এবার ঢাকামুখী জনস্রোত

আগের সংবাদ
সৃজিত-মিথিলা

ও খেতে শুরু করলে থামতেই চায় না

পরের সংবাদ

করোনা ভাইরাসের থাবা

বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম, সর্বত্র উৎকণ্ঠা

সমরেশ বৈদ্য ও প্রীতম দাশ, চট্টগ্রাম অফিস

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৯, ২০২০ , ১:০৯ অপরাহ্ণ

দেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা এখন চট্টগ্রাম। প্রতিদিনই চট্টগ্রামে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। কিন্তু যে চট্টগ্রাম দিয়েই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ৮০ ভাগ সম্পন্ন হয় এবং বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় হচ্ছে সেই চট্টগ্রামের সর্বস্তরের নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবাই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। বারবার নানা প্রতিশ্রুতি ও উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি আজ পর্যন্ত। ফলে এই করোনা আক্রমণে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে তা নিয়ে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
এমনকি চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে করোনা রোগীদের শনাক্ত করার যে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআইটিআইডি (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইনফেকশাস ডিজিজেস)’র ল্যাব প্রধান ডা. শাকিল আহমদও করোনা আক্রান্ত হয়ে হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন। এমনই হচ্ছে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি। সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে অবাধ বিচরণ, চট্টগ্রামের প্রবেশ পথে অনিয়ন্ত্রিত যান চলাচল ও গার্মেন্টস-শিল্প কারখানা খোলা থাকায় চট্টগ্রামে করোনা ভাইরাসের বিস্তার দ্রুত ঘটছে বলে মন্তব্য করেছেন খোদ সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। ‘কমিউনিটি ট্রান্সমিশন’র কারণে করোনা সংক্রমণে চট্টগ্রাম ‘হটস্পট’ হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত চট্টগ্রামে শনাক্ত হওয়া করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২০০ জনে। অথচ গত ৩ এপ্রিল চট্টগ্রামে প্রথম করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় করোনা পজেটিভের সংখ্যা যেখানে ৭০ জন ছিল। এরপর গত ৩ মে (রাত পর্যন্ত) চট্টগ্রামে মোট করোনা পজেটিভ শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১ জনে। কিন্তু তারপরই তা অত্যন্ত দ্রæতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। গত ২৪ দিনে চট্টগ্রামে আরো করোনা আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন ২ হাজার ১১৯ জন।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বী ভোরের কাগজকে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় এ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ২০০ জন। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম শহরেই সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৪১ জন। যা মোট রোগীর প্রায় ৮০ শতাংশ। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১৯৭ জন। মারা গেছেন ৬৫ জন। আইসোলেশনে আছেন ২২৫ জন রোগী। এছাড়া হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন ৩২৭ জন।
চট্টগ্রাম জেলায় মোট আক্রান্ত ও মারা যাওয়া ব্যক্তির সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, সঙ্গে বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে যুবক ও মধ্য বয়সীরাই (৩১ বছর থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যে) সবচেয়ে বেশি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। যা আক্রান্তের ২৭ শতাংশ, এর পরের অবস্থানে রয়েছে ২১ বছর থেকে ৩০ বছর বয়স যাদের সংখ্যা হচ্ছে ২৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৪১ থেকে ৫০ বয়সীদের আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ শতাংশ, অন্যদিকে ৫১ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সীদের সংখ্যা হচ্ছে ১৪ শতাংশ। ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে রয়েছে ৯ শতাংশ। প্রথমদিকে নগরের প্রবেশমুখ সিটি গেট, আকবর শাহ ও পাহাড়তলী এলাকাকে ঘিরে করোনার বিস্তার ঘটলেও দ্বিতীয় মাসে সংক্রমিত হয়েছেন নগরের প্রায় সব এলাকার মানুষ।
চট্টগ্রামে প্রথমে ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল এন্ড ইনফেকশাস ডিজিজেজ (বিআইটিআইডি) ল্যাবে গত ২৬ মার্চ থেকে করোনা ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। এরপর গত ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি এন্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ^বিদ্যালয় (সিভাসু) ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়। গত ৯ মে থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ল্যাবে করোনা ভাইরাস পরীক্ষা চালু হয়।
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর ভোরের কাগজকে বলেন, চট্টগ্রামে মারাত্মক কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে। আন্তঃজেলা ও নগরের অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল থাকায় চট্টগ্রামে করোনার সংক্রমণ অতিদ্রুত ছড়িয়েছে। এছাড়া মানুষের অবাধ বিচরণ, সামাজিক দূরত্বসহ স্বাস্থ্যবিধি কোনোভাবেই মানা হচ্ছে না। সে কারণে সংক্রমণের হার বাড়ছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম।’ তিনি বলেন, আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানাতে হবে। চট্টগ্রামের সঙ্গে আন্তঃজেলা এবং আন্তঃউপজেলা যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। অহেতুক চলাচল করা যাবে না এবং প্রশাসনকে তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যথায় সংক্রমণ বাড়তেই থাকবে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বী ভোরের কাগজকে বলেন, প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম, ভৌগলিক অবস্থানের কারণে করোনায় চট্টগ্রাম সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। সামাজিক সংক্রমণের কারণে ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। ঢাকার পর চট্টগ্রামও হটস্পট হয়ে উঠেছে। গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন শিল্প কারখানা খুলে দেয়ায় এবং লকডাউন শিথিল হওয়ায় করোনা সংক্রমণ যে বাড়বে তা আমরা আগে থেকেই সতর্কবার্তা দিয়েছিলাম। কিন্তু তা মানা হয়নি। এর থেকে উত্তরণে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করাসহ স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য প্রশাসনের নজরদারিও কঠোরভাবে বাড়াতে হবে।
এদিকে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে রাস্তায় নামছে মানুষ। চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে মনে হয়েছে, সব আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে। প্রথমদিকে নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। সামাজিক দূরত্ব না মানায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছিলেন মোবাইল কোর্ট। মাঝখানে তা শিথিল হয়ে পড়ে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার আবার জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালতকে মাঠে নামতে দেখা গেছে। গতকালই গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক-কর্মচারীদের বহনকারী দুটি বাসে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শ্রমিক-কর্মচারী বহন করার দায়ে বন্দর এলাকার একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
এদিকে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ বছর বয়সী করোনা আক্রান্ত এক নারীর মৃত্যু হয়। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আবদুর রব জানান, করোনা আক্রান্ত হয়ে গত ২০ মে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন ওই নারী। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে রাখা হয়। সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যদিও আগে থেকেই তিনি কিডনি রোগে ভুগছিলেন।

ডিসি