কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে তিন মডেল

আগের সংবাদ

করোনার সংকটে ঘূর্ণিঝড় দুর্যোগ ও পরিবেশ বিপর্যয়

পরের সংবাদ

ঘরমুখো মানুষ হবেন সংক্রমণের দূত!

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ

সেবিকা দেবনাথ : অনেক আগেই সারাদেশকে করোনা সংক্রমণের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছিল সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে এখনো পর্যন্ত ঢাকা শহর এবং ঢাকা বিভাগেই আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেশি। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে নারায়ণগঞ্জ এবং তৃতীয় অবস্থানে চট্টগ্রাম। অন্যান্য জেলা ও বিভাগে সংক্রমণ ও মৃত্যু হলেও তা কিছুটা কম। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা অমান্য, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্বের তোয়াক্কা না করে ঈদ ফিতরকে কেন্দ্র করে মানুষ যে হারে ঢাকা ছাড়ছে তাতে সংক্রমণের ভয়াবহতা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। শুধু সংক্রমণ বাড়াই নয়; স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা ও ভঙ্গুর অবস্থায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানিও অনেক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর ডেঙ্গুর সময়ও এই একই ঘটনা ঘটেছে। ঈদের ছুটিতে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রামে লোক যাওয়ায় দেশব্যাপী বিস্তার ঘটেছিল ডেঙ্গুর। এবার করোনার ক্ষেত্রেও তাই হবে।
বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের একটি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে বলে মনে করেন করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বিশিষ্ট রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, যারা এখন বাড়ি যাওয়ার জন্য ছুটছেন এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের লক্ষণ প্রকাশ পেতে সময় লাগবে ১৪ দিন। তাই ছুটি শেষে প্রথম ১৪ দিন সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকা ছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। এসব এলাকা থেকে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছেন তাদের মাধ্যমে সারাদেশে ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে। আবার তারা যখন ঢাকাসহ নিজ নিজ কর্মস্থানে ফিরবেন তখনো ভাইরাসটি ছড়িয়ে যাবে। করোনার এক দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার দিকে যাচ্ছি আমরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (রোগ নিয়ন্ত্রণ) সাবেক পরিচালক, সংক্রামক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ মনে করেন অল্প কয়েক দিনেই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কঠোর লকডাউন কেউ মানেনি। শারীরিক দূরত্বও মানা হয়নি। এখন সবাই বাড়ি যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা আরো বেড়ে গেল। আবার যারা সব নিয়ম-নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে বাড়ি যাচ্ছেন, তারা কি সঠিক নিয়মে ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইন মানবেন? তারা মসজিদে ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করবেন, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াবেন, তখন একজনের সংস্পর্শে গড়ে আরো দুই জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াবে। এতে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়বে।
রাজশাহী বিভাগের স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. চিন্ময় দাস ভোরের কাগজকে বলেন, সব পথই শেষ পর্যন্ত আলোর পথে যায়; তবে ভুল পথে গেলে ঝুঁকি বেশি থাকে। আর সহজ পথে গেলে ঝুঁকি কম থাকে। করোনা মোকাবিলায় আমরা বারবার ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছি। করোনা মোকাবিলায় সরকারে যারা কাজ করছেন তাদের মধ্যেই সমন্বয়হীনতা প্রবল অথবা করোনা সংক্রমণের কারণগুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা স্বচ্ছ নয়। কিংবা খুব গুরুত্ব সহকারে এর ভয়াবহতাকে আমলে নিচ্ছেন না। নতুবা ভাবছেন যা হয় হবে। ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলানোর মাসুল আমরা দিচ্ছি এবং দেব।
দেশের সাধারণ মানুষ সচেতন না হওয়ায় করোনা মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোস্তাক হোসেন। তিনি বলেন, আমরা গণমাধ্যমে দেখছি মানুষ কোনো প্রকার স্বাস্থ্যবিধি না মেনে গাদাগাদি করে বাড়ি যাচ্ছেন। যারা বাড়ি যাচ্ছেন তারাতো নিশ্চিত করে বলতে পারছে না তিনি করোনায় আক্রান্ত নন। উপসর্গ ছাড়াও অনেকে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকের মধ্যে মৃদু সংক্রমণ দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতি দেশব্যাপী ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, ঈদ করার চেয়ে জীবনটা বড়। বেঁচে থাকলে উৎসব করে ঈদ আবার করা যাবে। কিন্তু জীবনই যদি না বাঁচে তাহলে কীসের আনন্দ? যারা বাড়ি যাচ্ছেন তারা সবাই যে অশিক্ষিত, দরিদ্র তা কিন্তু নয়। কিছু মানুষ লেখাপড়া জানার পরও মুর্খ। যারা এই মহামারি কালেও ঈদ উদযাপন করতে বাড়ি যাচ্ছেন তারা নিজেরাও জানেন না তারা সঙ্গে করে কী নিয়ে যাচ্ছেন? প্রিয় জনকে মৃত্যু উপহার দিতে যাচ্ছেন।

ডিসি