মুশফিকের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ১৫তম বার্ষিকী মঙ্গলবার

আগের সংবাদ

'ফেভিকল সে' গানের শুটিংএ যা করেছিলেন কারিনা

পরের সংবাদ

করোনায় ঘরে থাকা ও ইম্যুনিটি দর্শনের যৌক্তিকতা

আসাদুল হক খোকন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৪, ২০২০ , ১১:৩১ অপরাহ্ণ

সরকার করোনা নিয়ে যত নমনীয় হচ্ছে জনসাধারণ তত বেশি অবাধ স্বাধীনতায় গা ভাসাচ্ছে। এবং তত বেশি সংক্রমণের হার বাড়াছে। বাড়ছে মৃত্যুও। শুরুর দিকে বা মাঝামাঝি সময়ে যে সকল বিশেষজ্ঞ করোনাকে সাধারণ রোগের মতো বলে মিডিয়াতে মত দিয়েছেন, বলেছেন- এটি এমনিতেই সেরে যায় এই সময়ে তারাও তাদের মত বদলেছেন। বলছেন- মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে পুরো দেশ। এমনকি আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীও হুঁশিয়ার করছেন এই বলে যে, করোনা পরিস্থিতি এখন পিক আওয়ারে রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে, ঘরে না থাকলে অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে।

পরিস্থিতি সে দিকেই যাচ্ছে ক্রমশ। শনিবার (২৪ মে) পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে, দেশে করোনাভাইরাসের প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ার আড়াই মাসের মাথায় একদিনে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। ঈদের আগের দিন সর্বোচ্চ এই মৃত্যুর খবর এলো। একদিনে ২৮ জনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নতুন করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৮০ জন। ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৫৩২ জনের মধ্যে নতুন করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ায় দেশে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৩ হাজার ৬১০ জন।

সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়েছেন ৪১৫ জন। সব মিলয়ে এ পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৯০১ জন সুস্থ হয়ে উঠলেন।

স্বাস্থ্যবিধি না মেনে চললে, ঘরে না থাকলে যে অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে আড়াই মাস পরে করোনার বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে যার সাধারণ ধারণা আছে তিনি সহজেই এ অনুমান করতে পারেন।

আগেও বলেছি, প্রায় সব মানুষের মধ্যে করোনা নিয়ে এক ধরনের গা-জোয়ারি ভাব আছে। তাদের ধারণা, দেশের সব লোক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও, এমনকি মারা গেলেও তারা মরবেন না। তারা মৃত্যঞ্জয়ী সুধা পান করে রেখেছেন। সুতরাং এমন সাধারণ সর্দি-কাশি জাতীয় ভাইরাসে তারা মরবেন না।

আরেক ধরনের মানুষ মনে করেন, তারা বছরের পর বছর লাখ লাখ ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন। ভাইরাসের খনির ভেতর থেকে, মিল-কারখানা চালিয়েছেন, নোংরা পানি পান করেছেন-করছেন, ফরমালিন-কার্বাইডে গোসল করানো ফল-সবজি-মাছ-মাংস খেয়ে হজম করে ফেলেছেন। করোনার এই নতুন প্রজাতির ভাইরাস তাদের কাছে নস্যি। করোনা তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।

তাদের পাশ কাটিয়ে অধিক বুদ্ধিমানদের যুক্তি, অন্য আরও ভাইরাসগুলো এক সময় বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। তখন আমাদের দেশে তাদের আগমন নতুন। ধীরে ধীরে সে সকল ভাইরাস আমাদের শরীর বশ মানিয়ে ফেলেছে। অর্থাৎ শরীর সে সকল ভাইরাস প্রতিরোধে যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেছে বা ইম্যুনিটি অর্জন করেছে। ফলে ওই ভাইরাস আমাদের কাছে পরাজিত হয়ে বশ্যতা স্বীকার করেছে। এবং আমাদের অজান্তেই তারা আমাদের দেহঘড়ির সঙ্গেই বসবাস করছে দিব্যি।

সুতরাং, জিংক, ভিটামিন সি, ফল, সবজি ইত্যাদি খেয়ে রাতারাতি শরীরে ইম্যুনিটি বাড়িয়ে ফেললে করোনা আর আমাদের সাথে পেরে উঠবে না। যদ্ধাহত সৈনিকের মতো ‘ফলেন ফো’ হয়ে কানতে কানতে উহানে ফিরে যাবে। এবং এক সময় দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে। করোনাকে তুচ্ছজ্ঞান করে তাদের ইম্যুনিটি দর্শন ঠিক এমনই।

তারা তাদের ইম্যুনিটি দর্শন নিয়ে থাকুন। জানি, তাদের এই দর্শনের যুক্তিতে কেউ কেউ মোহিত হবেন। আবেগ আশ্রিত হয়ে অন্যদের এই বার্তা পৌঁছে দেবেন নিজ দায়িত্বে। তাদের সাথে যোগ হয়ে ফেসবুক গরম করবেন অনেকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- রাতারাতি মাত্র কয়েকদিনে বা দু’এক মাসে সেই সব নো ফল-সবজি-মাছ-মাংস খেয়ে হাজার হাজার দিন ধরে ফরমালিন-কার্বাইড, কাপড়ের রং, বিশাক্ত কেমিক্যাল মেশানো যেমন খুশি তেমন খামু জাতীয় ‘হালাল’ খাবার খেয়ে রাতারাতি শরীরে এক্সট্রা অর্ডিনারি ইম্যুনিটি বাড়িয়ে ফেলবেন? আর তাতেই আপনারা করোনাজয়ী হিসেবে বিশ্বে নিজেদের নাম লেখাবেন? এই দর্শন বিশ্বাসযোগ্য?

ভাবতে শিখুন, রাতারাতি কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয় প্রতিরোধে শরীরে ইম্যুনিটি তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে ইম্যুনিটি তৈরি হয়ে করোনা প্রতিরোধ হবে না। করোনা হঠাৎ আসলেও সে আমাদের সঙ্গে পৃথিবীতে থাকবে আরো বহুকাল। যেমন- ডায়রিয়া চলে যায়নি। তাকে প্রতিহত করার উপায় শিখেছি আমরা। হয়তো করোনাকেও পারবো। তবে সে জন্য যথেষ্ট সময় নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। সে পর্যন্ত করোনা থেকে বাঁচার ‘হাত ধোয়া- মাস্ক পরার’ নিয়ম মেনে চলাই কাজ।

তাহলে মানুষকে ঘরে আটকে রাখাই কি একমাত্র উপায়?

আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলবো- না। স্বাধীন চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে ঘরে আটকে রাখা যাবে কতদিন? তাছাড়া, যাদের ঘর নেই, রাস্তায় ঘুমান, রাস্তার পাশে পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে রাত হলে কোনোমত মাথাগুজে জীবন পার করেন তাদের বেলায় ঘরে থাকার এই নির্দেশ যুক্তিযুক্ত? যারা ১০ ফুট বাই ১২ ফুটের একটি কামড়ায় একসঙ্গে ৪ জন থেকে ৮-১০ জন থাকেন। দিনের পর দিন কী করে তারা ঘর নামক এমন কারাকক্ষে নিজেদের আটকে রাখবেন? এই দীর্ঘ ঘরবন্দী সময় তারা খাবেন কি? তাদের সংসারের আর সব খরচ চলবে কি করে? যারা দিন এন দিন জীবন চালান, তাদের দিনের পর দিন কে দেখবে? সরকারের সিন্দুকেই বা কাতো টাকা মজুদ আছে- যে লাখ লাখ পরিবারকে ৩-৪ মাস চালাতে পারবেন ঘরে বসিয়ে?

এবার আসুন দেখি- ঘরে বন্দী হয়ে থাকাই করোনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় এই ফর্মুলা প্রথম কে দিলো? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রথম নির্দেশনা কি ‘ঘরে থাকুন’ ফর্মুলা ছিল? যতদূর জানা যায়, চীনই প্রথম ঘরে থাকুন ফর্মুলার প্রবর্তক। এবং তা কতোটা কার্যকরী সে বিষয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান ও বিশ্লেষেণের দাবি রাখে।
আসুন চিন্তা করতে শিখি- চীন যদি প্রথমে বলতো, করোনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা মাঠে তাবু টানিয়ে বসবাস করা। তো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কি সেই ফর্মুলাই আমাদের দিতো? তারা যদি বলতো- সব ধরনের যানবাহন পরিত্যাগ করে পায়ে হেঁটে চলাই করোনা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়। তাহলে চীনের সেই দর্শনই কী তাবৎ দুনিয়া অনুসরণ করতো?

এর জবাব কি? করতো। কারণ- চীন প্রথমে বলেছে বলেই সারা দুনিয়া চীনকে অনুসরণ করে ‘ লকডাউন’ বা ঘরবন্দী থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বলতে গেলে এ ক্ষেত্রে মিরাকুলাসলি চীনকেই সারা দুনিয়ার বাঘা বাঘা রাষ্ট্রনায়করাও অনুসরণ করেছে কোনো প্রকার স্থির চিন্তা ও যুক্তি ছাড়াই। ছোট এবং জনবহুল দেশ হিসেবে আমরাও সে পথ অনুসরণ করেছি কোনো প্রকার বিচার বিশ্লেষণ ছাড়াই। এতে আমাদের আর অপরাধ কী?

তবে ঘরবন্দী হয়ে থাকার এই সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিশেষজ্ঞরা আরো ভাবার সময় পেয়েছিলেন। কিন্তু তারা তা ভাবেননি। কি করে এই সিদ্ধান্তকে আমাদের বহুল জনসংখ্যা ও দরিদ্র মানুষদের যাপীত জীবনে কার্যকরী করে তোলা যায়- এটি তারা যোক্তিকভাবে ভাবেননি। এ দায় সরকারে শুধু একার নয়। দায় রাষ্ট্রপরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সকলের। তথাকথিত বুদ্ধিজীবি ও সংস্থাগুলোর, ব্যবসায়ীদের, রাজনীতিবিদদেরও। সেক্ষেত্রে, সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও সে তার দায় এড়াতে পারে না। এবং দিন শেষে, সব ভালো এবং মন্দের দায়ভার তার ঘারেই পরবে। তা সে দায় রাষ্ট্র নিতে ইচ্ছুক হোক বা না হোক।

ঘরবন্দী হলে করোনা থেকে বাঁচার যে পথ তা শুধু তাদের বেলায় প্রযোজ্য যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল, নিজেদের ঘর-বাড়ি আছে বা অন্তত তিনমাস বাসা ভাড়াসহ খরচ বহন করার সামর্থ আছে। দেশে এমন সামর্থবনের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এদের চেয়েও স্বচ্ছল বা মাসে ১০ লাখ টাকা উপার্জন করেন এমন লোকের সংখ্যাও কম নয়। তাছাড়া বড় ব্যবসায়ী বা এক নম্বর সাড়ির ধনীরা যে এই সংকটে তিনমাস তো দূরের কথা কয়েক বছর হাইবারনেশনে থাকলেও কিছু যায় আসে না সে কথা বলাই বাহুল্য। তবে মূল ভাবনাটি এই তিন শ্রেণির বাইরে থাকা মানুষদের নিয়ে।

সেকারণে, অন্য দেশগুলোতে সব মানুষকে ঘরে আটকে রাখা করোনা থেকে বাঁচার উপায় সেখানে আমাদের দেশেও একই উপায় অনুসরণ হতে পারে না। কথায় কথায় করোনা নিয়ে যারা ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইরানের উদাহরণ দেন, তাদের মনে রাখা উচিত আমাদের রাষ্ট্র এ দেশের জনগণকে সেসব দেশের জনগণকে দেয়া সুবিধার কতো ভাগ দেয় বা দেয়ার সামর্থ রাখে। তাদের এটিও ভাবা দরকার, ওই সব দেশের উদাহরণ দেয়া সহজ কিন্তু সেসব দেশের জনগণকে ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক দায়িত্বশীল, জনগণে পরিণত করতে সেসব দেশের রাষ্ট্রপরিচালকদের কতোটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। যেখানে রাস্তায় কেউ একটি কলার খোসা ফেলতে সাহস করে না, সেখানে আমাদের দেশে রাস্তায় হাগু-মুতু করতেও দ্বিধা করে না এ দেশের জনগণ। সব বাদ দিয়ে শুধুমাত্র চিকিৎসাসেবা অধিকারের প্রশ্ন তুললে- সে ক্ষেত্রে কতোটা সেবা পান আমাদের জনগণ তা কাউকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে না নিশ্চয়।

অন্যদিকে, করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি কার্যকারিতা দেখিয়েছে রেমডেসিভির। সে হিসেবে বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে সরকার। গিলিয়েডের নিজস্ব পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ওষুধ ব্যবহারে রোগীদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। মানুষের শিরায় ইনজেকশন হিসেবে এই ওষুধ প্রয়োগ করতে হয়। রোগের তীব্রতার ওপর এর ডোজ নির্ভর করে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য ৫ অথবা ১০ দিনের ডোজ প্রয়োজন হতে পারে। তবে এতে কতো ভাগ রোগি সুস্থ হন তা বলা হয়নি। এখানেও একটি শুভঙ্করের ফাঁকি ধারণা করা যায়।

করোনা থেকে বাঁচার মূল স্লোগান হওয়া উচিত ছিল- ‘আক্রান্তদের ঘরে রাখুন, তাদের থেকে অন্যদের দূরে রাখুন’। তো সে স্লোগানের পরিবর্তে যার আক্রান্ত নন তাদের সবাইকে ঘরবন্দী রাখছেন কেন? চীন বলেছে বলে? কারণ চীনেই প্রথম করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে বলে? এখনো সময় আছে- বিকল্প ভাবুন।

আর দশজনের মতো আমার কথা হলো- আমি জীবনকে দারুন ভালোবাসি। বাঁচতে চাই। এবং সহসা এই সুন্দর দেশ থেকে অন্তত মরে যেতে চাই না। সেকারণে, যতটা সম্ভব নিজে নিরাপদে থাকতে চাই। চাই আমার প্রিয়জনেরা, আমার পরিচিতরা এবংযাদের সঙ্গে কোনোদিন দেখা হয়নি, যারা আমাকে পছন্দ করেন না এমনকি আমিও যাদের পছন্দ করি না, যাদের সঙ্গে আমার মতের- আদর্শের অমিল হয়, যারা আমাকে শত্রুজ্ঞান করেন- আমি চাই তারাও এই মরণব্যাধী করোনা থেকে নিরাপদ থাকুন। নিরাপদে থাকুন প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ।

 

লেখক: আসাদুল হক খোকন, সাংবাদিক

পিআর