আদর্শের বিপরীতেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আদর্শ

আগের সংবাদ

শিক্ষার্থীদের আত্মহনন প্রবণতা ও অভিভাবকদের সচেতনতা

পরের সংবাদ

কাজে ফেরা, নিজেকে রক্ষা করা

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০২০ , ৪:৪৩ অপরাহ্ণ

গত রবিবার, ৩১ মে থেকে এতদিন ছুটিতে থাকা সরকারি অফিস পরীক্ষামূলকভাবে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে। ট্রেন, লঞ্চ ও গণপরিবহন চালু হয়েছে। তবে সবক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন করার নির্দেশনা রয়েছে। ঈদের পর এভাবে লকডাউন খুলে দেয়া হবে, কাজকর্ম, ব্যবসা, বাণিজ্য শুরু করতে দেয়া হবে এমনটি সাধারণভাবে ঈদের ছুটিতে অনেকে ভাবতে পারেনি। প্রায় সবারই ধারণা ছিল যে, দেশে যেহেতু করোনা সংক্রমণ এবং মৃত্যুর হার ঈদের আগের চাইতে পরের দিকে দ্রুতগতিতে বাড়তে শুরু করেছে তাই সরকার হয়তো ছুটি ও লকডাউন আরেক মেয়াদে বাড়িয়ে দেবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, ঈদে যেহেতু বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা থেকে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে বাড়ি গিয়েছিল, তাই গ্রামাঞ্চলে এদের দ্বারা করোনা সংক্রমণের গতি-প্রকৃতি দেখেই সরকার হয়তো কাজে ফেরার সময় নির্ধারণ করবে। কিন্তু সরকারি অফিস খোলাসহ অন্যান্য বন্ধ প্রতিষ্ঠান ও পরিবহন খুলে দেয়ার ঘোষণার সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের বড় অংশই একমত হতে পারেননি। তাদের বক্তব্য হচ্ছে আরো কিছু দিন প্রস্তুতি নিয়ে কাজে ফেরার সময় নির্ধারণ করা হলে ঝুঁকির আশঙ্কা কম হতো। যেহেতু করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাই ঝুঁকির আশঙ্কা কমানো নাও যেতে পারে। তবে সরকার এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিশেষজ্ঞদের এমন মতামত জানা থাকার পরও জীবন ও জীবিকাকে রক্ষা তথা দেশের অর্থনীতির স্থবিরতাকে চ‚ড়ান্তভাবে খাদের কিনারায় যেতে না দেয়ার অবস্থান থেকে ঝুঁকি নিয়ে হলেও কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনায় যে অভিজ্ঞতাটি বিশেষভাবে ছিল তা হচ্ছে, ২ মাসের অধিক সময় ধরে সব কিছু বন্ধ রাখার যে ঘোষণা সরকার দিয়েছিল তা যথাযথভাবে অনুসরণ করেছিল এমন মানুষের সংখ্যা খুবই সীমিত ছিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে জারি করা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়নি। অধিকন্তু তাদের ঘরে রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর সদস্যদের রাতদিন প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যেতে হয়েছিল। কিন্তু তারপরও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। ব্যাপকসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, কয়েকজন মৃত্যুবরণও করেছিলেন। এসব হিসাব-নিকাশ সরকারের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে হয়তো ভ‚মিকা রেখেছে। তবে জুন মাসের আর্থিক বিবেচনাটি সরকারকে হয়তো বেশি মাথায় রাখতে হয়েছে। অর্থবছরের হিসাব-নিকাশ হাতে পাওয়া, নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন করা এবং জুলাই মাস থেকে সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণে রেখে নতুন অর্থবছরটি শুরু করা না গেলে করোনা ভাইরাসের অভিঘাতে বিদায়ী অর্থবছরের সংকট মোকাবিলা করা সরকারের জন্য বেশ বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। সে কারণে সরকার বিদায়ী অর্থবছরের শেষ মাসটি একেবারে লকডাউনে না রেখে চ্যালেঞ্জের ঝুঁকি নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন জুন মাসের পরিস্থিতি কতটা সরকারের ধারণা মতো চলবে তার ওপরেই অনেক কিছু নির্ভর করবে।। যদি করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তাহলে সরকার হয়তো সিদ্ধান্ত পাল্টানোর অবস্থানে চলে যেতে পারে। সেই দরজা সরকারের জন্য উন্মুক্ত আছে। তেমন ধারণা নীতি-নির্ধারকদের কারো কারো কথাবার্তা থেকে পাওয়াও গেছে। বিষয়টি কয়েকদিন পর পরিষ্কার হবে। আপাতত সরকার পরীক্ষামূলকভাবে সরকারি অফিস, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, দোকানপাট, পরিবহন ইত্যাদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মানে এই নয় যে, সবাইকে এখনই পরিপূর্ণভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য, চলাফেরা ইত্যাদি করার সব অধিকার আগের মতো দেয়া হয়েছে। যেসব বিধিবিধান কার্যকর করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দোকানপাট, মার্কেট ইত্যাদি খোলার অনুমতি দেয়া হয়েছে সেগুলো রাতারাতি অনেকের পক্ষেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কেননা ২ মাসের অধিক সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, শ্রমিক কর্মচারীদের অনেকেই কাজে যোগদান করতে পারবে কিনা সেটি নির্ভর করছে মালিকপক্ষের হিসাব-নিকাশ, আর্থিক সক্ষমতা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং করোনা বাস্তবতার সর্বশেষ গতিপ্রকৃতির ওপর। করোনা ভাইরাস পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও সব ক্ষেত্রে যে বিরাট ভাঙচুর করে চলছে তার শেষ পরিণতি কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা এখনো কারো কাছে স্পষ্ট নয়। তবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে করোনার আঘাত শুরু হলেও গত ৩-৪ মাসে করোনা ভাইরাস পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক শিক্ষা, ধর্মীয়, রাজনৈতিকসহ সব ক্ষেত্রে যে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে এসেছে তা কারোরই অনুমান, ধারণা, বিচার-বিশ্লেষণ, বিশ্বাস ইত্যাদির সঙ্গে এখনই মেলানো যাচ্ছে না। কেউই জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে ভাবতে পারেনি অদৃশ্য অণুজীব করোনা ভাইরাস এত সব মানুষের প্রাণ কেড়ে নেবে, এত সব প্রতিষ্ঠানকে শূন্য করে ফেলবে, শক্তিহীন, কর্মহীন করে ফেলবে এটি কল্পনারও বাইরে ছিল। এখন জুন মাসের শুরুতে পেছনে ফিরে তাকালে শুধুই হাহাকার, আর্তনাদ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, সম্পদ ও উৎপাদনশীলতার অভাব, ক্রন্দনশীলতা এবং বেকারত্বের বাস্তবতা। অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি দোকান মালিক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কিনা সেই শঙ্কা কিছুতেই কাটার নয়। অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্য আগের নিয়মকানুন, পদ্ধতি, জনবল-জনকাঠামোতে এখন আর পরিচালিত করা সম্ভব নয়। নতুন বিধিতে পরিচালিত করার ক্ষেত্রে যেসব চ্যালেঞ্জ সবার সম্মুখে থাকবে তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে কিনা তা বলা কঠিন। করোনা ভাইরাসের অভিঘাত প্রলম্ভিত হলে এই পরিস্থিতি আরো জটিল হবে। তাতে সব কিছু নতুন করে শুরু করা, টিকে থাকা, নতুন করে অভ্যস্ত হওয়া খুবই কঠিন ব্যাপার হবে। আপাতত যেসব প্রতিষ্ঠান এখন করোনার সব ঝুঁকি মাথায় নিয়ে শুরু করতে চাচ্ছে তারাও কে কতটা সফল হবে, ধরে রাখতে পারবে সেটি কয়েকদিন পরই দেখা যেতে পারে।
কাজে ফেরার কথাটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য এক ধরনের শোনালেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কী হবে সেটি বাস্তবতা নিরিখে বুঝতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগদান সরকারি চাকরি বিধির অনুষঙ্গ মাত্র। কারোরই চাকরি বা কাজ হারানোর ভয় নেই। তাই সেগুলোতে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কাই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। সেখানে কাজ আছে কিনা সেই আতঙ্কই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, মরণব্যাধি করোনার আক্রমণ তাদের যতটা না আতঙ্কিত করছে তার চাইতে বেশি করছে প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা, চাকরি তথা কাজ। অনেক প্রতিষ্ঠানই কর্মচারী সংকোচনের নীতিতে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেকেই কাজ হারানোর আতঙ্কে আছেন। অনেক ছোট-বড় মালিকও কবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন সেই অনিশ্চয়তায় মালিক, শ্রমিক, কর্মচারীদের অনেকেই দীর্ঘদিন হয়তো থাকবে। এমন পরিস্থিতি যদি এখনই আমাদের দেখতে হয় তাহলে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি মোটেও সুখের হবে না। সে কারণে করোনার নানা চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুযোগটি বেশ জটিল এবং কষ্টদায়ক হলেও সংশ্লিষ্ট সবার ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ফলে যদি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রবণতা এই জুন মাসেই শুরু করা সম্ভব হয় তাহলে সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি খুব মন্থরগতিতে হলেও উন্নতির সড়কে ওঠার সুযোগ পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু যদি এই প্রচেষ্টা সফল না হয় তাহলে আঘাতটি আরো বড় হতে পারে। সে কারণে সবারই উচিত হবে কাজে ফিরে আসার এই সমস্যাসঙ্কুল পরিস্থিতিকে কাজে লাগানো। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার এই পরীক্ষায় সবাই যেন যত্নবান হওয়ার চেষ্টা করেন। তাহলেই কেবল খুলে দেয়া প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে হলেও টিকে থাকার সংগ্রামে সফল হওয়ার আশা করেতে পারে। সব মহলেই যে শঙ্কাটি বিরাজ করছে তা হচ্ছে গণপরিবহন, দোকান, মার্কেট, অফিস তথা কর্মস্থলে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হবে কিনা, একইভাবে কর্ম ফেরত মানুষগুলো বাসাবাড়িতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অবস্থান করবে কিনা। এর কোথাও যে কারো সামান্যতম বিচ্যুতি যে কোনো পরিবার, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানে মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে আসতে পারে। এই সম্পর্কে গত কয়েক মাসের সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা যদি আমাদের উপলব্ধিতে থাকে তাহলে হয়তো আমরা সামনের অগ্নিপরীক্ষায় সফল হতে পারি। নতুবা করোনার কাছে আমাদের আরো অনেকদিন বিপর্যস্ত হতে হবে। তেমন বিপর্যয়ের কাছে হার মানলে আমাদের অস্তিত্বের সংকট বেড়েই যেতে পারে। সে কারণেই বলছি কাজে ফেরার হয়তো এখন আনন্দ নেই, ভয়-ভীতি আছে। কিন্তু জুন মাসের করোনার ভয়ভীতিকে অতিক্রম করার একমাত্র উপায় হচ্ছে সর্বক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার সচেতনতায় প্রতিটি দিন সফল হওয়া, অতিক্রম করা। তাহলেই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা পরিদৃষ্ট হবে।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি