জিপিএ ৫ নয়, শিক্ষা হোক মূল্যবোধ বিকাশের

আগের সংবাদ

করোনায় নিজ হাসপাতালেই চিকিৎসকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

করোনার শিক্ষা ও প্রসঙ্গ কথা

মজিবর রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ২, ২০২০ , ৫:২১ অপরাহ্ণ

শতকরা প্রায় ৫৭ জন করোনা রোগী ঢাকা শহরের বাসিন্দা। বৃহত্তর ঢাকায় বিশেষত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে করোনা রোগীর সংখ্যা দেশের মোট রোগীর প্রায় ৮৫ শতাংশ। বাকি মাত্র ১৫ শতাংশ দেশের অন্যত্র। কিছুদিন ধরে হিসাবের এই তুলনামূলক ধারা অব্যাহত আছে। এর অর্থ হলো জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিপন্ন পরিবেশ করোনা ভাইরাস প্রসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভবিষ্যতে ডেঙ্গুসহ যে কোনো ছোঁয়াচে রোগের ক্ষেত্রে স্থানভেদে সংক্রমণের পরিসংখ্যান এমনতরই হবে বলে ধারণা করি। এককেন্দ্রিক উন্নয়নের কারণে ঢাকা হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের একক আধার। ফলে মানুষ আসছে এখানে স্রোতের মতো। পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। মানুষ-পরিবহন-বর্জ্য-বাজারে একাকার হয়ে উঠছে গোটা নগর। ঢাকাকে এখন গ্যাস চেম্বার বললেও অত্যুক্তি হবে না। আমরা সিটি করপোরেশনের দায়দায়িত্বের কথা বলি, বলি বিভিন্ন বিভাগ-অধিদপ্তরের মনিটরিং দুর্বলতার কথা; বাস্তবতা হলো মানুষের এই ঢাকামুখী স্রোত বন্ধ না হলে রোগবালাই থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন। শুধু নতুন অভিবাসন রোধ নয়, ইতোমধ্যে যে ঘনত্ব তৈরি হয়েছে এখানে তা কমানো প্রয়োজন। ঢাকা শহরের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরও করোনা মহামারির হটস্পট হয়ে উঠেছে। এর পেছনেও ওই একই কারণ ক্রিয়াশীল। কর্মসংস্থানের অপরিকল্পিত কেন্দ্র হওয়ার কারণে সে দুটি স্থানেও মানুষের বাস বেশি। সেখানেও পরিবেশ বিপন্ন। গাদাগাদি বাস শ্রমিকদের। যার পরিণতিতে রোগবালাইয়ের প্রকোপ বেশি।
ঢাকার ভালোমন্দের সঙ্গে দেশের ভালোমন্দ যুক্ত। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে করোনার মতো আরো বড় মহামারির উদ্গাতা ও কেন্দ্রস্থল হতে পারে ঢাকা। আর তার মূল্য দিতে হবে গোটা দেশকে। কাজেই সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে ঢাকায় মানুষের চাপ কমানোর কথা ভাবতে হবে কোনো না কোনো সময়। কাজটি যে খুব কঠিন তা নয়, বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন পড়বে। সরকার তার অফিস-আদালত ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের একাংশকে পার্শ্ববর্তী জেলা বা অন্য কোনো সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নিয়ে তার সূচনা ঘটাতে পারে। নীতিমালা প্রণয়ন দ্বারা বেসরকারি খাতকে ঢাকাবিমুখ করতে পারে। সরকার ইচ্ছে করলে এরকম আরো অনেক পদক্ষেপই নিতে পারে যার দ্বারা ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ হ্রাস করা সম্ভব। তবে আপাতত জরুরি প্রয়োজন হলো শহরটিকে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশসম্মত রাখা। তাতেও রক্ষা হবে কিছুটা।
অন্য দেশের প্রেক্ষাপট কি জানি না, তবে আমাদের দেশে মনে হচ্ছে জনসংখ্যার ঘনত্ব ও বিপন্ন পরিবেশ করোনার মতো মহামারি বিস্তারের অনুঘটক। উদাহরণ হিসেবে দেশের গ্রামাঞ্চলের কথা ধরা যেতে পারে। আমাদের গ্রামাঞ্চল বলতে গেলে করোনা ভাইরাসমুক্ত। সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব কম, পরিবেশও স্বাস্থ্যসম্মত এ কারণেই হয়তোবা গ্রামের মানুষ মুক্ত থাকতে পারছে করোনা ভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে।

দুই.
করোনা কিছু কিছু অনভিপ্রেত বিষয়কে আমাদের দৃষ্টিসীমায় এনেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অবস্থান বেশ জ্বলজ্বলে। বিভাগীয় ও জেলা সদর তো বটেই উপজেলা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও এসব প্রতিষ্ঠানাদির সাক্ষাৎ মেলে। তাদের ব্যবসা জমজমাট বলেই মানুষ জানে। অভিযোগ আছে, অহেতুক অপারেশনের ফাঁদে ফেলে এরা টাকা নেয়, অকারণ টেস্টের দোহাই দিয়ে মানুষের পকেট কাটে। তারা আমাদের ডাক্তারদের নৈতিকতাও নষ্ট করেছে কমিশনের লোভে ফেলে। এসব প্রতিষ্ঠানাদি যে স্রেফ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই গড়ে উঠেছে সন্দেহ নেই। তবে ব্যতিক্রমও আছে হয়তো কতক, কমিশনের লোভে কাবু হননি এমন ডাক্তারও নিশ্চয়ই আছেন।
তবে এ মুহূর্তে যে বিষয়টি পীড়া দেয় তা হলো, করোনার এই দুঃসময়ে তারা নেই। রোগী এলে নিরাপদ দূরত্বে থেকে কোনোরকম বাছবিচার না করেই বলে দিচ্ছেন আগে করোনা ভাইরাসের টেস্ট করিয়ে আনতে। অথচ তারা ভালো করেই জানেন, উপসর্গ ছাড়া বাংলাদেশে করোনার টেস্ট করানো সম্ভব নয়। ঢালাও সব রোগীকে করোনার লাইনে ঠেলে দিয়ে দুর্ভোগে ফেলছেন। সরকার তাদের করোনা নিয়ে বাণিজ্যের সুযোগ দেয়নি এ আক্রোশ থেকেই তারা এমন আচরণ করছেন কিনা তদন্ত করে দেখা উচিত। করোনায় স্বাস্থ্য খাতের নানান অব্যবস্থা বেরিয়ে আসার পর অনেক হিসাব-নিকাশ সামনে আসছে। দেখা যাচ্ছে খাতটিতে যে পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ থাকে তা অপ্রতুল। মোট বাজেটের ৫ শতাংশ, কিংবা মোট জিডিপির ১ শতাংশের নিচে থাকে বাজেট বরাদ্দ। বরাদ্দের দিক থেকে বিশ্বে নিম্নতর অবস্থান আমাদের। এই বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছেন সবাই। বাড়ানোর এমন দাবির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করার অবকাশ নেই। সেইসঙ্গে যে দাবিটা জোর দিয়ে করা উচিত তাহলো বরাদ্দকৃত বাজেটের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা, দুর্নীতি বন্ধ করা। অন্যান্য সরকারি খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতেও যে দুর্নীতির মচ্ছব বিদ্যমান তা গণমাধ্যমের কল্যাণে অহরহই আমরা জানতে পারছি। বাজেট বরাদ্দ যতটুকুই বাড়–ক দুর্নীতির রাশ টানতে না পারলে খাতটির বেহাল দশা দূর হবে না।

তিন.
বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষ বুঝতে পারছেন, এবারের বাজেট করা নিয়ে সরকারকে সমস্যায় পড়তে হবে। সরকারের আয় কমেছে বা কমবে, কিন্তু ব্যয় বাড়বে। লকডাউনের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষকে সাহায্য করতে হচ্ছে, আরো অনেকদিন এরকম সাহায্য করতে হতে পারে হয়তোবা। প্রণোদনা দিতে হবে বিভিন্ন খাতে। ব্যাংকগুলোর অবস্থা সার্বিক দৃষ্টিতে ভালো নয়, প্রণোদনার দায় তাদের ওপর যত কম চাপানো যায় ততই মঙ্গল। সেদিক চিন্তা করে ব্যাংকগুলোকেও অর্থ জোগাতে হবে। আবার যেসব প্রকল্প চলমান আছে সেগুলোর কাজও চালিয়ে যেতে হবে। জনকল্যাণে নতুন প্রকল্প হাতে না নিয়েও উপায় থাকবে না। এক্ষেত্রে অর্থ সাশ্রয়ের পথ অবলম্বন করা সরকারের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অর্থ সাশ্রয়ের দুটি পথ আছে। একটি দুর্নীতির লাগাম টানা; তাতে অপেক্ষাকৃত কম অর্থ ব্যয়ে উদ্দেশ্য হাসিল হবে। দ্বিতীয়টি অন্তত সাময়িকভাবে হলেও জাতীয় পর্যায়ে ‘অস্টারিটি মেজার’ বা কৃচ্ছ্রসাধন অবলম্বন করা। সরকারি অফিস-আদালত, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে অপ্রয়োজনীয় অনেক ব্যয় হয়, সেগুলো কমিয়ে অর্থ সাশ্রয় করে তা পুনর্বাসনের কাজে খরচ করা যায়।

চার.
আগেও বলেছি, এখনো বলি আমাদের বড় ভরসার জায়গা হচ্ছে কৃষি। কৃষি ভালো থাকলে সাধারণ মানুষ ভালো থাকবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদন, বিপণন ও সরবরাহের দিকে নজর রাখতে হবে সবচাইতে বেশি। করোনা ভাইরাসজনিত দুর্ভোগময় পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার কৃষকদের ৪ শতাংশ সুদে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। সেই ঋণ যাতে উপকারভোগীদের হাতে ঠিকমতো পৌঁছে সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। ক্ষুদ্র (কুটির শিল্প) ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্বল্প সুদে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণের যে ঘোষণা এসেছে তারও সঠিক বিতরণ অত্যাবশ্যক। জামানত ও অন্যান্য নিয়মনীতির কারণে এই শ্রেণিটি সহজে ব্যাংকের দরজায় ভিড়তে পারে না। দৃষ্টি না রাখলে তারা বঞ্চিতই থেকে যাবে। সবমিলিয়ে যা বলা সঙ্গত তাহলো খুব হিসাব করে চলার দিন সামনে। সরকার ও নীতিনির্ধারকদের ভাবনায় সে বোধ নিশ্চয়ই আছে। বাস্তবায়ন আশানুরূপ হলেই হলো।

মজিবর রহমান : কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি