প্রতিদিনই রেকর্ড ভাঙছে আক্রান্তের সংখ্যা

আগের সংবাদ

জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই ভারসাম্যমূলক পদক্ষেপ

পরের সংবাদ

ঘুমিওপ্যাথি

আনজীর লিটন

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৪:১৩ অপরাহ্ণ

গত ২৪ ঘণ্টায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ১৪ জন। এ সময়ে শনাক্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৭৩ জন। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ২২ হাজার ২৬৮।
গণমাধ্যমে প্রচারিত খবর

প্রতিদিনের মতো খবরের শিরোনামটুকু শুনেই টেলিভিশন অফ করে দিল মতিন। বিস্তারিত শোনার আর ধৈর্য নেই।
এখন শুরু হবে ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ। ঘুম বলে, আমি আসবো না তোর চোখে।
মতিন বলে, আজ তোকে আসতেই হবে।
একবার চোখ বন্ধ। একবার চোখ খোলা। একবার এপাশ। একবার ওপাশ। এভাবেই শুরু হলো ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ। ঘরের বাইরে তখন করোনার সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বরাত দিয়ে সরকার বলছে করোনা থেকে রক্ষা পেতে হলে ঘরই নিরাপদ।
মতিন সেই নির্দেশবলে এখন নিরাপদ জোনে আছে। ঘরে আছে। কিন্তু ঘরে বসে থাকা মানেই তো বিশ্রাম। আলস্য। বইপড়া। টিভি দেখা। বাথরুমে যাওয়া। টয়লেট করা। খাওয়া-দাওয়া এবং নিশ্চিন্ত ঘুম। আর ঐ জায়গাটিতে চলছে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। অর্থাৎ ঘুম বিচ্ছিন্ন রাত। বাইরে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ। ঘরে ঘুমের সঙ্গে যুদ্ধ।
রাতের খাওয়া-দাওয়া শেষে এগারটার দিকে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মতিন। পাশে এসে বউ শোয়। মিনিট দশেক সাংসারিক টুকিটাকি আলাপ শেষে বউটা চলে যায় ঘুমের বাড়ি। একরাশ স্বপ্ন ছড়িয়ে থাকে বিছানাজুড়ে। করোনাযুদ্ধ শেষে বিজয়ী হতে পারলে কম্পিউটার এক্সেসোরিজের দোকানটা একটু বড় করবে। আরও বেশি মাল তুলবে দোকানে। দোকানে মাল ঠাসা না থাকলে কাস্টমারদের নজরে আসা যায় না। বিশ্ এবং অভিজ্ঞ বিক্রেতার পরিচয় মালভরা দোকান। তেমনি সংসারটাও পূর্ণ হয় সন্তান-সন্ততির কারণে। দু’বছরের সংসার জীবন। মতিন বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে করোনাযুদ্ধের পর শুধু দোকান না সংসারটাও বাড়াতে হবে। সন্তানের মুখ দেখতে হবে।

ঘর কাঁপানো হাসির শব্দ পাশে শুয়ে থাকা বউটার ঘুম ভাঙাতে পারলো না। মতিন একাই শুনতে পাচ্ছে এই হাসি। দৈত্যটা এখনো হা-হা করে হাসছে। গম্ভীর কণ্ঠে বলল, মতিন, কী চাই তোর? করোনাকালের এই রাতে কী চাই তোর? মতিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ঘুমের প্রণোদনা ঘুমিওপ্যাথি।

বউটার মুখের দিকে তাকায় মতিন। রাতের আঁধারে লুকিয়ে থাকা ছড়ানো-ছিটানো চিকন আলোর দানা এসে বউটার মুখে পড়েছে। মতিন এই আলোটা সরাতে চায় না। বউটাকে ঘুমের সুযোগ করে দিয়ে ওপাশ ফিরে চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু না। কোনোভাবেই ঘুম আসছে না। পৃথিবীটা কী তাহলে ঘুমহীন হয়ে যাবে। মানুষ ঘুম ছাড়া বাঁচবে কী করে?
ক্রমশ পৃথিবীতে একদিন ঘুমযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ তৈরি হবে। একদল নাক ডেকে আরামে ঘুমাবে। অন্যদল ঘুমকে পাওয়ার জন্য ছটফট করবে। ট্যাবলেট খাবে। ওষুধ খাবে। কিন্তু ঘুমবাবাজি প্রশ্রয় দেবে না দেবে না দেবে না। মতিন ঘুমকে চেনার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু ঘুম অচেনাই থেকে যায় ওর কাছে। ও-তো ডাক্তার নয়। বিজ্ঞানী নয়। কোনো গবেষক নয়। ঘুমের গভীর রহস্যের কথা ও-কি বুঝবে?
মতিনের কাছে ঘুম মানে চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়া। স্বপ্ন দেখা পর্ব শেষ হলে বাথরুমে যাও। আবার এসে ঘুমাও। স্বপ্ন দেখ নতুন কোনো ঘটনার, নতুন কোনো পর্বের।
উফ! অসহ্য। কী নিষ্ঠুরতা! চিৎকার দিতে ইচ্ছে করে। করোনার এই দুঃসময়ে ঘুম যে কত কঠিন হয়ে পড়লো কারো কারো জন্য- তা মতিনকে দেখে বোঝা যাচ্ছে।
এরকম হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মতিন এখন ঘুমের জন্য পাগল হয়ে উঠছে।
বউয়ের পাশে শুয়ে থেকে সেলফি তুলতে ইচ্ছে করলো মতিনের। তিনটি ভঙ্গিতে খাটাখাট সেলফি তুললো।
ঘরে থাকা আর সামাজিক দূরত্বের দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর বিধিনিষেধের রেখা ডিঙিয়ে কোথাও যাবার জো নেই। গত দেড় মাসে তিনবার বের হতে পেরেছে। বাজার সদাইয়ের জন্য। অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লকডাউনের আগেই ঘরে রাখা হয়েছে।
চাই বা না-চাই ঘরে থেকে বন্দিত্ব জীবনের স্বাদ নিতে হচ্ছে। লকডাউনের এই ক’দিনে মতিন অনুভব করছে ঘর ছাড়া বাহির আর বাহির ছাড়া ঘরের মূল্য নেই। মানুষ কাজের জন্য ঘর থেকে বের হবেই। আবার কাজ শেষে বাহির থেকে ঘরে ফিরবেই। এ-এক সরল হিসেব।
কিন্তু এই হিসেবের খাতায় ঘুমকে বাদ দিয়ে কিচ্ছু হয় না। ঘুম সুস্বাস্থ্যের প্রতীক। তাহলে কী এখন স্বাস্থ্য ভালো নেই? মতিন নিজেকে মানসিক বিষাদগ্রস্তদের তালিকায় দেখতে পায়। করোনা পৃথিবীতে আঘাত হানার পর থেকে জীবনযাপনটাই পাল্টে গেল। পাল্টে যাওয়া চিত্রপটে যুক্ত হয়েছে ঘুমহীন থাকা।
ঘুমের জন্য মতিন কাঁদছে। করোনা এসেছে পৃথিবীকে কাঁদাতে। মতিন একা নয় অনেকেই কাঁদছে। হাসপাতালে রোগীরা কাঁদছে। ডাক্তার কাঁদছে। নার্স কাঁদছে। জীবনকে বাজি রেখে মানুষকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করছে আর কাঁদছে। নিজের গোপন কান্নাকে মিলিয়ে দিল মতিন সেইসব মানুষের জন্য যারা করোনাকালে যোদ্ধা নামে সম্মান পেয়েছে।
রাত ক’টা বাজে? ঘড়ি দেখতে ইচ্ছে করে না মতিনের। সেলফি তোলার পর ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিয়েছে। ধরতে ইচ্ছে হলো না। বরং শুয়ে বসে ঘুমের সাক্ষাৎ করে নিতে চাইছে। মতিন জিজ্ঞেস করে- ঘুম, আপনার প্রকৃত নাম কি?
উত্তর নেই।
আপনার আদি নিবাস?
উত্তর নেই।
আপনার পিতৃপরিচয়?
উত্তর নেই।
আপনি কে?
দৈত্যের হাসির মতো কে যেন হা-হা করে হাসতে লাগল।
কে আপনি?
আমি আলাদীনের চেরাগ নিয়ে এসেছি তোর জন্য।
হা-হা-হা।
এই চেরাগ দিয়ে আমি কি করবো?
তুই যা চাইবি তাই পাইবি। বল কি চাই তোর? টাকা-পয়সা, সোনাদানা, হীরামানিক, মুক্তা বল কি চাই? যা চাইবি তাই পাইবি। হা-হা-হা।
ঘর কাঁপানো হাসির শব্দ পাশে শুয়ে থাকা বউটার ঘুম ভাঙাতে পারলো না। মতিন একাই শুনতে পাচ্ছে এই হাসি। দৈত্যটা এখনো হা-হা করে হাসছে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল, মতিন, কি চাই তোর? করোনাকালের এই রাতে কী চাই তোর?
মতিন কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ঘুমের প্রণোদনা ঘুমিওপ্যাথি।

এসআর