সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অফিস খোলা থাকবে

আগের সংবাদ

প্রথম দিনে বাতিল ৬ ফ্লাইট

পরের সংবাদ

জীবন আগে না জীবিকা?

প্রভাষ আমিন

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০২০ , ৮:১১ অপরাহ্ণ

টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি শেষ হলো অবশেষে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সবকিছুই সীমিত পরিসরে খুলেছে। রাস্তায় ভিড় আগেই ছিল, এখন সেটা বেড়েছে। যেদিন প্রথম অফিস খুললো, সেদিনই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংএ সর্বোচ্চ ৪০ জনের মৃত্যুর ঘোষণা এলো, আক্রান্তও আড়াই হাজারের ওপরে। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ ছুটি বাতিল করা কি ঠিক হলো নাকি ঝুঁকি আরো বাড়লো- এই নিয়ে এখন পক্ষে-বিপক্ষে তুমুল তর্ক? দুই পক্ষেরই যুক্তি আছে। আগে আমার অবস্থান পরিষ্কার করে নেই। বিষয়টা যেহেতু ‘সাধারণ ছুটি’ই তাই এর মেয়াদ বাড়ানো কমানো নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমাদের দরকার ছিল জরুরি অবস্থা, লকডাউন বা কারফিউ। মানে কঠোরভাবে মানুষকে ঘরে আটকে রাখা। কিন্তু সেটা আমরা পারিনি, চেষ্টাও করিনি আসলে। অনেকেই বলছেন, মানুষ কথা না শুনলে সরকার কী করবে? কিন্তু সরকার হঠাৎ করে এমন জনদরদী, মানবিক হয়ে উঠলো কেন, সেটাই তো বোধগম্য নয়। সরকার ছুটি দিয়েছে ঘরে থাকার জন্য, তারপরও মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ সরকার কিছুই বলছে না। অথচ একবার ভাবুন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যদি কোনো নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বা গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে মিছিল-সমাবেশ করতে রাস্তায় নামে, সরকার কী করবে? তো জনগণের অধিকার কেড়ে নেয়ার সময় সরকার কঠোর হতে পারলে মানুষের জীবন বাঁচাতে তাদের জোর করে ঘরে রাখতে পারলো না কেন? সাধারণ ছুটির একেবারে শুরুর দিকে এক নারী কর্মকর্তা দুই প্রবীণ মানুষকে কান ধরিয়েছিলেন। তা নিয়ে তখন তোলপাড় হয়েছিল। বলা হয় সমালোচনার ভয়ে এরপর আর কেউ আইনের বাইরে যাননি। বুঝলাম না, হঠাৎ সরকার মানুষের সমালোচনাকেই বা এত আমলে নিলো কেন? সমালোচনাকে ভয় পেলে তো মানুষের কথা বলার অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোটাধিকার, মানবাধিকারের ব্যাপারে আরো সতর্ক থাকতো।

সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সাধারণ ছুটির নামে যে প্রহসন চলছিল, তার অবসান ঘটায় আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি। শুধু শুধু সরকারি কর্মচারিদের বসিয়ে বসিয়ে বেতন দেয়ার কোনো মানেই হয় না। সাধারণ ছুটি দেয়া হয়েছে অর্থনীতির বিশাল ঝুঁকি নিয়ে। আসলে সরকার অর্থনীতির বিনিময়ে জীবন কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ ছুটি কঠোরভাবে কার্যকর করতে না পারায় অর্থনীতিও মরছে, মানুষও মরছে। তারচেয়ে সব খুলে দেয়াই ভালো। এক মাস আগেই আমি বলেছিলাম, হয় কারফিউ দিন, নয় সবকিছু খুলে দিন। এখন মনে হচ্ছে, মানুষকে ঘরে রাখতে না পারায় সাধারণ ছুটির পুরোটাই আসলে অপচয় হয়েছে।

তবে সরকারের সমালোচনা করার আগে আত্মসমালোচনা করাটাও জরুরি। এই সাধারণ ছুটি, এই মানুষকে ঘরে রাখার চেষ্টা- পুরোটাই কিন্তু হয়েছে মানুষের স্বার্থে। আমরা আমাদের স্বার্থরক্ষায় সরকারকে কতটুকু সহায়তা করেছি? ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি শুরুর প্রথম কয়েকদিন বাদ দিলে আমরা কিন্তু দিনের পর দিন পুলিশের সঙ্গে চোর-পুলিশ খেলেছি। গাড়িতে ‘কিডনি রোগী’ লিখে বাজার করতে গেছি, পকেটে পুরোনো প্রেসক্রিপশনের ফটোকপি নিয়ে বাসা থেকে ঘুরতে বেরিয়েছি। প্রায় নিয়মিত বাজারে গেছি। বাসার ছাদে জামাত করে নামাজ পড়েছি। গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে লারেলাপ্পা খেলেছি। কোনোরকমের স্বাস্থ্যবিধি না মেনে সপরিবারে ঈদ শপিং করেছি। নাড়ীর টানে বাড়ি গেছি গাদাগাদি করে। ফিরেছিও একই স্টাইলে।

যাদের বাইরে থাকতেই হয় তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা অপ্রয়োজনে বাইরে বের হন, তারা নিজেরা তো ঝুঁকিতে থাকছেনই, ঘরে ফিরে ঘরে থাকা স্বজনদেরও ঝুঁকিতে ফেলছেন। অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া লোকজনই সবচেয়ে বিপদজনক। আমরা যারা সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুক ফাটিয়ে ফেলি, তারা কি নিজেরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি? করোনা মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। সরকার বিমান বন্দরে প্রবাসীদের যথাযথ চেক দিতে পারেনি, একটা ভালো কোয়ারেন্টাইন সেন্টার বানাতে পারেনি, টেস্ট করার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে পারেনি, চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা করতে পারেনি। মুজিববর্ষে আতশবাজি ঠেকাতে পারেনি, যথাসময়ে ছুটি দেয়নি, ছুটির পর মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি, লকডাউন কার্যকর করতে পারেনি, ঝুঁকি থাকার পরও লকডাউন শিথিল করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় লাখো মানুষের জানাজা ঠেকাতে পারেনি, বাজারে সমাগম ঠেকাতে পারেনি, ধানকাটার নামে ফটোসেশন ঠেকাতে পারেনি, এন-৯৫ মাস্কের দুর্নীতি এবং সে কারণে ডাক্তারদের ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠেকাতে পারেনি, এন-৯৫ মাস্ক কেলেঙ্কারির প্রতিবাদকারীদের ওএসডি হওয়া ঠেকাতে পারেনি, সারাদেশে করোনার বিস্তার ঠেকাতে পারেনি। সব অভিযোগ ঠিক আছে। কিন্তু অভিযোগটা আপনি করছেন কোথায় বসে? বিকেলে ঘুরতে বেরিয়ে চায়ের দোকানে ১০ বন্ধু গোল হয়ে আড্ডা দিতে দিতে সরকারকে তুলোধুনো করছেন না তো। সাধারণ ছুটি দিয়ে সরকার অর্থনীতির বিবেচনায় বিশাল ঝুঁকি নিয়েছে। কিন্তু আমরা কি সবাই সেটা মানছি। মানুষকে ঘরে বসিয়ে রাখার মধ্যে কিন্তু সরকারে কোনো লাভ নেই। আমাদের ভালোর জন্যই কিন্তু সরকার আমাদের ঘরে রাখতে চায়। কিন্তু নিজেদের ভালোটা বুঝতে চাইছি না। এরপর আসলে সরকারের সাধারণ ছুটি তুলে নেয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।

যাদের সত্যি প্রয়োজন তারা কারফিউর সময়ও বেরুতে পারেন। সত্যি প্রয়োজন হলো, যেটা না করলে আপনি খেতে পাবেন না বা অসুস্থ হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু যারা অপ্রয়োজনে বাইরে বের হন, তারা নিজেরা তো ঝুঁকিতে থাকছেনই, ঘরে ফিরে ঘরে থাকা স্বজনদেরও ঝুঁকিতে ফেলছেন। অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া লোকজনই সবচেয়ে বিপদজনক। কিন্তু প্রত্যেককে জিজ্ঞাসা করে দেখুন, সবারই জরুরি প্রয়োজন। ধরুন শপিঙে না গেলে, ঈদে বাড়ি না গেলে, প্রতিদিন বাজার না করলে, ঈদের দিন না বেরুলে কি আপনি মরে যেতেন? তাহলে এগুলোর কোনোটাই প্রয়োজনীয় নয়। যারা এই অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো করেছেন, তারা যেন অন্তত ছুটি না বাড়ানোয় সরকারের সমালোচনা করবেন না।

করোনা তো সহজে যাবে না। হয়তো কখনোই যাবে না। কিন্তু সাধারণ ছুটি তো আর অনন্তকাল চলতে পারে না। আগে আর পরে সাধারণ ছুটি একদিন না একদিন শেষ হতোই। তবে আমরা যদি সরকারকে সহায়তা করতাম। টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটি যদি আমরা সত্যি সত্যি ঘরে বসে কাটাতে পারতাম; তাহলে এখন অনেকে স্বস্তিতে অফিস শুরু করতে পারতাম। কিন্তু এখন সবকিছু খুলে যাচ্ছে শুনে রীতিমত আতঙ্কে আছি। সাধারণ ছুটি থাকা অবস্থায় যেভাবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে সব খুলে যাওয়ার পর কী হবে; আল্লাহই জানেন।

আসলে আমরা একভাবে চিন্তা করি। কিন্তু সরকারকে চিন্তা করতে হয় নানামুখী, সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় সবকিছু ভেবেচিন্তে। তার কাছে মানুষের জীবন বাঁচানো যেমন জরুরি, মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করাও জরুরি। সাধারণ ছুটি প্রসঙ্গে অনেকেই বলেন; জীবন আগে না জীবিকা? জানি এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই বলবেন, অবশ্যই জীবন আগে। জীবন বাঁচলেই না জীবিকার প্রশ্ন। কিন্তু আবার এটাও তো ঠিক জীবিকা ছাড়া জীবন বাঁচানোও কঠিন। তাই জীবন এবং জীবিকার ভারসাম্যটা খুব জরুরি। সরকারকে এই ভারসাম্যের কথাও ভাবতে হয়। তবে জীবিকাটা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, এই মুহূর্তে বেঁচে থাকাটাই সবচেয়ে বড় অর্জন, সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

দেশে বা বিদেশে, ব্যাংকে আপনার যত টাকাই থাকুক; এই মুহূর্তে খুব ভালো চিকিৎসা পাবেন না। করোনা হলে তো হাসপাতাল সীমিত। করোনা ছাড়া অন্য কোনো রোগে ভুগলেও আগের মতো দ্রুত ও উন্নত চিকিৎসা পাওয়ার গ্যারান্টি নেই। হাসপাতালে ভর্তি হতে পারলেও সময়মত ভালো ডাক্তার পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই অর্থ আসলে অর্থহীন। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি নিরাপদ থাকা, সুস্থ থাকা। সরকার সবকিছু খুলে দিলেও আমাদের সাবধান থাকতে হবে। তাই বাসা থেকে বের হতে হলে সঠিক একটি মাস্ক পরে নিতে হবে, সবার সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। পকেটে হ্যান্ড স্যানিটাইজার রাখতে হবে। বাসায় ফিরে গরম পানিতে গোসল করতে হবে এব সব কাপড় ধুয়ে ফেলতে হবে। জীবাণুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত কিন্তু কেনা কোনো খাবারই খাওয়া যাবে না। মনে রাখবেন নিজেকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখার মূল দায়িত্ব কিন্তু আপনারই।

সরকার সাধারণ ছুটি বাতিল করার পর ফেসবুকে একটা কমন স্ট্যাটাস ঘুরছে, ‘সরকার যতই লকডাউন তুলে দিক, আপনি ততই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। মনে রাখবেন আপনি সরকারের কাছে শুধুমাত্র একটি সংখ্যা, কিন্তু আপনার প্রিয়জনদের কাছে আপনিই পুরো পৃথিবী।’

লেখক: হেড অফ নিউজ, এটিএননিউজ
[email protected]

এনএম