকালে তার ফলাফল কোনোভাবেই শুভ হতে পারে না। বিগত তিন মাসে নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে এ কথা রীতিমতো প্রমাণ করেও ছেড়েছি! রাস্তাঘাট, সড়ক, মহাসড়ক সব বন্ধ, পথের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সতর্ক নজরদারিকে উপক্ষা করে কত রকমের ছল ও কলাকৌশলে আমরা ঢাকা ছেড়েছি, ঢাকায় ঢুকেছি তার সাক্ষী অনেকেই। আবার ঈদের পূর্বেকার এবং পরবর্তী সময়ের টেলিভিশন সংবাদগুলো মনে করলেই তা উপলব্ধি সম্ভব। তখনো ‘স্বাস্থ্যবিধি’ মেনে চলার সরকারি ঘোষণা ছিলÑ ছিল কঠোর নির্দেশনাও। কিন্তু আমরা বীরদর্পে সেসব বিধিবিধানকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম! আবার এ কথাও আমরা না ভেবে পারি না যে, আমাদের দেশে তখন লকডাউন ছিল যখন করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দৈনিক দুই অঙ্কের ঘরে। কিন্তু সম্প্রতি এমন এক সময়ে লকডাউন ও সাধারণ ছুটি প্রত্যাহার করে নেয়া হলো যখন দৈনিক করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা চার অঙ্কের ঘর অতিক্রম করেছে। করোনা ভাইরাস নিয়ে আমাদের সর্বমহলে কনফিউশন বিদ্যমান বলেই একে এখনো আমরা ততটা ভয়াবহ মনে করে উঠতে পারিনি। যতটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ব্রাজিল, স্পেন করোনা ভাইরাসকে ভয়াবহ মনে করেছে। এখনো বুঝতে পারছি না এটি আমাদের জাতিগত হুজুগ না কি অপরিণামদর্শী দুঃসাহস নাকি কথিত ‘কনফিউশন’! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ব্রাজিল বা স্পেনের মতো কোনো অভিজ্ঞতা আমাদের হোক এমনটি প্রত্যাশা করি না, তবু নিয়তির ফেরে যদি সেসব দেশের মতো অভিজ্ঞতা আমাদেরও অর্জন করতে হয় তবে তা সামাল দেয়ার দক্ষতা, সামর্থ্য ও সাহস আমাদের নেই। বিগত তিন মাসের চেষ্টায় আমরা দৈনিক সর্বোচ্চ মাত্র ১২ হাজার রোগীর পরীক্ষা নিশ্চিত করতে পেরেছি মাত্র! কিন্তু এই সংখ্যাটি দ্বিগুণ হলেই আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক হুলস্থুল পড়ে যাবে।
তবে এও ঠিক যে, কনফিউশন সত্তে¡ও স্বাস্থ্যবিধি ‘মেনে চলার’ এবং একই সঙ্গে ‘উপেক্ষা করার’ এক প্রকার মহড়ার মধ্যে আমরা ছিলাম আছি। আগামী দিনের আসন্ন করোনা-দুর্যোগে এই মহড়া হয়তো কাজে লাগবে। কিন্তু ইত্যবসরে ভয়াবহ ক্ষতির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। অর্থাৎ অধিক হারে মানুষের আত্মীয়-স্বজনের বিয়োগ ব্যথায় জর্জরিত হওয়ার বিকল্প কিছু থাকবে না। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছে করোনা কনফিউশনের নেপথ্যে ভয়াবহ দিনের অপেক্ষাতেই আমরা প্রহর গুনছি হয়তো। প্রহর গুনছি আরেকটি কঠোর লকডাউনেরও। এতদিনকার মানা ও না-মানা ‘স্বাস্থ্যবিধি’ হয়তো তখন আমরা মেনে চলব। কিন্তু ততদিনে হয়তো আমাদের অনেককেই হারাতে হবে।

আহমেদ আমিনুল ইসলাম : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

ডিসি