পুলিশে আক্রান্ত কমছে, বাড়ছে সুস্থতার হার

আগের সংবাদ

প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে আক্রান্তের সংখ্যা

পরের সংবাদ

মৃত শহর

নীতুল জান্নাত নীতি

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৪:০০ অপরাহ্ণ

রাতে ইদানীং একদমই ঘুম হয় না। দিনের বেলা আবার পড়ে পড়ে ঘুমাই। রাত একটু বাড়লেই নিস্তব্ধতা আরো বাড়ে নগরীতে। আমি ভুলে যাই, কবে এই নগরী কোলাহলে ঢাকা ছিল। ধোঁয়া ওঠা কফিমগ নিয়ে বারান্দায় বসতেই আবছা আবছা অনেক স্মৃতি জেগে উঠে। কখনো সখনো মেসেঞ্জারের ওই প্রান্ত থেকে ভেসে আসে কারো সুকণ্ঠে প্রিয় গানের সুর। এর বাদে বাকি নিস্তরঙ্গ দিনগুলো কাটে অনুভ‚তিহীন। সামনের বাসার মেয়েটাকেও মাঝেমাঝে বারান্দায় দেখি গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে। অস্থির দুটো চোখে কাউকে খোঁজার প্রতিচ্ছবি আমার চোখ এড়ায় না। তারপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আবির্ভাব হয় ছেলেটির। নিয়ম ভেঙে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে বারান্দার নিচে। মেয়েটি মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে নিচুস্বরে,
‘নীল, তুমি কি রাতে খেয়েছো?’
ছেলেটি মাথা নাড়ে। তারপর পাল্টা জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি খেয়েছো রানু?’
মেয়েটিও হেসে মাথা নাড়ে। তারপর নিস্তব্ধতা। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। এখান থেকে ওদের দেখা গেলেও ওখান থেকে আমাকে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তাই আমার ঠোঁটের কোণে হাসি খেলে গেলেও তারা দেখতে পায় না। রানু নামের মেয়েটি আবারো প্রশ্ন করে কাতরস্বরে,
‘নীল, তুমি কেমন আছো?’
ছেলেটি উত্তর দেয় নিচুস্বরে, ‘ভালো।’
তারপর আলগোছে একটি শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ রেখে যায় মেইন গেটের কাছে। ক্লান্ত পায়ে ফিরে যায় সেই পথ ধরে। মেয়েটাকে তখন কাঁদতে দেখা যায়। আমি অনুভব করি, তার ইচ্ছে করে নীল নামক ছেলেটির বুকে মাথা রেখে কাঁদতে। কাঁদুক মেয়েটি। আস্তে করে উঠে রুমে চলে আসি আমি। অবহেলায় কফির মগটি বারান্দাতেই পড়ে থাকে।

২.
ঘুম ভেঙে বারান্দাতে আসতেই একটি মুখ চোখ পড়ে। একটি ছয় বছরের মেয়ে। নাম আনিকা। আমাদের আবাসিক এলাকা পেরিয়ে মেইন গেট থেকে খানিকটা দূরেই একটা বস্তিতে বাস ওদের। এখানে রোজ প্লাস্টিকের বোতল, কাপ কুড়োতে আসে। দেখা হলেই একগাল হেসে বলে,
‘আপুওওওওওও! আমার ইস্কুল বন্ধ।’
-‘খুব আনন্দ, তাই না রে?’
-‘হ আপু! কিন্তু বোতল কেউ কিনে না আগের মতো।’
-‘কীভাবে কিনবে? লকডাউন চলছে, জানিস না।’
-‘লকডাউন চিনি না আপু। খিদা লাগে শুধু।’
অদ্ভুত রকম কষ্ট হয় তখন। এখানে যখন শুয়ে বসে ক্লান্ত, লকডাউনে অস্থির আমরা, তখন অন্যদিকে লকডাউন নাম না জানার অজ্ঞতার আড়ালে খিদের কষ্ট ধুকে ধুকে জ্বলে। আনিকাকে ডেকে এক সপ্তাহের চাল-ডাল পাঠিয়ে দেই বাসার কাজের মেয়ে রিনাকে দিয়ে। মেয়েটি ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে সদ্য শেখা দুইয়ের নামতা আওড়াতে আওড়াতে চলে যায়।
কোথাও যেন পড়েছিলাম, একই পৃথিবীতে সমান পরিস্থিতিতেও ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধরা পড়বেই। এটাই নিয়ম। নয়তো ছেলেটি কোনো এক নিশুতি রাতে এসে একজন কাঁদতে থাকা প্রেমিকার দুয়ারে একটি শুকনো গোলাপ রেখে যেত না।

৩.
এলাকার মসজিদটায় মিটিং বসেছে যুবলীগ নেতাসহ কিছু ছাত্রলীগ নেতার। আলোচনার বিষয় একটাই, সরকার থেকে ত্রাণ এসেছে। এই ত্রাণ বাটোয়ারা নিয়ে। সাহেদ হচ্ছে যুবলীগ নেতা। সে তার আন্ডারে থাকা এক পাতিনেতাকে জিজ্ঞেস করলো,
‘সোহেল! বল এবার ত্রাণগুলা কি করা যায়?’
সোহেল মাথা নিচু করে হাত কচলাতে কচলাতে মুখে তেলতেলা হাসি বজায় রেখে বলল,
‘আপনে যা ভালো বুজেন।’
সাহেদ তখন সোহেলের তেলতেলা হাসির সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
‘হে হে হে, ভালোই বুচ্ছোস ব্যাটা। তা আমি কই কি, এগুলারে চাল ডাল না দিয়া আমরাই যদি খিচুড়ি রাইন্দা ওগো খাওয়াই দুইবেলা, তাইলে মন্দ কি! গরিবরে তো বিশ্বাস নাই আবার। দেখা গেল আমরা ত্রাণ দিলাম, আর ওরা বেইচা দিল টাকার লোভে। আমি তো আর তা হইতে দিতে পারি না। নীতিবোধ বইলা একটা ব্যাপার আছে না? সকলের ভালোমন্দ আমারেই বুঝা লাগে।’
সোহেলের তেলতেলা হাসি আরো বেড়ে গেল। বাকিরাও সমস্বরে সুর মেলালো যুবলীগ নেতার কথায়। মিটিং ওইদিনের মতোই শেষ। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বেরিয়ে পড়ল সাহেদ। আর ওদিকে সোহেল এটা ভেবে আনন্দিত যে অবশেষে নেতা নামক বড়ভাইটির সুনজরে পড়লো বলে।
যথারীতি সোশ্যাল ডিসট্যান্সের রীতিনীতি শিকেয় তুলে বেশ জমজমাট করেই খিচুড়ি রান্না করলো মেইন গেটের ওপারে। নিজেদের পেটপুজো শেষে হয়তো গরিবদেরও খাইয়েছিলো একটু-আধটু। আনিকা দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরেই, একটা ভাঙা স্টিলের প্লেট হাতে। তার ছোট্ট হৃদয়ও বুঝে গেছিলো সমাজের উঁচু স্তরে কোনো মানুষরূপী হায়েনারা প্রতিনিয়ত বাস করে।
প্রতিদিন এলাকার অভুক্ত কুকুর-বিড়ালগুলোকে খাওয়ানোর জন্য বের হই আমি। আজো বের হওয়ার সময় আনিকার হাতে চাল-ডালের আরো একটা পুটুলি ধরিয়ে দিতেই মেয়েটা গালে টোল ফেলে হেসে বলে ফেললো,
‘তুমি ওগো মতো না। তুমি ভালো।’
অল্পতেই কত খুশি এরা। আহা! ভালো থাকুক এই ছোট্ট হাসিগুলো।

দিনশেষে সব সার্কাসই থেমে যায় তারপর। রাত বাড়ে। গতিবিধি পরিবর্তন করতে থাকা শুকতারাটির দিকে চোখ রেখে এই মৃত শহরের গল্প লিখি, কান্না শুনি। কুকুরের কান্না, বেড়ালের কান্না, রানুর কান্না, আনিকার ঘুমন্ত শরীরে হাত রেখে তার মায়ের নীরব কান্না। অথচ আমি জানি, এই শহরে আবারো প্রাণ আসবে একদিন। রানু নামক মেয়েটি লাল শাড়িতে বধূবেশে নীলের হাত ধরবে।

৪.
আজ রাতে নীল নামক ছেলেটি আর আসেনি রানু নামের মেয়েটির সাথে দেখা করতে। মেয়েটি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর বারান্দার গ্রিলে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এদিকে আমার কফি খাওয়া প্রায় শেষ। ঘড়িতে রাত একটা ছুঁইছুঁই প্রায়। চলে এলাম রুমে। মৃত শহরে প্রেমও যে নিঃস্ব, বুঝুক মেয়েটি।
পরদিন মেইন গেটের সামনে কোলাহল শুনে বারান্দায় এলাম। দেখলাম যুবলীগ নেতা সাহেদ দলবল নিয়ে একটি খোলা মিটিং বসিয়েছে। আনিকাও দাঁড়িয়ে আছে একপ্রান্তে মায়ের আঁচল ধরে। ভয়ে কাঁপছে। কানাঘুষায় শুনলাম, ত্রাণ নিতে গিয়ে বাচ্চা মেয়েটিও হয়েছে লাঞ্ছনার স্বীকার। হায়েনারা ওইটুকু শরীরে হাত বাড়াতেও দুবার ভাবেনি।
সাহেদ বললো,
‘দোষ তোমারই, বুজলা আনিকার মা। জানোই তো, জামানা খারাপ। তাও এই পিচ্চিরে একলা ছাড়লা ত্রাণ নিতে। যাই হোক, অন্যায় করছে কারা এহনো জানি না। তবে বিচার হইব। আমি আবার সবার ভালো চাই, বুজলা। আমার কাছে অন্যায়ের জায়গা নাই।’
জমাট কমতে লাগলো লোকজনের, সুষ্ঠু বিচার হয়েছে যেহেতু। যুবলীগ নেতা সাহেদ মাত্র পাঁচশ টাকায় পুরো ব্যাপারটা দফারফা করলেন। তারপর চলে গেলেন। পাঁচশ টাকার নোট হাতে নিয়ে আনিকার মা আনিকার হাত ধরে দাঁড়িয়েই রইলেন সেখানে, বজ্রাহতের মতো।

৫.
তারপরের গল্পটা মূলত একই রকম, শুধু প্রেক্ষাপটগুলো ভিন্ন। কীভাবে জানেন?
না, এই শহর কিন্তু এখনো প্রাণ ফিরে পায়নি, আনিকাও সঠিক বিচার পায়নি। নীল নামক ছেলেটিও আর আসেনি। রানু নামক মেয়েটি আজো বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকে রাত পেরোলে। সাহেদ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে কিছুদিন একটি হাসপাতালের ভেন্টিলেশনে থেকে গতকাল মারা গেছে। মৃত্যুর পর ডাক্তাররা কৌশলে লাখ টাকার বিল বানিয়ে তার লাশ আটকে রাখে। সাহেদের আত্মীয়স্বজন সেই বিল পরিশোধ করে দেশের আইন ব্যবস্থাকে গালি দিতে তার লাশ নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করলো। আর ওদিকে তার খাস লোক সোহেলকে সাহেদের জানাজার ত্রিসীমানাতেও দেখা যায়নি। কারণ সে নতুন নেতার সন্ধানে ব্যস্ত, যদি একটু পলিটিক্যাল ছায়া পাওয়া যায়। আনিকার মা সব অভাব ভুলে সেই পাঁচশ টাকার নোটটি একদিন নীরবে মসজিদের দানবাক্সে ফেলে দিলেন। তারপর ধীর পায়ে চলে গেলেন। ছোট্ট আনিকা মায়ের ছেঁড়া শাড়ির আঁচল ধরে টুকটুক করে হেঁটে চলে গেল মায়ের সাথেই।
মসজিদের ইমাম সেই দানবাক্স খুলে টাকা গুনতে গুনতে পকেটে পুরে ফতোয়া দিলেন পরের মাহফিলে,
‘আল্লাই দেখবে সব। ধর্মের পথে আসেন ভাইয়েরা। মসজিদ খুলে দিছে, নামাজ পড়েন দলে দলে। পানাহ্ চান।’
দিনশেষে সব সার্কাসই থেমে যায় তারপর। রাত বাড়ে। গতিবিধি পরিবর্তন করতে থাকা শুকতারাটির দিকে চোখ রেখে এই মৃত শহরের গল্প লিখি, কান্না শুনি। কুকুরের কান্না, বেড়ালের কান্না, রানুর কান্না, আনিকার ঘুমন্ত শরীরে হাত রেখে তার মায়ের নীরব কান্না। অথচ আমি জানি, এই শহরে আবারো প্রাণ আসবে একদিন। রানু নামক মেয়েটি লাল শাড়িতে বধূবেশে নীলের হাত ধরবে। আনিকা ছুটে এসে আমার বারান্দার সামনে চেঁচিয়ে বলবে,
‘আপু! আমার ইস্কুল খুলছে।’
কারণ প্রকৃতি কোনো গল্পই অপূর্ণ রাখে না।

এসআর