করোনায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে ৮৭ শতাংশ

আগের সংবাদ

মাফ চেয়ে পোস্ট, কিছুক্ষণ পরেই সাংবাদিকের মৃত্যু

পরের সংবাদ

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা

স্বপ্ন-সাহসের নির্মম যবনিকা

পাপলু রহমান

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩০, ২০২০ , ২:১৬ পূর্বাহ্ণ

স্বপ্নে ভরপুর ছিল ওদের চোখ। সাহসও ছিল। সবাই তরুণ, দুর্নিবার। উন্নত জীবন আর ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় ওরা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। তবে তাদের ভাগ্য যে দালালদের হাতের মুঠোয় বন্দী ছিল তা বুঝতেই পারেনি।

ভরপুর স্বপ্ন আর আবেগ ওদের সরলতাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। তাইতো দালালদের আপনজন মনে করে তাদের সহায়তায় চলে গিয়েছিল লিবিয়ায়। কেউ তিন ফসলি জমি বিক্রি করে, কেউ বার ভিটেমাটি বিক্রি করে সবকিছু ধরিয়ে দিয়েছিল দালালদের হাতে। যে যেভাবে পেরেছে টাকা সংগ্রহ করে পারি দিয়েছিল লিবিয়ায়।

তবে তাদের স্বপ্ন যে এভাবে নির্মমতার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাবে কে জানতো। যুদ্ধকবলিত দেশ লিবিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় মিজদা শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ অভিবাসীকে খুন করা হয়। মর্মান্তিক সেই ঘটনা একটা ট্র্যাজেডি।

দিন পনের আগে বেনগাজী থেকে মানবপাচারকারীরা ৩৮ জন বাংলাদেশিকে নিয়ে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে কাজের সন্ধানে লিবিয়ার ত্রিপলি শহরে নিয়ে যাচ্ছিল। পথে মিজদাহ শহরে মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশে বাংলাদেশিদের জিম্মি করে সন্ত্রাসীরা। জিম্মি অবস্থায় বাংলাদেশিদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন করা হয়।

একপর্যায়ে অপহৃত বাংলাদেশিরা ভয়ঙ্কর সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে বসে। তারা অপহরণকারী দলের নেতা লিবিয়ানকে হত্যা করে। আর এ ঘটনার ভয়ঙ্কর পরিণতি নেমে আসে তাদের জীবনে। সন্ত্রাসীরা আকস্মিকভাবে বাংলাদেশিদের ওপর আক্রমণ চালায়। এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করতে থাকে। এতে ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন।

ঘটনার শিকার মৃত ও নিখোঁজ ২৪ জন হলেন- গোপালগঞ্জের সুজন ও কামরুল, মাদারীপুরের জাকির হোসেন, সৈয়দুল, জুয়েল ও ফিরুজ, রাজৈরের বিদ্যানন্দীর জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাটের আসাদুল, আয়নাল মোল্লা (মৃত) ও মনির, ইশবপুরের সজীব ও শাহীন, দুধখালীর শামীম; ঢাকার আরফান (মৃত); টাঙ্গাইলের মহেশপুরের বিনোদপুরের নারায়ণপুরের লাল চান্দ; কিশোরগঞ্জের ভৈরবের রাজন, শাকিল, সাকিব ও সোহাগ, রসুলপুরের আকাশ ও মো. আলী, হোসেনপুরের রহিম (মৃত) এবং যশোরের রাকিবুল।

নিহতদের মধ্যে রাকিবুল যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার খাটবাড়িয়া গ্রামের রাকিবুল (২০)। দালালের মাধ্যমে তিনি লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। কিন্তু দালাল চক্র লিবিয়ার একটি শহরে তাঁকে আটকে রেখে নির্যাতন শুরু করে। পরিবারের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। পরিবারের লোকজন টাকা দিতে রাজিও হন। এরই মধ্যে খবর এল দালাল চক্র রাকিবুলকে গুলি করে হত্যা করেছে।

রাকিবুল যশোর সরকারি সিটি কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। রাকিবুলের চাচাতো ভাই লিবিয়াপ্রবাসী। ওই ভাই লিবিয়ায় থাকা এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় নিয়ে যান। চার মাস আগে সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ করে রাকিবুলকে লিবিয়ায় পাঠান পরিবারের লোকজন।

রাকিবুলের বড় ভাই সোহেল রানা জানান, ভাইয়ের মুক্তির জন্য ওই টাকা দিতে রাজিও হয়েছিলেন। আগামী ১ জুন পর্যন্ত তাঁদের কাছ থেকে সময় নিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যে কী হয়ে গেল কিছুই বুঝতে পারলেন না।

এই গল্পটা রাকিবুলের একার নয়। দালালদের হাত ধরে লিবিয়া গিয়ে নির্মম পরিণতির শিকার হওয়া সবারই। লিবিয়ায় হত্যা ও নিখোঁজ হওয়া হতভাগ্য বাংলাদেশিদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ১৬ জন মাদারীপুরের তরুণরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বেসরকারি সূত্র থেকে সংগৃহীত তালিকায় এ তথ্য পাওয়া গেছে।

তালিকায় থাকা মাদারীপুরের বাসিন্দ হলেন- রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের রহিম, বিদ্যানন্দী গ্রামের জুয়েল ও মানিক, টেকেরহাট এলাকার আসাদুল, আয়নাল ও মনির, ইশিবপুর ইউনিয়নের সজীব ও শাহিন, সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের শামীম। শুধু জেলা মাদারীপুর লেখা তালিকায় রয়েছে জুয়েল, সৈয়দুল ও ফিরুজ। তবে এদের মধ্যে কে মারা গেছেন আর কে জীবিত বা নিখোঁজ আছেন তা নিশ্চিত করে জানা যায়নি।

এছাড়া আহতদের তালিকায় রয়েছেন সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নের ত্রিভাগদি গ্রামের খালেক বেপারির ছেলে ফিরোজ বেপারি, রাজৈর উপজেলার কদমবাড়ি ইউনিয়নের কদমবাড়ির মোক্তার আলী শিকদারের ছেলে মোহাম্মদ আলী শিকদার ও ইশিবপুর ইউনিয়নের খলিল খালাসীর ছেলে সম্রাট খালাসী।

এদিকে নিহত, নিখোঁজ ও আহতের তালিকায় থাকা রাজৈর উপজেলার ইশিবপুর ইউনিয়নের সজীব, শাহিনের বাড়িতে এখন চলেছে শোকের মাতম।

এনএম