বাসায় ভাইবোনেরা, ফোনে নাতি-নাতনিরা

আগের সংবাদ

‘হাঁটু পানিতে ঈদের নামাজ’ ভাইরাল

পরের সংবাদ

কয়রায় পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৫, ২০২০ , ৬:৫৮ অপরাহ্ণ

একজনের হাতে মাইক। অন্যজন মাইকের পাশে দাঁড়িয়ে নামাজের প্রস্তুতি নেন। তিনি হচ্ছেন ইমাম সাহেব। তার পেছনে পানিতে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন শত শত মানুষ। তাও আবার লবণাক্ত জলাভূমিতে। এমন ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। খুলনার কয়রাবাসীর ঈদের নামাজ পড়ার এ রকম ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। কয়রাবাসী দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়েই নামাজ শেষে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ তৈরির কাজে নেমে পড়েন। এভাবেই ঈদের দিন বাঁধ মেরামতের উৎসব পালন করছেন আইলা ও আমফানে ক্ষতবিক্ষত হওয়া কয়রার মানুষ।

ভয়াল ২৫ মে আজ। এ দিনেই ২০০৯ সালে উপকূলীয় অঞ্চল আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়। আইলায় খুলনার উপকূলীয় কয়রার বাঁধ ভেসে যায়। কিন্তু ১১ বছরেও তা নির্মিত হয়নি। এরমধ্যে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে তছনছ হয়ে গেছে সব। এখন কয়রার মানুষ নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ তৈরি করছেন। আইলার আঘাতের সেই দিবসেই এবার পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হচ্ছে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধের ওপর পানির মধ্যে দাঁড়িয়েই কয়রাবাসী ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। নামাজ শেষে তারা আবার বাঁধ মেরামতের কাজে নেমে পড়েন।

কয়রার বাসিন্দা সিরাজুদ্দৌলা লিঙ্কন বলেন, আইলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কয়রায় আসেন এবং এলাকা পরিদর্শন করেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এলাকায় টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করার। তারপর কয়রা এলাকায় বাঁধ নির্মাণে প্রতিবছরই অর্থ বরাদ্দ হয়। কিন্তু এ অর্থ কোথায় কীভাবে ব্যয় হয় তা মনিটরিং করার কেউ ছিল না। ফলে বাঁধ নির্মাণের নামে কথিত ‘জরুরি কাজ’-এর অজুহাতে বাঁধের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাট হয়। এখন যার খেসারত দিচ্ছেন কয়রাবাসী।

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, কয়রার মানুষ বাঁধ মেরামত না করা পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাবে না। বাঁধ আটকাতে না পারলে লোনা পানির মধ্যে বসবাস করা কঠিন হবে। কয়রার মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, বাঁধ চায়। তাই সবাই মিলে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণে মরিয়া হয়ে উঠেছে। উপজেলা প্রশাসন কানাদানার জোগান দিয়ে লোনা পানিতে বিধ্বস্ত মানুষগুলোকে উৎসাহ দিচ্ছে।

মোনাজাতরত বাঁধ নির্মাণ স্বেচ্ছাসেবীরা

দক্ষিণ বেদকাশির বাসিন্দা আবু সাঈদ খান বলেন, আইলায় বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মানুষ বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু আমফানে ঘরবাড়ি, বাঁধ সবই গেছে। তাই মানুষের ন্যূনতম আশ্রয় নেওয়ার অবস্থাও নেই। বাধ্য হয়ে এখন মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে আগে বাঁধ নির্মাণে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাদা জলে নেমে পড়েছেন।

উত্তর বেদকাশি ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ সরদার নুরুল ইসলাম বলেন, আইলার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আন্দোলন ধূলিসাৎ করে দিলো আমফান। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলে এখন কয়রার মানুষকে এত ভোগান্তি পোহাতে হতো না।

কয়রা সদর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, আইলার পর থেকে এ জনপদের মানুষ বেড়িবাঁধ নিয়ে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেছেন। আমফানের আঘাতে সেই যুদ্ধ আবার নতুনভাবে শুরু করতে হলো।

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, কয়রায় এখন পর্যন্ত টেকসই বাঁধ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব কিছু ঠিকাদার দিয়ে করা কাজের মান ছিল নিম্নমানের। ফলে আম্পানের আঘাতে সেসব স্থানই আগে ভেঙেছে আর এলাকা লোনা পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এখানে ভালো ফসল হয়, মাছ চাষ হয়। এখন কয়রার মানুষ বাঁধ চায়। ত্রাণ চায় না। প্রয়োজন টেকসই বাঁধ।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহ বলেন, আইলা বিধ্বস্ত কয়রা এখন আমফানে বিধ্বস্ত হয়ে আরও মুখথুবড়ে পড়েছে। কয়রার ৪টি ইউনিয়নের সমগ্র এলাকা লোনা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কয়রার মানুষ এখন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বাঁধ নির্মাণে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার আঘাতে কয়রার পাউবো বেড়িবাঁধের ২৭টি পয়েন্ট জলোচ্ছ্বাসে ভেঙে লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ২০ মে আম্পানের আঘাতে কয়রার বেড়িবাঁধের ২৪ পয়েন্ট ভেঙে আবারও লোনা পানিতে সয়লাব হয়।

এসআর