করোনাক্রান্তি ও পিঁয়াজের ঝাঁঝ

আগের সংবাদ

ঘূর্ণিঝড়ে নিঃস্ব সবজিচাষীরা চান সহায়তা

পরের সংবাদ

সোসাল ডিসটেন্স

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৪:৪৮ অপরাহ্ণ

খুবই শান্ত মেয়ে খেলনা; বাবা মা’র এক মাত্র সন্তান। ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন ছাড়াই বড় হয়েছে। একা থাকতে সে অভ্যস্ত। মা কলেজে ক্লাস নিতে যান, বাবাও অফিসে। ফলে একা থাকতে তার খারাপ লাগে না। বই পড়ে, গান শোনে, ক্লাসিক ছবি দেখে। তবে সহপাঠিদের কথা ভিন্ন। তাদের আড্ডাও খেলনার ভালো লাগে। তবে সে আড্ডাবাজ নয়।
অনার্স শেষ করার পর সে ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হয়ে ভার্সিটি অফ এডমন্টনে ভর্তি হয়ে কানাডায় চলে আসে। মাস্টার্স করছে। আসার আগে বাবা রাজি ছিল না। একমাত্র মেয়েকে একা বিদেশে পাঠাবে না। কিন্তু মার এ ক্ষেত্রে ভাবনা ভিন্ন। হয়তো শিক্ষকতা করেন বলেই উচ্চ শিক্ষার প্রতি তার আগ্রহ বেশি। মেয়ের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চান।
খেলনার সাবজেট এনভারমেন্ট এন্ড এন্থোপলজি। দুটোর সাথেই প্রকৃতির নিবিড় সম্পর্ক। দুটোই একেবারে মাটির সাথে মিশে থাকা সাবজেট। রুমমেড শেওলা অবশ্য পড়ছে কম্পিউটার সাইন্সে। সে খুব মুড়ি। বড় লোকের মেয়ে। বয় ফ্রেন্ডের জন্য মন খারাপ। তাই সাত দিনের জন্য ঢাকা গিয়ে আটকা পড়েছে।
মেইড ইন চায়নার কোভিড-১৯ এখন চিন ছাড়িয়েবিশে ছড়িয়ে পড়েছে সারাবিশ্বে। বিশ্ব জুড়ে লকডাউন। খেলনার জন্য বাবা উদ্বিগ্ন। একটু পর পর মায়ের ফোন। ফোনের ভেতর দিয়ে মা-বাবার ঝগড়া শোনতে পায়।
-তোমাকে বলেছিলাম, একা মেয়েটাকে দেশের বাইরে পাঠিও না। আমার কথা শুনলে না।
-করোনা এভাবে বিশ্ব গ্রাস করবে, তা কি জানতাম?
-দেশে কি লেখাপড়ার সুযোগ নেই। আমরা কি এখানে পড়াশোনা করিনি? উন্নত দেশের উচ্চ শিক্ষা।
-আমি মেয়ের ভালোর জন্যই করেছি। তুমি তো আছো তোমার চাকরি নিয়ে।
-এখন বুঝো। এখন মেয়েটা বিদেশে একা পড়ে আছে।
খেলনা ফোনটা মায়ের কাছ থেকে নিয়ে বাবাকে টেনশন মুক্ত করতে চায়। বাবাকে বলে, তোমরা চিন্তা করছো আমাকে নিয়ে। আর আমরা চিন্তা করছি তোমাদের নিয়ে। এখানে উন্নত চিকিৎসা আছে।
বাবা চিন্তিত কণ্ঠে বলে, তুই তো ওদেশের কেউ না।
একটা হেসে চায়না বলে- বাবা, এটা কানাডা। এখানে কানাডিয়ান এবং নন-কানাডিয়ানকে আলাদা ভাবে দেখা হয়না। এখানে মানুষ হিসেবে দেখা হয়। মানবিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

লকডাউনে থাকা চায়নার খবরাখবর নিচ্ছে ভার্সিটি থেকে, প্রবাসী বাংলাদেশিরা এবং প্রতিবেশিরাও। চায়না অবাক হয়, এই দুর্দিনেও মানুষ ঠিকই মানুষের জন্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফোন আসছে। মেইলে, মেসেঞ্জারে ম্যাসেজ আসছে। দরজার সামনে ড্রাই ফুড, মাস্ক, গ্লাভস, লিকুইট! টিভিতে, অনলাইনে দেখা যাচ্ছে- ইতালি, তুরস্ক, জার্মানি এবং বাংলাদেশেও মানুষ দুর্গতদের জন্য বাইরে খাবার এবং অন্যান্য ত্রাণের প্যাকেট রেখে যাচ্ছে। যার দরকার নিয়ে আসছে। নিজের দরজার সামনে এসব দেখে সে আশাবাদী হইয়ে ওঠে!
চায়না আর শ্যাওলা এক রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে থাকে। এখন সে বাসায় একা। হঠাৎ সুবোধের ফোন, কেমন আছো চায়না?
-ভালো। তুমি এখন কোথায়, কি অবস্থা?
-ডরমে আছি। প্রায় সবাই চলে গেছে। আমি একা পড়ে আছি।
-ভয় পাচ্ছো?
-ঠিক ভয় না; ভেতরে ভেতরে প্যানিক হচ্ছে।
-আমিও তো একা।
-কেনো? শ্যাওলা কোথায়?
-শ্যাওলা তো দেশে।
-তাহলে তোমার কাছে চলে আসি?
-আসো। আসলে ভালোই হবে। দুজন একা একা থাকা যাবে।
এই পর্যন্তই তাদের কথা হয়। সুবোধ রয় তার সাথে পড়ে। অসম্ভব ভালো ছাত্র এবং ভদ্র ছেলে।
চায়না চা নিয়ে ব্যালকনিতে দাঁড়ায়। কাপে চুমুক দিয়ে দিতে ভাবে- দুমাস আগেও বাইরের মেপল গাছ ভর্তি শাদা বরফে জড়ানো ছিল। এখন নেড়া মাথার মেপল গাছে কচি কচি সবুজ পাতা জেগে উঠছে। রোদের আলোয় পাতাগুলো চিকচিক করছে আর ডালে ডালে লাফালাফি করছে কাঠ বিড়ালি। পাশের পার্ক থেকে একটা হরিণ বাচ্চা নিয়ে নিশ্চিন্তে রাস্তা পাড় হচ্ছে। দুষ্ট হরিণছানার দুষ্টুমি করছে মার সাথে। রাস্তা একেবারেই ফাঁকা। হঠাৎ একটা গাড়ি দ্রুত গতিতে এসে থেমে যায়। আর হরিণের বাচ্চাটা তিরিংবিরিং করে লাফাতে থাকে। এখন মানুষ খাঁচায় বন্দি আর প্রাণীরা বন জঙ্গল থেকে লোকালয়ে বেরিয়ে এসেছে, সেই ছবি সংবাদ শিরোনাম হয়েছে! তার একটি দৃশ্য খেলনার চোখের সামনে। অবশ্য এ দেশটি এমনিতেই পশুপাখিপ্রাণীদের অভয়ারণ্য।
শ্যাওলার ফোন। সেও চায়নাকে ভাবছে। শ্যাওলা বলে, মন্দের ভালো যে বাবা-মার সাথে আছে। কবে আসবে কেউ বলতে পারছে না। এখন তো সারা বিশ্বেই লকডাউন। এয়ার কানাডা কেনো কোনো এয়ার লাইন্সই চলছে না। কবে চলবে তা অজানা।
খেলনাও জানায়, বাড়িওয়ালা এক মাসের নিবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। তার খাওয়া-দাওয়ার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। প্রচুর খাবার। কিন্তু টেনশন এভাবে আর কত দিন?
মার ফোন আসে। মাকে বলে, শ্যাওলা আসার সময় আমার জন্য পিঠা দিও। এবার শীতে পিঠা খাওয়া হননি। এ যেনো পিঠা নয়; মায়ের মমতা।
একটু পর সুবোধের ফোন। কিন্তু ধরতে ইচ্ছে করছে না। রিং বাজতে বাজতে থেমে যায়। আবার রিং।
ফোন ধরতেই সুবোধ সিরিয়াসলি বলে, আমি একা একা অসুস্থ এবং অস্থির হয়ে পড়ছি। সব কিছু এলোমেলো লাগছে। শ্যাওলা নেই। আমি কদিনের জন্য থাকতে চাই।
-তুমি কি বলছো?
-আমিও সিরিয়ালি বলছি, খেলনা।
-এটা তো সিনেমা নয়। বাস্তব।
-এই দুর্যোগকালে করোনাক্রান্ত সময়ে সব সিনেমাকে হার মানিয়ে দিয়েছে। জানো,
করোনা ভাইরাসে ‘কোভিড-১৯’ পরিস্থিতে বিশ্ব এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশ, এক জন থেকে আরেক জনকে স্বেচ্ছায় বাধ্যতামূলক পৃথক করে রেখেছে। আতংকে যেনো জ্বরাক্রান্ত সারা পৃথিবী তিরতির করে কাঁপছে। জরুরি অবস্থা জারি হচ্ছে দেশে-দেশে।
-সেজন্য বিশ্ববাসী গৃহবন্দি। আমি, তুমি, আমরা সবাই কারাগারে। আমাদের আটকিয়ে রেখেছে এক অদৃশ্য ভাইরাস। আমরা পরিবেশের ছাত্র। আমাদের অগ্রজ পরিবেশবিদা, বৈজ্ঞানিকরা কি করেছে? সর্বশক্তিমান মানুষ আজ অসহায়। আজ একটি প্রতিষধক ভাইরাস কেউ আবিষ্কার করতে পারছেন। আমরা যে পৃথিবীর ওপর অবিচার করেছি, তারই প্রতিদানে বিশ্ববন্দি।
-আমার কিছু ভালো লাগছে খেলানা, খেলনা। আমি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। জানো, এই ভাইরাসে বিশ্বখ্যাত অনেক ব্যক্তিও আক্রান্ত হয়েছেন, হচ্ছেন।
-করোনা ভাইরাসের অর্থনৈতিক পরিণতির উদ্বিগ্ন হয় আত্মহত্যা করলেন জার্মানির হেসে প্রদেশের অর্থমন্ত্রী টমাস শাফের আর মারা গেলেন লিবিয়াার বিদ্রোহী সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ জিবরিল, মারা গেলেন চিলির জনপ্রিয় লেখক লুইস সেপুলভেদার এবং আমাদের ড. আনিসুজ্জমান।

সকাল-বিকাল ফোনে কথা বলছে তারা। একে অপরের খোঁজ খবর নিচ্ছে, দিচ্ছেÑ কোথায় কি হচ্ছে। লকডাউনে তারা এখন পরস্পরের প্রতি একটু বাড়তি দরদি হয়ে উঠে। আলোচনা করে বিশ্বে করুণ পরিস্থিতি নিয়ে।
-জানো খেলনা, এ পর্যন্ত মারা গেছে প্রায় সাড়ে তেত্রিশ লাখ মানুষ। এই কানাডাতে মারা গেছে ছয় হাজার। আর সারা বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ কোটি মানুষ!
এক পর্যায়ে খেলনা এবং সুবোধ দুজনেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। খেলনা বলে, তবু সুস্থের পরিমাণও অনেক। প্রায় দুই কোটি। এবং ঘরে বসেও অনেকেই সুস্থ হচ্ছেন।

৫.
করোনা হলে এখন আর কেউ একা নয়; সবাই চারপাশে পাশে আছেন, হাত বাড়িয়ে আছেন। কাজেই কেউ হতাশ হবেন না। কারণ, মানুষের জন্যই মানুষ।

-মানুষের জন্য মানুষ। তাহলে তুমি সাড়া দিচ্ছিনা কেন? কেন পত্রিকার খবরের গল্প শোনাচ্ছো!
-তাহলে কি করবো সুবোধ?
– আমি অসুস্থ হয়ে পড়ছি।
– তোমার কি জ্বর-শর্দি-কাশি-ফ্লু?
-না। শারীরিকভাবে না; মানসিকভাবে।
-তা আমি কি করতে পারি?
-এই খারাপ সময়ে আমরা এক সাথে কি ভালোভাবে থাকতে পারি না?
-তুমি আমার ফ্ল্যাটে আসতে যাচ্ছো। কিন্তু…
-কিসের কিন্তু খেলানা? শ্যাওলা যদি থাকতে পারে তবে সুবোধ কেন নয়?
-কারণ, শ্যাওলা আর সুবোধ এক নয়। ভিন্ন।
-আমরা এক সাথে ভিন্নভাবেই থাকবো।
-তা কি হয়?
-কেন হবে না। কেন আলাদা করে ছেলে মানুষ, মেয়ে মানুষ ভাবো। মানুষ ভাবতে পারোনা?
-তোমার কথায় আংশিক যুক্তি আছে। আচ্ছা, চলে আসো। তবে মনে রেখোÑ সোসাল ডিসটেন্স!
সুবোধ অত্যন্ত সুবোদ বালকের মতো বলে, হ্যাঁ। সোসাল ডিসটেন্স! কোভিড-১৯ আমাদের মধ্যে শব্দটি স্থায়ীভাবে গেঁথে দিয়ে গেল। করোনা আমাদের মধ্যে এই দূরত্ব তৈরি করে দিয়ে গেল। আমরা এখন সোসাল ডিসটেন্সেই থাকবে।
খেলনা বলে, অভিধানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শব্দটি এখন প্রকাশ্যে চলে এলোÑ সোসাল ডিসটেন্স! যা মানুষের মধ্যে দূরত্ব এবং দেয়াল তৈরি করে দিলো। কেউ কারো কাছে যেতে পারছে না!

তখন দুজনেই এক সাথে বলে উঠে : সোসাল ডিসটেন্স!

এসআর