করোনাভাইরাস

ঢাবি শিক্ষক করোনায় আক্রান্ত

আগের সংবাদ

ঝুঁকি নিয়েই ফিরছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা

পরের সংবাদ

করোনায় খুলছে অফিস-গণপরিবহণ

রাজধানীতে চাপসহ ঝুঁকি বাড়ছে ডিএমপির

আজিজুর রহমান জিদনী

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০২০ , ২:০৩ পূর্বাহ্ণ

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব রোধে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটির পর আজ রবিবার (৩১ মে) অফিস খুলছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে সীমিত আকারে। সীমিত পরিসরে চলাচল শুরু করবে গণপরিবহনও। লকডাউন শিথিলের এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীমুখী হবেন অনেকেই। যেকোনো উপায়েই ঢাকায় ঢুকে পড়বেন শ্রমজীবী নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ। করোনা মহামারীর মধ্যেই রাজধানী কর্মচাঞ্চল হয়ে উঠলে সবচেয়ে বেশি চাপ আর ঝুঁকিতে পড়বেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সদস্যরা।

# চ্যালেঞ্জিং হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টায় থাকবে পুলিশ সদরদপ্তর #পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়েই কাজ করছে ডিএমপি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সংক্রমিত দেশ হিসেবে র‌্যাংকিংয়ে প্রতিবেশী ভারত ছিল ৪ নম্বরে আর পাকিস্তান ৯ নম্বরে। বাংলাদেশ ছিল ৫২ নম্বরে। তবে এর মধ্যেই আমাদের অবস্থান নিম্নমুখী হয়ে ১০ নম্বরে নেমে এসেছি। এ পরিসংখ্যান থেকে এটা স্পষ্ট যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, বাংলাদেশের মতো সীমিত সম্পদের দেশে খেটে খাওয়া মানুষের সংখ্যাই বেশি। সাধারণ ছুটি থাকায় তাদের অনেকে গ্রামে চলে গিয়েছিলেন, আবার যারা শহরে অবস্থান করছিলেন তারা গণপরিবহণের অভাবে অন্যত্র যেতেও পারেননি।

করোনার প্রাদুর্ভাব রোধে গেল প্রায় দুমাসে সাধারণ ছুটিতে এসব নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ একেবারেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। অনেকে অতি কষ্টে জমানো সামান্য সঞ্চয়টুকুও শেষ করে ফেলেছেন। এখন তারা সরকারি সহায়তা আর ত্রাণের ওপর পুরোপুরিই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সীমিত আকারে হলেও খুলে যাচ্ছে সবকিছু। গণপরিবহণও চলবে সীমিত পরিসরে। আর তাতে জীবিকার প্রয়োজনসহ নানা তাগিদে মানুষ ঢাকামুখী হবেন।

এর আগে সাধারণ ছুটির সময়ও নিয়ম মানার কোনো বালাই ছিল না। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করেই বাজারে যাওয়া ও রাস্তায় অহেতুক ঘোরাফেরার ঘটনাও দেখা গেছে। আর সেক্ষেত্রে নিয়ম মানাতে সরকার তথা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা উদ্যোগ নিতে হয়েছে। কয়েকদিন আগেও ঈদে ঘরে ফেরা আর ঈদ শেষে রাজধানীতে ফেরার যে চিত্র দেখা গেছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক। আর এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সবচেয়ে বেশি চাপ আর ঝুঁকিতে পড়তে হয়েছে।

অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি করোনা রোগীকে আইসোলেশনে পাঠানো, আশপাশের এলাকা লকডাউন করা ও মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডে দেখা গেছে পুলিশকে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রশংসা অর্জন করলেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন তারাই বেশি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত পুলিশের প্রায় সাড়ে চার হাজারের বেশি সদস্য করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত দেখা গেছে ডিএমপিতে। আক্রান্তের এ সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৬শ জন। যেহেতু কোভিড-১৯ ভাইরাসটি মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় সেজন্য লোক চলাচল বাড়লে পুলিশের সংক্রমণের ঝুঁকিটা স্বাভাবিকভাবে বেড়েই যাবে।

যদিও ডিএমপির কর্মকর্তারা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেই সরকারের এমন পদক্ষেপকে জরুরি হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন, করোনাসুরক্ষার বিষয়টি মেনেই তারা কাজ করবেন। এ বিষয়ে তারা সচেতন রয়েছেন। প্রয়োজনে আরো নতুন কৌশল ও পদক্ষেপ নেয়া হবে। ইতোমধ্যে সুরক্ষিত থাকতে ডিএমপির সদস্যদের করোনা পরীক্ষার আওতায় আনা শুরু হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে চিকিৎসা কেন্দ্র। সুস্থ হওয়ার হারও বাড়ছে। অধিকাংশই পূর্ণ মনবলে আবারো কাজে ফিরেছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া) সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, যদি আজ থেকেই সব খুলে দেয়া হয় তা মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। কেননা, ভাইরাসটি যেভাবে সংক্রমিত হয় লোক চলাচল বাড়লে এ ঝুঁকিটা বহুগুণ বেড়ে যাবে। তিনি আমাদের সীমাবদ্ধতার বিষয় উল্লেখ করে বলেন, বুঝতে হবে প্রয়োজনের অনুপাতে পুলিশ বা চিকিৎসক যা-ই বলেন অনেক কিছুর সংখ্যাই সীমিত।

অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আরো বলেন, পুলিশকে সব সময় অপরাধ নিয়ন্ত্রণেই ব্যস্ত থাকতে হয়। তবে এবার এর পাশাপাশি মহামারীতে মানুষকে ঘরে রাখা, আইন মানানো, লকডাউন ও ত্রাণ কার্যক্রমসহ নানা কর্মকাণ্ড করতে হচ্ছে। স্বাভাবিক অবস্থায় এসব কর্মকাণ্ডে সক্ষমতা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন। কারণ পুলিশ আক্রান্ত হয়ে কোয়ারেন্টাইনে গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঝুঁকিতে পড়বে।

ডা. মোজাহেরুল হক মনে করেন, সরকার যেহেতু দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে কারণে এ সম্মুখ যোদ্ধাদের সুরক্ষার জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা ও তা কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই। তাদের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকেও নিশ্চিত করতে হবে তাদের অধীনস্তরা পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিয়েই সেবা দিচ্ছেন। পুলিশকে শতভাগ পরীক্ষার আওতায় এনে র‌্যাপিড এন্টিজেন/এন্টিবডি টেস্ট করাতে হবে। জনগণকে কঠোরভাবে স্বাস্থবিধি মেনে চলতে ও ঘরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি মিডিয়া সোহেল রানা জানান, এ বাস্তবতায় ক্রাইম ও ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টকে তারা ঢেলে সাজাবেন। এছাড়াও মানুষের চলাচল বেড়ে গেলে বিষয়টি অনেক চ্যালেঞ্জিং হবে। এরপরেও তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে যেন জনগণ ও গণপরিবহন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে। তবে এজন্য নাগরিকদের সহায়তা চায় পুলিশ। এ কাজ পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়।

ডিএমপি

এ ব্যাপারে ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শাহ মিজান শাফিউর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, একটু চ্যালেঞ্জিং হয়তো হবে। তবে করোনা প্রতিরোধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে ডিএমপি সদস্যরা কাজ করছে ও আগামীতেও করবে। আন ওয়ান্টেড বা অথোরাইজড লোক ঢাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না। সরকারের আরো কিছু নির্দেশনা রয়েছে যেসব বিষয়ে আমরা কঠোর হবো।

শাহ মিজান শাফিউর রহমান আরো বলেন, সুরক্ষা ও চিকিৎসার বিষয়ে অনেক সচেতন রয়েছি আমরা। করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করেই ডিএমপির সদস্যরা কাজ করছেন। আক্রান্তদের জন্য চিকিৎসা ও সেবা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আক্রান্ত অধীনস্তদের পাশে বসে কথা বলছেন ও খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। ফলে মনোবল বাড়ছে।

এদিকে, ডিএমপিতে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক পুলিশ সদস্যই সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এছাড়াও ঝুঁকি কমাতে ডিএমপির ৩৪ হাজার সদস্যকেই কোভিড-১৯ পরীক্ষার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। পাঁচ হাজারের মতো পরীক্ষা হয়ে গেছে। এক প্রশ্নের জবাবে শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে নতুন কৌশল গ্রহণ করা হবে।

এনএম