করোনাকে জয় আরো ১৫৩ পুলিশ সদস্যের

আগের সংবাদ

করোনা পজিটিভ শুনেই পালালেন গৃহবধূ!

পরের সংবাদ

বাংলাদেশ তোমাকে পারতেই হবে

অজয় দাশগুপ্ত, সিডনি থেকে

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩১, ২০২০ , ৭:২১ অপরাহ্ণ

গত দুই মাসে আর কখনো একদিনে এত রোগী বাংলাদেশে শনাক্ত হয়নি। এই লেখাটি যখন আলোর মুখ দেখবে ততদিনে সংখ্যার হাল কী হবে ভাবতেও ভয় লাগে। বিষয় কি খুব গোলমেলে কিছু? না বোঝা কঠিন? গোড়াতেই বলি চারদিক থেকে এখন উপদেশের বাহুল্য দেখে আমি এই বিদেশেও ভীত। দেখুন ভালো করে, কোনো বিষয়ে আমরা না চুপ থাকি, না আবেগহীন যুক্তি দিয়ে বিচার করতে জানি। হাজার হাজার ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী যখন জান বাজি রেখে সেবা দিচ্ছেন তখন বক্তা নামের পরিচিতজনরা নেমেছে আত্মপ্রচারে। তাদের উপদেশের ভাষায় জাতি কাহিল। টকশোগুলোও জমজমাট। তারচেয়েও বেশি বিরক্ত হবেন সামাজিক মিডিয়ার কাজকর্ম দেখে। পড়ে মনে হবে কারো কারো কথা না শুনেই আজ করোনা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। মিডিয়াও পারে বৈকি। কয়েকটি চ্যানেলে ভুল উচ্চারণে দাঁতভাঙা বাংলায় আফ্রিকার দেশ মধ্য এশিয়ার শহর বা আমেরিকার খবর জানাবার কায়দায় রীতিমতো জবরদস্তি। যেন এগুলো জানা বিশাল জ্ঞানের প্রমাণ আর না জানলে বাঙালির জান বাঁচবে না। অথচ আসল বিষয়ে খবর নেই। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে আসল বিষয়টা কী?
আসল বিষয় আমাদের জাতির ভালো থাকা। এই যে লাফিয়ে লাফিয়ে সংখ্যা বাড়ছে আমরা সবাই এর কারণ জানি। কারণ নিয়ে নানা কথা বলি কিন্তু নিয়ম মানি না। আজ যেসব সংখ্যা তার পেছনে গার্মেন্টস মালিকসহ জানাজা আয়োজনকারীদের ভ‚মিকা ব্যাপক। কিন্তু শুধু কী তারা? এরপর আমরা যারা আমজনতা বা যাদের আমরা সাধারণ মানুষ বলে থাকি তাদের কী করতে দেখছি? তারা নিজেরা তো মরতে রাজি সঙ্গে আমাদের দেশের চিকিৎসক নার্স স্বাস্থ্যকর্মীসহ পুলিশদেরও মারতে এক পা বাড়িয়ে। যে কারণে বেশকিছু ডাক্তার নার্স এখন ভয়াবহভাবে আক্রান্ত। আর অনেকেই আছেন ঝুঁকির মুখে। এর মানে কী সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছে? এমনিতেই জনবহুল দেশ। মানুষের ওপরে মানুষ। না আছে অত হাসপাতাল না চিকিৎসক। এভাবে চলতে থাকলে তারা যদি বেঁকে বসেন বা উজাড় হয়ে যান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে মানুষ?
একটা কথা স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো। এখন এটা প্রায় বলা যায় আমেরিকা ইউরোপে যে বেগ আর শক্তি নিয়ে করোনা ঢুকেছে আমাদের দেশে সম্ভবত সে তা ধারণ করে না। বা করতে পারেনি। তাই মৃত্যুর হার কম। কিন্তু ভয়টা আরেক জায়গায়। এভাবে সংক্রমণ হতে থাকলে দেশের অর্থনীতি বাণিজ্য জীবন সব কিন্তু অচল হয়ে থাকবে। যত তাড়াতাড়ি মানুষ বুঝবে বা নিয়ম মানবে তত দ্রুত সবকিছু স্বাভাবিক হতে থাকবে। ভুলে গেলে চলবে না যেসব দেশ ইতোমধ্যে লকডাউন শিথিল করেছে তাদের কিন্তু ঝামেলা শেষ হয়ে যায়নি। বরং বাড়ছে আবার। আমাদের এই সিডনিতে এখন আপাতত আস্তে আস্তে খুলে দিলেও সরকার সতর্ক। বলা হয়েছে প্রয়োজনে যে কোনো সময় আবার বন্ধ হতে পারে সবকিছু। বাংলাদেশের মানুষকে এতকিছু বোঝানো গেলে এটুকু কী বোঝানো যায় না? যেসব মানুষ লেখাপড়া জানেন না বা জীবনে এসবের নাম শোনেননি তারাও এখন করোনা লকডাউন, আইসোলেশন এসব বোঝেন, জানেনও। মানুষ বোকা না। জীবন ও জীবনধারণের যে কোনো বিষয় তার প্রাকৃতিক মেধা দিয়েই বুঝতে পারে, পালন করতে শেখে। কিন্তু তাদের বোঝাবে কে?
মৃত রাজনীতি এখনো তার পুরনো তর্কে আওয়ামী বিএনপিতে সীমাবদ্ধ। আমাদের সমাজে সামাজিক সংগঠনগুলো কবেই মরে ভ‚ত হয়ে গেছে। সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো চাপা পড়ে আছে পাপ-পুণ্যের যাঁতাকলে। সবচাইতে শক্তিশালী ধর্মীয় সংগঠনগুলো। কিন্তু তাদের অনেকেই বিশ্বাস করেন না করোনা আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর হতে পারে। তারা জেনেশুনেও প্রচার করেন এটা বিধর্মী বিদেশিদের রোগ। যারা রোগটাকেই মানেন না তারা এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে বিশ্বাস করবেন কেন? ফলে মাঠে আসলে কেউ নেই। নেতারা ঘরে বসে নানা কথা বলেন বটে নিজেরাই বাঁচতে গৃহবন্দি।
কিছু কাজ হতো যদি আমাদের চলমান মিডিয়াগুলো একযোগে একবাক্যে এক কথা বলতে পারত। সেটাও হবে না। এছাড়া মানুষের হাতে হাতে এত মোবাইল কম্পিউটার আর চলমান মিডিয়া যে তারা আর কিছুরই ধার ধারে না। সবমিলিয়ে বাঙালিকে বোঝানো এখন কঠিন। সরকারের আন্তরিকতা কিংবা প্রক্রিয়া নিয়ে তর্কের অবকাশ কম। কিন্তু সমন্বয়হীনতা প্রকট। আজ এক কথা তো কাল এক কথা। আমরা এটা বুঝি সবসময় তারা ঠিকভাবে এখন সবকিছু করতে পারবেন না। এটা তেমন সময়ও না। কিন্তু তারাই যদি একবার বলেন মার্কেট খুলবে আবার বলেন না। গার্মেন্টস খোলা নিয়ে যদি থাকে মতান্তর মানুষ যাবে কোথায়?
আমেরিকা ইউরোপ বা অন্যান্য দেশের দুর্দশায় হাততালি দেয়া বাঙালি মনে রাখে না তাদের মতো পরিস্থিতি হলে আমরা হয়তো এতদিনে অন্য চেহারা ধারণ করতাম। আমাদের সমাজ ও দেশের সবকিছু পাল্টে যেতে পারত। সেই ভয়াবহতা থেকে পাঠ নেয়া জরুরি। এটা বুঝতে হবে এই রোগ সহজে যাবে না। আমাদের দেশ ও জাতির কপালে আরো ভোগান্তি আছে। যেমনটা আছে দুনিয়াজুড়ে। তাই এর প্রধান প্রতিরোধ ভালো থাকা। ভালো রাখা। একটা বিষয় বলা জরুরি মনে করি, প্রায়ই দেখি আতঙ্কের প্রচার। না জেনে না বুঝে লিখে দিচ্ছে আর বাঁচবো না। দোকানপাট খুলে দিচ্ছে রে। আরে ভাই-বোনেরা পৃথিবীর সবদেশে দোকানপাট খুলেছে, খুলছে। তবে তা নিয়মে খোলার আগে আপনি আর বাঁচবো না রে বলে হা-হুতাশ করছেন বটে, খুললে সবার আগে আপনাকেই দেখা যাবে জুতার দোকানে সাইজ মেলাচ্ছেন পায়ের। আর একদল লেখে এসে পড়েছে। আমাদের পাশের গলিতে ঢুকে পড়েছে। আর বাঁচার রাস্তা নেই। কথাটা কোথায় বলছে বা কখন লিখছে জানেন? বাইরে থেকে সরেজমিনে ভিড় দেখার নামে বাজার করে এসে কাপড়-চোপড় না ছেড়েই বসে গেছে ফেসবুকে বা অন্য কোথাও। এদের এসব বাচালতা বন্ধ করা দরকার। কারণ এমন কঠিন সময়ে পেনিক বা আতঙ্ক ছড়ানো অপরাধ। এতে মনোবল নষ্ট হয়, মানুষ আক্রান্ত হয় মানসিক বিষাদে।
কোভিড-১৯ এর সময় মন ভালো শরীর ভালো পরিমিত আহার আর ব্যায়ামের পরামর্শ কি মানছে মানুষ? তাই একটা কথা বলতে চাই আপনি নিজে নিয়ম মানুন। সব ধরনের অন্ধত্বের জানালা বন্ধ করে শরীর ও মনে প্রার্থনা করুন। মানুষকে কিছুদিনের জন্য দূর থেকে ভালোবাসুন। আত্মীয়-পরিজনদের থেকেও নিরাপদ দূরত্বে থাকুন। বাজারহাট বা বাকি কিছু আর কিছুদিন পরে স্বাভাবিকভাবে করতে চান না আরো অনেক সময়ের জন্য বন্ধ চান? এ বিচার আপনার নিজের। সরকারও কিছু করতে পারবে না। সেলফ ডিসিপ্লিন বা আপন শৃঙ্খলাই এখন মহৌষধ।
লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকা সংখ্যা নিজে থেকে কমবে না। আপনি আপনারা আমরা চাইলেই তাকে বাগে রাখতে পারি। যে জাতি প্রাণ দিয়ে দেশ স্বাধীন করতে জানে যার বুকে সবসময় সাহসের তুফান সে কেন এই মহামারি প্রতিরোধে কিছুদিন ঘরে বাইরে সংযত আর নিয়ম মানতে পারবে না। অবশ্যই পারবে এবং পারতে হবে। আপনার জন্য আপনার মা-বাবা ভাই-বোন বা সন্তানের জন্যই পারাটা জরুরি।

অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
[email protected]