চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি করোনা আক্রান্ত

আগের সংবাদ

বার্সার ফাতিকে চায় জুভেন্টাস

পরের সংবাদ

বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস

করোনা ভাইরাস ও তামাকপণ্য জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি প্রসঙ্গে

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

প্রকাশিত হয়েছে: মে ৩০, ২০২০ , ১০:১৪ অপরাহ্ণ

প্রতি বছর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ৩১ মে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস পালনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ওই দিন থেকে তামাক বা ধূমপান ছেড়ে দিয়ে তামাকমুক্ত হওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া। সেই সঙ্গে তামাক ও ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যের ক্ষতি ও দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় : Protecting youth from industry manipulation and preventing them from tobacco and nicotine use. যার বাংলা ‘তামাক কোম্পানির কূটচাল রুখে দাও তামাক ও নিকোটিন থেকে তরুণদের বাঁচাও’।
তামাক এখন একটি মহামারি, প্রতিদিন ৮০ হাজার থেকে ১০ লাখ তরুণ যুব-সমাজ সিগারেটে আসক্ত হয় এবং এদের ৩ জনের মধ্যে ১ জনের ধূমপানজনিত রোগে মৃত্যু হয় (WHO)। তামাকের কারণে বিশ্বে এই মৃত্যুহার, এইচআইভি (এইডস), টিবি, প্রসূতিমৃত্যু, যানবাহন দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নরহত্যা ও ওষুধজনিত মৃত্যুর সর্বমোট সংখ্যার চেয়ে বেশি। সাম্প্রতিককালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি এ পর্যন্ত আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ৬৮ শতাংশ এবং নারী ৩২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তদের বয়সসীমা ২১ থেকে ৩০ বছর। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে করোনা আক্রান্ত সংখ্যাই বেশি এবং এর কারণ ধূমপান কিনা তা গবেষণা করা এখন জরুরি। বর্তমানে মহামারিকালীনও তামাক কোম্পানিগুলো নানা কৌশলে ক্ষতিকর তামাকের ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তামাকের কার্যকর নিয়ন্ত্রণকে ব্যাহত করেছে তামাক কোম্পানির বেপরোয়া মনোভাব, তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা। তামাক কোম্পানিগুলো করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়কালে বিশেষ অনুমতি সংগ্রহ করে উৎপাদন চালু রেখেছে এবং নিজেদের কর্মচারী এবং তামাক শ্রমিকদের মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
করোনা ভাইরাস ও তামাকপণ্য জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি : চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু কিছু মানুষের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। এর ফলে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অর্গান বিপর্যয়ের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। যেসব ব্যক্তির কো-মর্বিডিটি অর্থাৎ অন্য কোনো অসুখ রয়েছে, সেসব ব্যক্তির করোনা ভাইরাস সংক্রমণ বেশি হতে পারে এবং এসব ব্যক্তি আক্রান্ত হলে তার মৃত্যুর সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাদের মধ্যে ধূমপায়ী ব্যক্তিরা অন্যতম।
করোনা ভাইরাস সৃষ্ট রোগ কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ব্যবস্থার অন্যতম অঙ্গ হলো শ্বাসতন্ত্র। আমাদের শরীরের ফুসফুস শ্বাসের সঙ্গে যেসব দূষিত পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে তা শরীর বাইরে বের করে দিয়ে ফুসফুসকে সচল রাখার চেষ্টা করে। এর ফলে আমাদের শরীর সুস্থ থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবে ফুসফুসের কর্মক্ষমতা কমে গেলে ফুসফুসের কাজে ব্যাঘাত ঘটে। আর করোনা ভাইরাসের প্রধান লক্ষ্যই হলো ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্রকে অকার্যকর করে দেয়া। কাজেই যে কোনো মূল্যে প্রত্যেক ব্যক্তির এই করোনাকালে লক্ষ্য হওয়া উচিত শ্বাসতন্ত্রকে সুস্থ রাখা।
প্রতি বছর তামাক ব্যবহারের ফলে বিশ্বে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। এছাড়া পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে আরো প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যার বড় একটি অংশ শিশু। বাংলাদেশে অকাল মৃত্যু ঘটানোর ক্ষেত্রে তামাকের অবস্থান পঞ্চম। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতি বছর তামাকের কারণে মারা যাবে ১ কোটি মানুষ। এই আয়ের দেশগুলোতে অর্থাৎ ৭০ লাখই অকাল মৃত্যু হবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে। এই মৃত্যুর বড় অংশই হবে ফুসফুস ক্যান্সার, সিওপিডি এবং যক্ষার মতো ব্যাধির দ্বারা। নারীদের মধ্যে এই হার ২৫.২ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ। দেশে তামাকের এই ভয়াবহতা প্রতিরোধে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয় এবং ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে আরো যুগোপযোগী করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা পাস করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও তামাক কোম্পানির কৌশল ধূমপায়ী বা তামাকসেবীদের করোনা আক্রান্তের ঝুঁকি অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তামাক কোম্পানির প্রচারণা ও করোনা আবহে ধূমপান নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা সোশ্যাল মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছে। পালমনোলজিস্টরা পরিমিত ধূমপান নয়, ধূমপান ত্যাগের পরামর্শই দিচ্ছেন। ধূমপান ত্যাগ করলে ধীরে ধীরে শ্বাসতন্ত্র বা রেসপিরেটরি কার্যক্ষমতার উন্নয়ন ঘটবে এবং করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করা সহজ হবে। বাংলাদেশ সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের সংশোধনী পাস এবং ২০১৫ সালে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা জারি করেছেন; ২০১৪ সালে (২০১৪-১৫ অর্থবছর) বাংলাদেশে উৎপাদিত ও আমদানিকৃত সব তামাকজাত দ্রব্যের ওপর ১ শতাংশ হারে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ আরোপ করা হয়, যা বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে।
সরকার এসডিজি অর্জনে অঙ্গীকারাবদ্ধ এবং এসডিজি অর্জনকে গুরুত্ব দিয়ে সরকারের ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তামাক নিয়ন্ত্রণকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, ২০১৬ সালের ৩১ জানুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ান স্পিকার্স সামিটে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে তামাক নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ থেকে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে ৫০ শতাংশ স্থানে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা মুদ্রণ করা হচ্ছে। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ব্যবস্থাপনা নীতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ, ৩০০ টাকা জরিমানা, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ। এভাবে এগোতে থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে তামাকের ব্যবহার ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে আশা করা যায়, প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করা সম্ভব। বর্তমান বিশ্বে, বিজ্ঞান প্রমাণিত উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ হচ্ছে তামাক ও সিগারেট। একটি সিগারেটে তামাক রয়েছে প্রায় ৭ হাজার ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এবং গ্যাস। যার মধ্যে ৭০টি পদার্থ ক্যান্সার বৃদ্ধির কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সিগারেট বা তামাক থেকে ২৫টি রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই অল্প বয়সের শিশুদের জীবনের শুরুতেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন।

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী : চিকিৎসক ও কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস।

ডিসি