সাংবাদিকতা পুরস্কারে প্রতিবেদন জমার সময় বাড়লো

আগের সংবাদ

সুড়ঙ্গ শেষের আলো

পরের সংবাদ

আম্ফানের ক্ষয়ক্ষতি সত্য না বলার মতোই বেদনাদায়ক

স্বপ্না রেজা

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৮, ২০২০ , ১০:৩৭ অপরাহ্ণ

সত্য না বলা কিংবা আংশিক সত্য বলে পুরো সত্যকে উপস্থাপনে বেশ কার্পণ্য দেখা যায় কোনো কোনো দায়িত্বশীলদের মাঝে। এ নতুন নয়, বহুদিনের চর্চা ও সংস্কৃতি। দৃশ্যমান প্রমাণ বা কারণ ছাড়া কৃতিত্ব নেয়ার এ এক সংক্রামক ব্যাধি বলা যায়। কাজ না করে কাজের কৃতিত্ব নেয়া বা বাহাদুরী করাটা অনেক শ্রেণি-গোষ্ঠীর সহজাত স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। যার জন্য প্রয়োজন সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে মনগড়া কিছু বলে দেয়া। বারবার দায়িত্বশীলদের এ জাতীয় আচরণ জনমনে ক্ষোভ সঞ্চার করে, করেছে। তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়েও বিভ্রান্ত সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত অবস্থা না বলায় তাদের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে গেছে। এই হারিয়ে যাওয়া অবিরত, অব্যাহত। বিশ্বাস হারিয়ে যায়, যাচ্ছে। সত্য না বলা কিংবা সত্য এড়িয়ে যাওয়া কিংবা আংশিক সত্য বলে কোনো কোনো পরিস্থিতিকে বিশেষ করে দুর্যোগ পরিস্থিতিকে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন না করা, যা জাতিকে ফাঁকি দিয়ে অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করে কিনা এবং যা জাতির জন্য অকল্যাণকর হয় কিনা এমন বিষয়গুলো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা জানা নেই। তথ্য উপস্থাপনে সঠিক নির্দেশনা সরকার প্রধানের আছে। তিনি যে কোনো পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা জানতে চান, বুঝতে চান। আমরা জেনেছি তিনি সুপার সাইক্লোন ‘আম্ফান’-এর বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রেখেছেন। মিডিয়ায় একজন মন্ত্রী বললেন আম্ফানের কারণে ১৫ মে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন সম্ভাব্য আক্রান্ত এলাকার সব ধান যেন কাটার ব্যবস্থা করা হয়। বৈশ্বিক মহামারি কোভিড ১৯-এর পরবর্তী ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেশের কৃষি নির্ভরশীলতার বিকল্প কোনো পথ নেই। এই বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী উপলব্ধি করেছেন। সামনে আমাদের জন্য কেমন কঠিন সময় অপেক্ষা করছে তা সহজেই অনুমেয়।
করোনাকালে আম্ফানের আগমন ভয়াবহ এক ক্ষতির সংযোজন। একটি সংবাদনির্ভর টিভি চ্যানেল হেলিকপ্টার থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে দেখাল যে, আম্ফানে কীভাবে উপক‚লীয় জনপদ, নদী ও সাগর একাকার হয়ে গেছে। বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, পানিতে ডুবে যাওয়া ঘরবাড়ি, গাছগাছালি আর কত কী। সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত, সুপার সাইক্লোনে লণ্ডভণ্ড। ঘরবাড়িগুলো সব দুমড়ানো-মুচড়ানো। লাখ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন করোনার ঝুঁকি নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে। অনেকে আছেন বাঁধের ওপর। এমন সংবাদ পরিবেশনের পরপরই একই চ্যানেলে একই সংবাদে বলা হলো অজানা কারণে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীর ভাসানচর এলাকায় গিয়ে বলেন, আম্ফানে একটিও ঘরের কোনো ক্ষতি হয়নি। ধান সব কাটা হয়ে গেছে। দেখা গেল ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী হেলিকপ্টার চড়ে নোয়াখালীর ভাসানচরে নেমে সেই কথা বলছেন। বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা ইত্যাদি অঞ্চলের কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর তার মুখে শোনা গেল না। আমার জানা নেই তারপর কোনো এক সময়ে তিনি ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত কিছু বলেছিলেন কিনা কোথাও। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার মনে হলো, তিনি হয়তো সত্যকে এড়িয়ে গেলেন তাৎক্ষণিকভাবে। মন নামক আজব প্রাণটা আমার বলে উঠল ক্ষয়ক্ষতির কথা বললে সুপার সাইক্লোনের আগে ব্যাপক প্রস্তুতির বিষয়টা দারুণ মার খাবে। কৃতিত্ব হারাবে। ব্যর্থতা জেগে উঠবে। হয়তো সে কারণেই এমন কথার আশ্রয় নেয়া তার। আজব মনে প্রশ্ন জাগল, এটা কী গুজবের আওতায় পড়ে। গুজব সদৃশ কিছু নয় তো? কোটি কোটি চোখ যা দেখে আঁতকে উঠল এক জোড়া চোখ কী দেখে আশ্বস্ত হলো!
নিজের মনকে বিশ্বাস করতে চাইলাম। টিভি রিমোটে প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে সংবাদ দেখলাম। একই সংবাদ চিত্র। ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, ধানখেত, গাছগাছালি, পশুসম্পদ। উপক‚লীয় জনপদ, নদী আর সাগর সব একাকার। পানি আর পানি। বহু বাঁধ ভেঙে গেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ত্রাণ চাইছেন তার এলাকার মানুষের জন্য, সহায়তা চাইছেন। অনেকের কণ্ঠে অভিযোগ, প্রতি বছর ঝড় হয়, নদীভাঙন হয়। ঢেউটিন আর চালের সহায়তা পাই। কিন্তু স্থানীয় সমাধান পাই না। বছর বছর লাখ, কোটি টাকা খরচ হয় বাঁধের জন্য। জনপদ রক্ষা পায় না। দুর্যোগ মোকাবিলার পূর্ব প্রস্তুতির চেয়ে দুর্যোগ-পরবর্তী অবস্থার মোকাবিলার আয়োজন আর তৎপরতা বেশি। তাই ঝড় বা নদীভাঙনের পর বাঁধ নামক বিষয়টা সবার সামনে আলোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পুরনো খাতায় করা অঙ্কটা দেখতে সবাই তৎপর হন, কী যেন করা হয়েছিল, ফলাফল কী ছিল, সঠিক ছিল কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি কথাবার্তা, দোষারোপ। পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, ত্রাণ মন্ত্রণালয় কীভাবে কাজ করে জানা নেই। তাদের কোনো সমন্বয় আছে বলে মনে হয় না। চোখে পড়ে না। বহু বছর ধরে বাঁধ ভেঙে উপক‚লীয় অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয়রা। ক্ষতি হচ্ছে ফসলের, গবাদি পশুর ও সামাজিক স্থাপনার। ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এসব অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস রচিত হয়। যা জলোচ্ছ্বাসে ভিজে থাকে। এত প্রযুক্তি, অত্যাধুনিকতা, জীবনযাপনের সহজীকরণ ভাবনা অথচ উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষার কাজটা কেমন যেন দায়সারা। স্থানীয়রা অনেকে বলেছেন বাঁধ নির্মাণ ও দেখভাল করার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ড, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও আমলারা করে থাকেন। এখানে নাকি জনপ্রতিনিধি বা স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা থাকে না। এ কেমন কথা? জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়রা ছাড়া এলাকার সমস্যা ও সুবিধা কীভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। আমলারা তো রাষ্ট্রের সেবক। তারা জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সহায়তা করতেই কাজ করবেন। পরিশেষে বলব, বাংলাদেশে সাইক্লোন, নদীভাঙন প্রতি বছরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ। নতুন কিছু নয়। উপক‚লবাসীদের জানমাল রক্ষার জন্য দুর্যোগ পূর্ববর্তী অবস্থা থেকে গুরুত্ব সহকারে বিষয়টি নিয়ে কাজ করতে হবে। দুর্যোগ-পরবর্তী অবস্থায় ত্রাণ বিতরণ ও বাঁধ পুনর্নির্মাণের তৎপরতার চেয়েও যা জরুরি।
কেন বাঁধ মজবুত, সঠিকভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে না, কেন নিয়মিত তদারকি ও দেখভাল করা হচ্ছে না, আদতে পরিকল্পনা অনুযায়ী বাঁধ নির্মাণ ও তার মনিটরিং করা হচ্ছে কিনা, অর্থ ব্যয়ের চিত্রটাই বা কী, কেন শুধু একটি বিভাগই এসব দেখবে এমন অসংখ্য যৌক্তিক বিষয়াদি স্বচ্ছতার সঙ্গে দেখার বাধ্যবাধকতা থাকা দরকার। দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতা যদি দায়িত্বের মাঝে না থাকে তাহলে দুর্নীতির পথ সহজ হবে, জনগণের কল্যাণ হবে না। জনগণ ভয়ানক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঁধ রক্ষার গাফিলতির কারণে আজ উপক‚ল জনপদের যে ক্ষতি, ফসলের ক্ষতি, মৎস্য সম্পদের ক্ষতি তার দায় অবশ্যই কাউকে নিতে হবে। যেন পরবর্তী সময় কোনোরকম বাঁধ নির্মাণে, নামকাওয়াস্তে বাঁধ দেখভালের কারণে ভয়ানক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আশা করব সরকার অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে বিষয়টি দেখবে। আর দায়িত্বশীলরা পুরো সত্য উপস্থাপন করে সরকার প্রধানের মহৎ উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়নে উদ্যোগী হবেন সেই প্রত্যাশা রইল।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।
[email protected]

ডিসি