করোনাকালের রোমিও ও জুলিয়েট

আগের সংবাদ

ঈদযাত্রায় সমন্বয়হীনতা, সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে

পরের সংবাদ

জীবন এত ছোট ক্যানে

রফিকুর রশীদ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৫:২৬ অপরাহ্ণ

টেলিভিশন খুললেই প্রতিদিন মৃত্যুর পরিসংখ্যান শুনতে হয় অথবা দেখতে হয়। দুনিয়াজোড়া মানুষের মৃত্যু। মানবের মৃত্যু। প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে রাশি রাশি স্বপ্নেরও মৃত্যু। না, ক্ষমতালোলুপ পরাশক্তির মধ্যে মারণাস্ত্রের নিষ্ঠুর খেলায় প্রাণহানির পাটিগণিত এ নয়। অদৃশ্য এবং ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অথচ প্রবল পরাক্রমশালী এক জীবাণুর ধাক্কায় বিপুল বিশাল এই মানব সভ্যতা ক্রমাগত এগিয়ে চলেছে স্পন্দনহীন মৃত্যু উপত্যকায়। অনতিক্রম্য জেনেও মানুষ মৃত্যুকে নয়, ভালোবাসে জীবনকে এবং কী এক স্বপ্নময় প্রক্রিয়ায় রচনা করে জীবনের বর্ণিল উপাখ্যান। করোনাকালে গল্প লিখতে বসে আমার ভাবনা হয়- নতুন করে কী গল্প লিখব! প্রতিদিনই তো প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে রচিত হয়ে চলেছে অসংখ্য গল্প। আমি তো টের পাই- মৃত্যুর পেয়ালাভরা ক্ষুদ্র এ জীবনেরই গল্প সে সব। মানবিক কলমে তার কতটুকু লেখা যায়, কতটুকু আঁকা যায়!
সেই গল্প লিখতে বসে সহসা টের পাই- আমার চৈতন্যের দরজার কপাট ধরে দাঁড়িয়ে আছে সেই কবেকার নেতাই, কথাশিল্পী তারাশঙ্করের নেতাই এতদিন পরও সেই পুরনো প্রশ্নই আমাকে করছে- ‘জীবন এত ছোট ক্যানে?’

তাই তো! এখনো সেই প্রশ্ন!
আমি কী জবাব দেব সিলেট মেডিকেলের ডাক্তার মঈনউদ্দীনের সদ্যবিধবা পত্নী অথবা শিশুপুত্রকে, তাদের সামনে তো পড়ে আছে জীবনের দীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ পথ! ওই যে নারায়ণগঞ্জের জনৈক মাসুদা বেগমের বুক চাপড়ানি আহাজারির মধ্যে ধ্বনিত হচ্ছে তার স্বামীর করোনাবিষে জর্জরিত মৃত্যুসংবাদ, ওই যে ঢাকার অদূরে পথিপার্শ্বে পড়ে আছে রোগকুঞ্চিত জননীর লাশ; হ্যাঁ জননী, গর্ভে ধরেছিলে যে সন্তানদের, পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় তারা আরো বহুদিন বাঁচতে চায় বলে এমন মর্মান্তিকভাবে তোমাকে ত্যাগ কর চলে গেছে, আমার সাধ্য কী জীবনের এই সব ছিন্নপত্ররাজি নিয়ে গল্প রচনা করি! ক্ষমা করো মা, তোমার এই জীবনলালায়িত সন্তানদের।

গল্প কি রচনা করার বস্তু! দুনিয়াজোড়া প্রতি মুহূর্তে অগণিত গল্প সৃজিত হয়ে চলেছে। হাজার হাজার গল্প। লাখ লাখ গল্প। একদিন কোটির অঙ্ক পেরিয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। আজকের টিভি নিউজে চোখ রাখলেই জানা যাবে মৃতের সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে, শুধু বাংলাদেশে মৃতের সংখ্যা তিন ডিজিট অতিক্রম করেছে, প্রবাসী বাঙালির হিসাব ধরলে নির্ঘাত হাজারের ঘর ছুঁয়ে যাবে। হায়রে জীবন, একটু সুখস্বাচ্ছন্দ্যের আশায় ‘যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা, যার নদীজল ফুলে ফলে মোর স্বপ্ন আঁকা’ সেই সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়ে সভ্যতাগর্বী ইউরোপ-আমেরিকা পাড়ি দিয়েও শেষরক্ষা হলো কই! সাপলুডুর দীর্ঘকায় অজগর নয়, অদৃশ্য এক ঘাতক কেমন অবলীলায় সাবড়ে দিচ্ছে! তবে কি সে তার অতি সূ² আলাজিহ্বার ডগা থেকে এই সত্য ছুড়ে দিচ্ছে- আকবর বাদশাহ সঙ্গে হরিপদ কেরানির জীবনে তফাৎ কিছু নেই!
ভৈরব বাজারের মৎস্য ব্যবসায়ী অমিয় হালদারের মৃত্যু পরবর্তী গল্পের কথাই ধরা যাক। লোকটি ভালো মানুষ ছিল। সামাজিক কর্মকাণ্ড সাধ্যমতো অংশগ্রহণের ধাত ছিল। খবরের কাগজের সচিত্র প্রতিবেদনে প্রকাশ- ষাটোর্ধ্ব অমিয় হালদার সর্দিকাশি-শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রাতেই মারা যান। এ মৃত্যু করোনার মর্যাদায় অভিষিক্ত হলে শেষরাতে শ্মশানে তার শেষকৃত্যে বাধা দেয় একদল দুর্বৃত্ত। দাহ করতেও দেবে না। ফজরের নামাজ শেষে সেই পাড়ার মসজিদের মুসল্লিরা গিয়ে দুর্বৃত্তদের হঠিয়ে শেষকৃত্যানুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করিয়ে দেয়। প্রিয় পাঠক, এই সংবাদভাষ্যের মধ্যে ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’ সে কথা সত্যি, তবু আমি খুঁজে পাই জীবনের গল্প, সম্প্রীতি ও সৌহার্দের গল্প। মাটির গভীর থেকে ক্ষুদ্র বীজ যেভাবে অঙ্কুরিত হয়, সবুজে শ্যামলে উদ্ভাসিত হয়, আমার বিবেচনায় মৃত্যুর কোল থেকে সেভাবেই জীবনের গল্প সৃজিত হয় প্রতিনিয়ত আপন স্বতঃস্ফ‚র্ততায়। আমার মতো তুচ্ছ গল্পকার স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে সৃজিত সেই গল্পের গায়ে কী আর এমন রঙের ছোঁয়া দিতে পারে!
সত্যি আমরা অতি সাধারণ মানুষ।
মরণকে শ্যামের সমান ভাবতেও শিখিনি। এমন ভাবনা শেখাতে চেয়েছিলেন যে রবি ঠাকুর, তাঁর চেয়েও বছর তিনেক অধিক বেঁচে ছিলেন বাঙালির বটবৃক্ষ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। পত্রপুষ্পে পূর্ণ জীবনে তিনি অনেক দিয়েছেন। তবু আমাদের প্রত্যাশার শেষ নেই বলেই তাঁর এই করোনালাঞ্ছিত প্রস্থানকে অসময়োচিত মনে হয়েছে। তিরাশি বছরের পথ পরিক্রমন শেষে চলে যাওয়ার বেলায় তাঁরও কি একবার ‘কবি’ উপন্যাসের নেতাইকে মনে পড়েছে? আমরা জানি না তিনিও কি কখনো অস্ফুট উচ্চারণে বলেছেন- ‘জীবন এত ছোট ক্যানে?’

এসআর