ঘূর্ণিঝড়ে নিঃস্ব সবজিচাষীরা চান সহায়তা

আগের সংবাদ

রাজিন তার কাক্কা এবং আমি

পরের সংবাদ

জগৎ সংসার

মজিদ মাহমুদ

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৫:০০ অপরাহ্ণ

প্রেমে পড়ার পরে আব্দুল হালিমের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে উঠল। তার প্রেমিকার নাম মর্জিনা, মোছাম্মৎ মর্জিনা। সে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার মেয়ে। সিনিয়রদের সঙ্গে মেজাজ করায় মর্জিনার বাপের চাকরি গেছে। অবশ্য প্রথমে খাগড়াছড়িতে বদলি করায় নিজেই সেখানে অনুপস্থিত ছিল। আর যা হওয়ার তাই হয়েছে। মর্জিনা আব্দুল হালিমকে ভালোবাসে; হালিমও বিয়ের জন্য এক পায়ে খাড়া। মর্জিনাও অনেক রূপবতী। আব্দুল হালিমও সুদর্শন। এত সুন্দর জোড়া সচরাচর গরিবদের মধ্যে হয় না। যাদের কানাকড়ি নেই তাদের বৌ স্বভাবত রূপবতী হয় না। মর্জিনার বাপও হালিমকে পছন্দ করতো। তবে তারও তেমন কোনো সম্পদ নেই। শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে চাকরি যাওয়ায় অফিস থেকে তেমন কিছু পায়নি। মর্জিনার বাপের আপত্তি ছিল ওই এক জায়গায়। এরকম কপর্দকহীনের কাছে কীভাবে নিজের মেয়ে বিয়ে দেয়। আব্দুল হালিম ছেলে ভালো সে কথা সবাই মানে। শেষে আব্দুল হালিমকে ডেকে মর্জিনার বাপ বললেন, দেখ বাপু, সব ঠিক আছে; তবে যেদিন তুমি চাকরি-বাকরি কিছু একটা করতে পারবে সেদিনই কেবল আমি তোমার সাথে আমার মেয়ে বিয়ে দিতে পারব। তার আগে নয়। তোমাকে কিছুদিন সময় দিচ্ছি, ঢাকা যাও। গ্রামের অনেকেই পরিচিত আছে তাদের কাছে গিয়ে এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করো। বাড়িতে বসে থাকলে তো আর চাকরি হবে না।
চাইলেই তো আর কোথাও চলে যাওয়া যায় না। শেষমেশ সে ঢাকায় তার এক বন্ধুর কাছে উঠল। বন্ধুর নাম রহমান মোখলেস। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। উত্তরায় একটা বাড়িতে ভাড়া থাকে। এখনো বিয়েশাদি করেনি। পয়সা-পাতি আছে, থাকলেও খামখেয়ালির কমতি নেই। তবে বন্ধু তাকে ভালোই সমাদর করল। উত্তরা ৯ নম্বর আবাসিক এলাকায় একটি ছয়তলা ফ্ল্যাট বাড়িতে রহমান মোখলেসের বাস। বাড়িটা বেশ বড়সড়ো, অনেকটা জায়গা ছেড়ে দিয়ে করা। প্রতি ফ্লোরে গোটা তিনেক ইউনিট রয়েছে। নিচের দিকে বেশ কিছুটা জায়গায় ছোট একটি বাগান যত্ন করে করা। এই ফ্ল্যাট বাড়ির অর্ধেকের মালিক জমিওয়ালা।সামনের পনেরোটা ফ্ল্যাটের আটটিই তার। বাকিটা ডেভেলপারের কাছ থেকে অন্যরা কিনে নিয়েছে। তাই জমিওয়ালার সম্মান ও অধিকার সবার থেকে কিছুটা সামবিবেশি। তিনি লোকও খারাপ না। নাম মঞ্জুরুল হক। তিনিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। আর যে কারণে রহমান মোখলেস অবিবাহিত হওয়ার পরেও তার এখানে বাসা পেতে অসুবিধা হয়নি। তাছাড়া সেও বিয়ে করার জন্য মেয়ে দেখছে। অল্পদিনেই বিয়ে করবে সে কথাও তাকে বলেছে। আর একবার বাড়িতে উঠতে পারলে বড় কোনো সমস্যা না হলে তো আর কেউ নামিয়ে দেয় না।
মঞ্জুর সাহেবের বাসায় ড্রাইভার আর একজন গৃহকর্মী ছাড়া কেউ থাকে না। এক ছেলে- স্ত্রী সংসার নিয়ে আমেরিকায় বসবাস করে। মঞ্জুর সাহেবের স্ত্রীও মাস ছয়েক আগে ছেলের কাছে গিয়ে আটকে পড়েছে। ছেলে বরং চাপ দিচ্ছে বাবাকে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার জন্য। এ নিয়ে ছেলে ও বাপের মধ্যে এক ধরনের দ্ব›দ্বও আছে। তিনি চান দেশের মাটিতেই তার কবর হোক।
গত সপ্তাহে বাড়ি গেছে রহমান মোখলেস। বিয়ের জন্য মেয়ে দেখাও এ যাত্রায় তার বাড়ি যাওয়ার অন্যতম কারণ। তার বাড়ি সাহবাজপুর ইউনিয়ন বোর্ড অফিস থেকে পাঁচ কি.মি পশ্চিমে, আর তার ঠিক উল্টো দিকে অতটা গেলে আব্দুল হালিমের বাড়ি। সব মিলে যদিও তাদের পরস্পর বাড়ির দূরত্ব প্রায় দশ কি.মি, তবু তারা সাহবাজপুর হাইস্কুলে এক সঙ্গে পড়াশোনা করেছে। সেখান থেকেই তাদের বন্ধুত্ব। আর মোখলেস যেহেতু তিন রুমের বড় ফ্ল্যাটে একাই থাকে সেহেতু হালিমকে পেয়ে তার ভালোই হয়েছে। অন্তত কিছুটা একাকীত্ব কেটেছে। এখন আব্দুল হালিম বাসাবাড়িতে সম্পূর্ণ একা।
মোখলেস বাড়ি যাওয়ার পরে এক ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল দেশে। আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল আমাদের দেশেও কিছু একটা হতে যাচ্ছে। চীনের উহান শহরে যে ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে তারই ছোঁয়া লেগেছে আমাদের দেশেও। চীন থেকে ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের সংস্পর্শে এই ভাইরাস এ দেশের মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সবাইকে শুরুর দিকে কোয়ারেন্টাইন করা সম্ভব হয়নি। কর্তৃপক্ষ ততটা সজাগ ছিল না। যারা এসেছে তারাও গোপন করেছে কিংবা গা করেনি। মিরপুরে প্রথম এক রোগীর শরীরের ভাইরাস পাওয়া গেছে। প্রকাশ পাওয়ার মাত্র একদিন পরে সে মারাও গেছে। তার বাড়িসহ পুরো এলাকা লকডাউন করা হয়েছে। এর দুএকদিনের মধ্যেই আরো কিছু উপসর্গ ধরা পড়ার পুরো দেশ লকডাউন করা হয়েছে। তিন সপ্তাহের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। যানবাহন বন্ধ।
যাই হোক, এ অবস্থায় মোখলেস দেশে গিয়ে আটকা পড়েছে। অফিস বন্ধ, গাড়িঘোড়া না চলায় আসতেও পারছে না। আব্দুল হালিমের খুব একটা কষ্ট হচ্ছে না। সে নিজেই রান্নাবান্না করতে পারে। বাসায় যে চাল-ডাল আছে তা আরো কিছুদিন চলতে পারে। লকডাউনের শুরুতে ছুটি পেয়ে অধিকাংশ লোক ঢাকা ছেড়েছে। এমনকি এই বাড়িতে যারা ভাড়া থাকত কিংবা ফ্ল্যাটের যারা মালিক ছিল তাদের অধিকাংশ পরিবার নিয়ে দেশের বাড়িতে চলে গেছে। আর দুএকটি পরিবার যারা আছে, তাদের কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। মঞ্জুর সাহেবের সঙ্গেও এর মধ্যে দেখা হয়নি। সব যখন ঠিকঠাক ছিল তখন মঞ্জুর সাহেব আসর নামাজ মসজিদে পড়তেন। সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসতেন। তার আগে বাসার নিচে বাগানে কিছুটা সময় কাটাতেন। এরই ফাঁকে আব্দুল হালিমের সঙ্গে তার দুএকবার দেখাও হয়েছে। কথা হয়েছে। বুড়ো মানুষ, তদুপরি বাড়ির মালিক, সব কিছু তার নখদর্পণে থাকা চায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে এসবই অতীত। লকডাউনের তৃতীয় দিনের রাতের বেলা মঞ্জুর সাহেবের ড্রাইভার এসে আব্দুল হালিমকে বলল। বাড়িওয়ালা স্যার আপনারে একটু নিচে ডাকছেন। মঞ্জুর সাহের বাসায় ঢুকে একটু হতভম্ভ হয়ে গেল আব্দুল হালিম। পুরো ফ্লোর নিয়ে একটা বাসা। চার হাজার স্কয়ার ফুটের কম হবে না। ড্রইং রুমটা তারা যে বাসায় থাকে সেটির সমান। দামি আসবাবপত্র ছাড়াও নানা রকম পুরনো দামি জিনিসপত্র, বইপুস্তক, দেয়ালে ছবি; এমনকি বাচ্চাদের খেলনা দিয়ে ভর্তি। অথচ তিন মাসের মধ্যে আব্দুল হালিম এ বাসাতে শিশু তো দূরের কথা কোনো অতিথি আসতে দেখেনি। মঞ্জুর সাহেবের ড্রাইভার হালিমের কৌত‚হল দেখে বলল, এসবই স্যারের নাতিরা আসবে বলে স্যার কিনে রেখেছেন। বাড়ি যতই বড় হোক, আব্দুল হালিম ভেতরে ঢুকেই কোথায় যেন একটু নিরানন্দ শোকের ছায়া স্পর্শ করল। ড্রাইভারকে বলল, স্যার কি অসুস্থ।
এর মধ্যে মঞ্জুর সাহেব ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলেন। হাতে কয়টা কাগজের প্যাকেট। তাকে আরো বুড়ো দেখাচ্ছিল। চোখে মুখেও কোনো আনন্দ ছিল না। মনে হলো চোখ দুটি অনেক ফোলা। উদভ্রান্ত। হয়তো কেঁদেছেন খুব। অসুখ-বিসুখও হতে পারে। তাকে তো আর জিজ্ঞাসা করা যায় না। ড্রাইভার ও আব্দুল হালিমকে তার সামনের সোফায় বসতে বললেন। এরমধ্যে বাসার গৃহকর্মী মেয়েটি ট্রলিতে করে কিছু চা নাস্তা নিয়ে এসেছে। তাকেও মঞ্জুর সাহেব আরেকটি সোফায় বসতে বললেন। সে কিছুটা দ্বিধা করে বসে পড়ল। মঞ্জুর সাহেব তিনজনের হাতে তিনটি বড় খাম ধরিয়ে দিলেন। মুখে বললেন, এর মধ্যে একটা নোটারি দলিল আছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আসল দলিল করে দেবেন। আজ সকালেই আমি আমার আইনজীবী দিয়ে এটি করেছি। তোমাদের প্রত্যেককে আমি আমার এই আটটি ফ্ল্যাট থেকে একটি করে লিখে দিয়েছি। আর খামের মধ্যে প্রত্যেকের জন্য পঞ্চাশ লাখ টাকার একটি করে চেক রয়েছে। তোমাদের ব্যাংক একাউন্টে জমা দিয়ে দিও।
এ ধরনের পরিস্থিতি কি করা উচিত আব্দুল হালিমের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব নয়। সে ফ্যালফ্যাল করে মঞ্জুর সাহেবের দিকে তাকিয়ে থাকল। কিছুই বুঝতে পারছে না। সত্যি না কি এখনো সে রাতে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে। নিজের শরীরে গোপনে একটু চিমটি কেটেও নিশ্চিত হতে চাইল। এসব কি শুনছে। ভাবল, বড় লোকের অনেক খেয়াল থাকে হয়তো এটিও তার অংশ। কিন্তু মুখে কোনো কথাই বলতে পারল না। মঞ্জুর সাহেবই বললেন, তোমরা আশ্চর্য হচ্ছো। হওয়াই স্বাভাবিক। আমাকে হয়তো বোকা ভাবছো। আসলে ওসব কিছু না। তোমাদের আরেকটি কথা বলা হয়নি। গতকাল নিউইয়র্কে আমার একমাত্র ছেলে, ডাক্তার ছিল হাসপাতালে, করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। আমার স্ত্রীও হাসপাতালে। আমার একমাত্র নাতি আর তার মা আমার বৌমা এখনো ভালো আছে। তবে তারা আদৌ কখনো বাংলাদেশে আসবে কিনা ভাবতে পারছি না। আর এলে তাদের জন্য আরো চারটি ফ্ল্যাট রয়ে গেল, ব্যাংকেও আরো কিছু টাকা আছে। তারা এলে হয়তো বিক্রি করে নিয়ে যাবে। অথবা আত্মীয়-স্বজন, যাদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, যাদের হয়তো দরকার নেই তারাই হয়তো এগুলোর মালিক হয়ে যাবে। অনেকবার ভেবেছিলাম এগুলো বেচে দিয়ে গ্রামে গিয়ে একটি ভালো স্কুল বানাব। কিন্তু আমার যে বয়স তাতে আর নতুন করে কোনো কিছু শুরু করা সম্ভব নয়। তারচেয়ে এটিই ভালো, অন্তত আমার চেনা কয়জন মানুষ, যারা আমার কিছুটা সেবাও করেছে, তারা যদি কিছু পায় তাদের কিছু কাজে লাগবে। মৃত মানুষের জন্য সম্পদের দরকার নেই। গলা ধরে এলো। তিনি আর বলতে পারলেন না। এই বলে মঞ্জুর সাহেব ভেতরে চলে গেলেন।
ড্রইং রুমে বসা তিনজনের কেউ কারো দিকে তাকাতে পারল না। কথা বলতে পারল না। আব্দুল হালিম নীরবে নিচে নেমে এলো মোখলেস সাহেবের বাসায়- যেখানে সে থাকে। এই বাসাটিই মঞ্জুর সাহেব তাকে লিখে দিয়েছে। এই বাসার মালিক এখন থেকে আব্দুল হালিম নিজে, আর তার বন্ধু রহমান মোখলেস আগের মতোই ভাড়াটে! এমনও কখনো হয়! তবে এই প্রাপ্তিতে আব্দুল হালিম কোনোভাবেই খুশি হতে পারছে না। মঞ্জুর সাহেবের এই দুঃখ সে কীভাবে ভাগ করে নেবে। তবে এই দুঃখ আনন্দের মধ্যেও তার মর্জিনার কথা মনে পড়ছে। মর্জিনাকে এবার বিয়ে করতে তার আর কোনো বাধা থাকল না।
আনন্দ বিষণ্ণতা নিয়েই আব্দুল হালিম রহমান মোখলেসের ল্যাপটপে নিজের ফেসবুক আইডি খুলে দেখল রহমান মোখলেসের বাহুলগ্না একটা মেয়ে। প্রথমে কিছুটা অবাক হলো, একই রকম কি দুজন মানুষের চেহারা হতে পারে! একেবারে হুবহু। নিশ্চয় পারে, আল্লাহ’র দুনিয়ায় কিছুই অসম্ভব নয়। কিছুক্ষণ আগে তার জীবনে যে ঘটনা ঘটে গেল, কেউ কি তা ভাবতে পেরেছিল আগে। আব্দুল হালিম চোখ মুছে আবারো দেখল, না আর কেউ নয়, সে আসলে অন্য কেউ নয়, সে মর্জিনা ছাড়া কেউ নয়। নিশ্চিত মোখলেসের সঙ্গেই মর্জিনার বিয়ে হয়ে গেয়ে গেছে। ছবির ক্যাপশনেও তাই লেখা। তাই মর্জিনা আর মোখলেসের যুগল ছবি মোখলেস ফেসবুকে পোস্ট করেছে।
আব্দুল হালিম ঠিক বুঝতে পারল না সে কতটুকু পেল আর কতটুকু হারালো। মঞ্জুর সাহেবের জীবনেরই বা কি অর্থ থাকল। সে কাউকে কিছু না বলে ওই রাতেই মঞ্জুর সাহেবের বাসা ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়।

এসআর