লকডাউন প্রত্যাহার কতটা জরুরি?

আগের সংবাদ

কাজে ফেরা, নিজেকে রক্ষা করা

পরের সংবাদ

আদর্শের বিপরীতেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আদর্শ

ফারুক যোশী, লন্ডন থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: জুন ১, ২০২০ , ৪:৪০ অপরাহ্ণ

ব্যাংক লুট করে হাজার-লাখো কোটি টাকা (মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার) নিয়ে আমাদের ব্যাংক লুটেরারা যখন কানাডায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমায়, তখন এগুলো গণমাধ্যমে জায়গা করে নেয়। যে সরকারের আমলে এসব ব্যাংক ডাকাতি হয় কিংবা দুর্নীতি হয়, ফলত সেই সরকারই দায়ী হয়ে থাকে সমকালের কাছে। রাজনীতির ময়দান থেকে শুরু করে সব জায়গায়ই সরকারের সমালোচনা হতে থাকে। খুব স্বাভাবিকভাবে যারা এসব ডাকাতি কিংবা লুট করে পালায়, তারা কোনো না কোনোভাবে সরকারের কাছের কিছু প্রভাবশালী অনৈতিক লোকগুলোকে ব্যবহার করে তারা এ অর্থের পর্বত গড়ে তোলে। এতে অনৈতিক লোকগুলোও অর্থ-বিত্তে টইটুম্বুর হয়, অন্যদিকে দেশের সম্পদ হয়ে যায় বিদেশে পাচার।
পশ্চিমের দেশগুলোও এরকম, তারা তাদের জাতি কিংবা রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি করে ঠিকই, কিন্তু যে কোনোভাবেই হোক লুট করে কেউ নিয়ে এলেও অর্থবিত্তের মালিকদের তারা জায়গা দেয়। বিনিয়োগ করার সর্বোচ্চ সুযোগ তারা করে দেয়। যার ফলে হাজার হাজার জবের সৃষ্টি করে দেশগুলো। আমার পাশেই আছে ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাব। আরবদের অর্থে নতুন শহর যেন গজিয়েছে ম্যানচেস্টারে। জব সৃষ্টি হয়েছে শত-সহস্র। আরেকটা উদাহরণ বাংলাদেশি আরেক মিলিয়নিয়ারের। তাও আমার আবাসের পাশের শহরে। হোটেল ব্যবসায় বিনিয়োগ করা ওই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীও শত শত চাকরি সৃষ্টি করেছেন স্টকপোর্ট এলাকায়। এভাবেই পশ্চিমারা হাতছানি দিচ্ছে, পাহারা দিচ্ছে আত্মসাৎকৃত অর্থের, আর সমৃদ্ধ করছে তাদের অর্থনীতি। এ টাকাগুলো আর ফিরে যায় না। বরং বছরে বছরে লুট হওয়া অর্থে ইউরোপ ইংল্যান্ড আমেরিকা কানাডা প্রভৃতি দেশগুলোর অর্থনীতি আরো হৃষ্টপুষ্ট হয়।
বিএনপির মন্ত্রী যখন ৩৮৩ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা থাকার পরও বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন দিয়ে বৈধভাবেই বেরিয়ে যান, তখন আইনগত কোনো প্রশ্ন না এলেও বিস্মিত হতেই পারে দেশটির নাগরিক। এবং এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করাটা তাদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। এই আলোচনা-সমালোচনা করতে গিয়ে দু/চার কথা কেউ যদি লিখে বসে তার নিজস্ব যোগাযোগের জায়গাটাতে, তাতে কি বড় কোনো অপরাধ হয়ে যাবে?
আপাতত তাকেও আমরা একজন বিশাল বড়মাপের ধনী মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করতে পারি। কারণ এরকম কিংবা এর চেয়ে বিশাল অঙ্কের টাকাওয়ালার সংখ্যা বাংলাদেশে হাতেগোনার মতো নয় এখন। এখন জেলা শহরেও ব্যবসাবিহীন তরুণগুলোও হেলিকপ্টার ভাড়া করে বিয়ে করে। হানিমুনে ইউরোপ-দুবাই খেপ মারে। ছাত্রনেতা থেকে বিদায় নিয়েই লন্ডনে এসে জমজমাট ব্যবসায় লেগে যেতে পারে। আর মোরশেদ খান তো রাজনীতি ব্যবসার সঙ্গে কয়েক যুগ থেকেই জড়িত। সুতরাং তিনি ব্যক্তিগত বিমান ভাড়া করে যুক্তরাজ্যে আসতেই পারেন। তাছাড়া নিউজগুলোর যদি ভিত্তি থাকে, তাহলে তো এ বিমান ভাড়ায় একটা টাকাও তার ব্যয় করতে হয়নি। টাকা তো ‘গৌরি সেন’ই দিয়েছেন অর্থাৎ আত্মসাৎকৃত টাকা দিয়েই তিনি গড়েছেন তার নিজস্ব জলুস।
সিটিসেলের নামে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ৩৮৩ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় ২০১৯ সালের ১০ জুন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মজার ব্যাপার হলো, ওই বছরই অর্থাৎ ২০১৯ সালের নভেম্বরে বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে দেন তিনি। অর্থাৎ রাজনীতিতে যে ‘বিএনপি-কলুষ’, এই কলুষমুক্ত হয়ে ‘পবিত্র’ হয়েছেন তিনি। সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে বড় প্রেসক্রিপশন। তিনি কলুষমুক্ত হয়েছেন। আর সেজন্যই হয়তো দুদকের মামলা আমলে নিয়েও তাকে বিদেশ যাত্রায় কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি।
কিন্তু এ নিয়ে কথা খুব একটা কথা উঠেনি। উঠেছে শুধু তার চার্টার্ড করা বিমান নিয়ে। মোরশেদ খান কি শুধুই করোনা থেকে পালিয়েছেন? অনেকেই হয়তো বলতে পারেন, তার স্ত্রীকে নিয়ে করোনা থেকে মুক্ত থাকতেই যুক্তরাজ্য পৌঁছেছেন। সে কথাটা কি জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে? কারণ ব্রিটেন তো এখনো করোনা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ২০০ থেকে ৪০০ মৃত্যু নিয়েই তো কাটাতে হচ্ছে আমাদের প্রতিদিনের যুক্তরাজ্যের দিনগুলো। যুক্তরাজ্যের মৃত্যু বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে মতে বাংলাদেশ তো নিরাপদ। কিন্তু ওই ‘নিরাপদ’ জায়গায় সাবেক মন্ত্রী থাকতে চাননি। কারণ সত্যিকার অর্থে তিনি বুঝেছেন করোনা তাকে নিরাপদ রাখলেও ৩৭৩ কোটি টাকা তার পিছু ছাড়বে না। তাই তো তার ওই উড়াল দেয়া।
গত ক’দিন আগে ভোরের কাগজেই দুটো নিউজ উঠেছে তাও একই দিনে। ‘করোনায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাস চালানোর ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গাইবান্ধায় এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া সাংবাদিক মো. সিরাজুল ইসলাম রতন ‘দৈনিক মানবজমিন’ পত্রিকার পলাশবাড়ী উপজেলা প্রতিনিধি। গণপরিবহন চলাচলে সরকারি নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বাস চালিয়ে ধরা পড়ে ফাতেমা পরিবহন। সেসব ঘটনায় ট্রাফিক আইনে মামলা করে জরিমানা আদায়ও করা হয়। তবে এরপরও ফাতেমা পরিবহন মহাসড়কে বাস চালিয়ে আসছিল। পরে এ নিয়ে সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পরে গাইবান্ধা জেলা বাস মিনিবাস কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং ফাতেমা পরিবহনের মালিক আব্দুস সোবাহান ওরফে বিচ্চুর দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
অন্যটা হলো শেরপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেসবুকে কট‚ক্তি করার অভিযোগে মনির হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে থানা পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (২৪ মে) মনির হোসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে কটূক্তি করে একটি পোস্ট দেয়। এ নিয়ে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা হয়। অন্যদিকে আরেকটা নিউজ যা লন্ডনের এক সাংবাদিক ঘিরে। আমার হবিগঞ্জ নামের একটা পত্রিকায় ওই সম্পাদক প্রকাশককে গ্রেপ্তার করার পর ২৭ মে তার জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছে আদালত। তিনটা নিউজের মাঝে দুজন সাংবাদিক এবং অন্যজনের পরিচয় সাধারণ নাগরিক হিসেবেই এসেছে। সুশান্ত ইংল্যান্ডে ছিলেন। তার সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। ফেসবুকে তাকে আমি চিনি। তার বন্ধু-বান্ধবদের বিশ্বাস সুশান্ত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার একজন সৈনিক হিসেবেই কাজ করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবেই। কিন্তু তারপরও তিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।
প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বললে হয়তো মামলা হতেই পারে। কিন্তু অন্য দেশের কারো বিরুদ্ধেও কোনো কথা বললে তাও তাৎক্ষণিকভাবেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়ে যাবে? কিংবা ওই যে সাংবাদিক যিনি বাস চালিয়ে আসার কথা লেখায় মালিকপক্ষ দ্বারা ডিজিটাল মামলায় ফেঁসে গেলেন। যেহেতু আইন আছে গ্রেপ্তার করার, সেহেতু হয়তো গ্রেপ্তার করা যেতেই পারে। তাই পুলিশও বাছ-বিচার না করে তাকে ধরে নিয়ে গেল! ক্ষমতা এমন এক সম্মোহন, যা দিয়ে যে কাউকে বদ করা যায়, আবার বশেও আনা যায় অনেক কিছু। বদ করতে গিয়ে কিংবা বশে আনতে আইনের মারপ্যাঁচে একই দলের নেতাকর্মীরা যখন পারস্পরিক দ্বন্দ্বে মেতে ওঠেন এবং এই দ্ব›দ্ব প্রকারান্তরে দলের নেতা কিংবা সামগ্রিকভাবে দলকেই প্রশ্নবোধক করে তোলে তখন আইন বুমেরাং হয়ে যায়। যার অর্থ হয়, নিজের বিরুদ্ধেই অবস্থান নেয় নিজস্ব মানুষ, অন্য অর্থে দলের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায় দল। অর্থাৎ নেতার বিরুদ্ধে নেতা, আদর্শের বিপরীতেই দাঁড়িয়ে যায় আদর্শ।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি