চরফ্যাশনে আমফানের তাণ্ডব কৃষিতে

আগের সংবাদ

চাঁদ দেখা যায়নি, ঈদ সোমবার

পরের সংবাদ

করোনার অভিজ্ঞতা আমাদের ঋদ্ধ করবে

শরীফা বুলবুল

প্রকাশিত হয়েছে: মে ২৩, ২০২০ , ৮:০৫ অপরাহ্ণ

তানভীর মোকাম্মেল। দেশের স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতা। কবি ও কথাসাহিত্যিকও। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সাবলীল চলচ্চিত্র নির্মাণে অন্যতম তিনি। চলচ্চিত্রে তিনি রোপণ করেন মাতৃভূমি, মানুষ ও ইতিহাসের বীজ। মানুষের জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে পর্দায় তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধ, কখনোবা দেশভাগ। গোঁড়ামি কিংবা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার চলচ্চিত্র হয়ে উঠে জুৎসই হাতিয়ার। প্রায় তিনযুগের চলচ্চিত্র ভ্রমণে দেশের বড়পর্দায় তিনি তুলে ধরেছেন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। কখনো প্রামান্যচিত্রে কখনো কাহিনিচিত্রের আশ্রয় নিয়েছেন। এই গুণী নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধের ওপরও অনেক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এ যাবৎ মোট ৬টি পূর্ণদৈর্ঘ্য ও ১টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং ১৫টি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। তাঁর নির্মিত উল্লেখ্যযোগ্য কিছু চলচ্চিত্র হলো ‘স্মৃতিতে একাত্তর’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘রাবেয়া’, ‘কর্ণফুলীর কান্না’, ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ ও ‘জীবনঢুলী। এ ছাড়া নির্মাণ করেছেন সাতচল্লিশের দেশভাগের ওপর প্রামান্যচিত্র ‘সীমান্তরেখা’।

তার সবচেয়ে প্রিয় অবসর হচ্ছে, যখন তিনি নৌকায় থাকেন। তার ভাষ্যে-আমার নিজের কোনো বাড়ি নেই, জমি নেই, তবে আমার একটা নৌকা আছে। ‘অচিন পাখি’ নামের এই নৌকাটি ঢাকার কাছে ধলেশ্বরী নদীতে থাকে। নৌকাটি হচ্ছে দুই কামরার একটা হাউস বোট। সময় পেলেই আমি বইপত্র নিয়ে আমার নৌকায় চলে যাই। দু-চার দিন থাকি। পড়াশোনা করি কিংবা চিত্রনাট্য নিয়ে কাজ করি। অচিন পাখিতে চেপে ধলেশ্বরী বা ইছামতী নদীতে ঘুরে বেড়ানোই হচ্ছে আমার সবচেয়ে প্রিয় অবসর। কিন্তু এই চলচ্চিত্র নির্মাতার করোনাকালের অবসর কেমন কাটছে ভোরের কাগজের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাকে ও আমার ফিল্ম ইউনিটকে খুবই ব্যস্ত জীবন কাটাতে হয়। শুটিংয়ের কাজে বা চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যান্য কাজে আমাদের বাইরে প্রচুর ঘোরাফেরা করতে হয়। কিন্তু এখন তো সেসব পুরোই বন্ধ। ফলে কাজকর্মের বেশ ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু কী আর করা ! তবে ঘরবন্দী থাকার সময়কালটা আমি ইতিবাচকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করছি। আমার সদ্য সমাপ্ত “রূপসা নদীর বাঁকে” ছবিটার ইংরেজি সাব-টাইটেল করেছি ও ছবিটার গায়ে তা লাগিয়েও ফেলেছি। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ওপর যে প্রামাণ্যচিত্রটা তৈরি করছি সেটার গবেষণার কাজ ও ভাষ্যপাঠটা লেখার কাজ শেষ করেছি। করোনা কমে এলেই ছবিটার শুটিং শুরু করব।

তানভীর মোকাম্মেল

সময়টা তাহলে কাজের মধ্য দিয়েই কেটে যাচ্ছে, এর ফাঁকে কিছু লিখছেন, কিংবা পড়ছেন কি? তানভীর মোকাম্মেল বলেন, আমি এমনিতেও লেখাপড়ার মধ্যেই থাকি। গৃহবন্দী থাকার কারণে এখন তা আরো বেড়েছে। গত তিন মাসে একটা উপন্যাস লিখেছি। বেশ কিছু কবিতা লিখেছি। ঘরবন্দী থাকার দিনগুলিতে আমার একটা বড় সময় কেটেছে, কাটছে, বঙ্গবন্ধুর ওপরে গবেষণার কাজে ও নানা রকম বই ও দলিল-পত্র পড়ে যেসব আমি বঙ্গবন্ধুর উপর আমার ছবিটাতে ব্যবহার করবো। আর মনোরঞ্জনের জন্যে নানা রকম বই-ই তো পড়ি। যেমন সম্প্রতি পড়লাম বাংলাদেশের ফুল নিয়ে একটা বই। এদেশে কত রকম ফুল আছে, কত রকম তাদের রূপ ও বৈশিষ্ট্য।

আর এখন পড়ছি বাংলাদেশের পাখিদের নিয়ে একটা বই। আমরা ভাগ্যবান জাতি যে আমাদের দেশে এত নানা প্রজাতির এত সুন্দর সব পাখি রয়েছে। যদিও দেশে পাখির বৈচিত্র্যময় সমাহার বর্তমানে বেশ কমে গেছে! এছাড়া সম্প্রতি আবার পড়লাম লিও তলস্তয়ের একটা ছোটগল্প সংগ্রহ। পুরনো ক্লাসিকসগুলো নতুন করে পড়তে আমার ভাল লাগে।

করোনার অভিঘাত নিয়ে নতুন কোনো ফিল্ম করার কথা ভাবছেন কি না জানতে চাইলে বিশিষ্ট এই নির্মাতা বলেন, না, করোনা নিয়ে কোনো ফিল্ম তৈরির পরিকল্পনা আমার নেই। তবে ভবিষ্যতের কথা এখনই বলতে পারি না! বর্তমানে আমার চলচ্চিত্রবিষয়ক কাজ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রামাণ্যচিত্রটা তৈরি করা। এছাড়া “রূপসা নদীর বাঁকে” নামে যে ছবিটা সম্প্রতি আমি শেষ করেছি, সেটা দ্রুত রিলিজ করা।

করোনার কারণে আপনার চেনা পৃথিবীটার কতোটা বদল ঘটেছে বলে মনে করেন? তার ধরণটা কেমন? এই করোনাকালটা কি ১৯৭১-য়ের সময়টাকেও ছাড়িয়ে গেছে বলে মনে করছেন? জবাবে তিনি বলেন,

করোনা-উত্তর পৃথিবীতে অনেক কিছুই পাল্টে যাবে বুঝতে পারছি। আর তার কিছু কিছু লক্ষণ আমরা ইতোমধ্যে দেখতেও পাচ্ছি। মানুষের সামাজিক আচরণে এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। আন্তঃমানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। মানুষ অনেক বেশি স্বাস্থ্যসচেতন হবে। বড় রকম পরিবর্তন ঘটবে অর্থনীতিতেও। করোনার কারণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশই অর্থনৈতিকভাবে যে গভীর সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে। তার জন্যে আগামী বেশ কয়েক বছরই আমাদেরকে কষ্টকর ও চোয়ালচাপা এক সংগ্রাম করে যেতে হবে। পরিবর্তন ঘটবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনীতিতেও। পৃথিবী আর আগের মতো রইবে না। মানুষের মধ্যেও পরিবর্তন ঘটবে মনে হচ্ছে। স্থুল ভোগবাদের বদলে মানুষের মধ্যে মৃত্যুচিন্তা বাড়ছে। ফলে বাড়ছে সংবেদনশীলতা, আত্মম্ভরিতা কমে জীবনকে গভীরতর স্তরে বোঝার চেষ্টাও বাড়ছে। এগুলো ইতিবাচক লক্ষণ।

করোনার এই দিনগুলির সঙ্গে ১৯৭১-এর দিনগুলির কিছুটা মিল আছে এই অর্থে যে, সার্বক্ষণিক মৃত্যুভয়, ঘরবন্দী থাকা, নিকটজনের খোঁজখবর রাখা, সর্বদাই এক আতঙ্কের পরিবেশ, এসব একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতেও ছিল। সে দিক থেকে এই দুই সময়কালের হয়তো কিছুটা মিল রয়েছে। তবে ১৯৭১ সাল একই সঙ্গে ছিল একটা জাতির মুক্তিযুদ্ধও। ফলে আতঙ্ক, মৃত্যুভয় এসব ছাপিয়েও ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস, ত্যাগ-তিতীক্ষা ও আগামীতে এক স্বাধীন বাংলাদেশের জন্যে এক আশাবাদী আকাঙ্খা ও স্বপ্ন। ফলে আতঙ্কের দিক থেকে কিছুটা মিল থাকলেও প্রকৃতিগতভাবেই এ দু’টো সময়কালের অনুভূতিগুলি ভিন্ন। ব্যক্তির যেমন অভিজ্ঞতা হয়, জাতিরও তেমনি অভিজ্ঞতা হয়। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতির এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা। করোনার অভিজ্ঞতাটাও আমাদের আরো ঋদ্ধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

এই যে করোনার ধাক্কা, প্রকৃতির ওপর মানুষের যথেচ্ছাচারের কারণে এটা প্রকৃতিরই প্রতিশোধ বলে মনে হচ্ছে কী না জানতে চাইলে তানভীর মোকাম্মেল বলেন, একটা তত্ত্ব আছে যে করোনা ভাইরাসটি ল্যাবরেটরিতে মনুষ্যসৃষ্ট। যদিও তা এখনও প্রমাণিত হয়নি। সেটা সত্যি হলে তো প্রকৃতি নির্দোষ। তবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রতি একশ বছরের কাছাকাছি সময়ে এরকম একেকটা মহামারী পৃথিবীকে আক্রান্ত করেছে, যাতে লক্ষ লক্ষ, এমনকি কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। গত শতকের স্প্যানিশ ফ্লু-র কথা আমরা জানি, যে অতিমারীতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কয়েক কোটি মানুষ মারা যায়। তার আগে ইউরোপের কৃষ্ণমৃত্যু প্লেগের কথাও আমরা জানি। তাই এটা কতটা প্রকৃতির প্রতিশোধ আর কতটা মানুষের জীবনাচরণের ফল সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। তবে এ ধরণের মহামারী আসাটা হয়তো আশ্চর্য্যজনক বা অভিনব কিছু নয়। তবে মানুষ ও বিজ্ঞান প্রতি বারেই মহামারীকে পরাস্ত করে বিজয়ী হতে পেরেছে।

তানভীর মোকাম্মেল

বিজ্ঞানের সম্ভাবনার শেষ নেই। মানুষ এইডস বা ইবোলার মতো করোনাকেও একদিন শেষ করতে বা দমিয়ে রাখতে সক্ষম হবে এ ব্যাপারে আমি সুনিশ্চিত।এর থেকে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কী না জানতে চাইলে তানভীর মোকাম্মেল বলেন, অবশ্যই পারবে। বাংলাদেশের মানুষ সংগ্রামী মানুষ। চরম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিলাম। আজো প্রায় প্রতি বছরই বন্যা-সাইক্লোন-জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে এদেশের মানুষকে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়। তবে করোনার বিরুদ্ধে জিততে হলে আমাদেরকে অনেক ধৈর্যশীল, সুশৃঙ্খল ও নিয়মনিষ্ঠ হতে হবে। কারণ করোনা এক অদৃশ্য শত্রু। ফলে প্রত্যেককেই খুব সাবধানতার সঙ্গে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে আগামীতে জীবন চালাতে হবে। বাংলাদেশের এক সমস্যা হচ্ছে আমাদের দূর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের সরকারী চিকিৎসা ব্যবস্থাটা ছিল চরমভাবে দূর্নীতিগ্রস্ত ও অকার্যকর এক ব্যবস্থা। আর তার কারণ হচ্ছে আমাদের শাসকশ্রেণী, মানে শাসকশ্রেণী বলতে যাদের বোঝায় সেই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-নেত্রী, উচ্চপদস্থ আমলারা, ধনী ব্যবসায়ীরা আর তাদের পরিবারগুলো, এরা তো সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিত না। সর্দি হলেও এরা সিঙ্গাপুর-ব্যাঙ্ককে যেত চিকিৎসা নিতে। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারী হাসপাতালগুলো ছিল চরম অবহেলার শিকার। যেহেতু শাসকশ্রেণীর লোকজন এখন বিদেশে যেতে পারছে না, ফলে তারা বাধ্য হচ্ছে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দিতে। আর এর সুফল মধ্যবিত্ত, এমন কী দরিদ্র পরিবারগুলোও ভবিষ্যতে পাবে বলে আশা করা যায়। এটা ভাল দিক। আমি খুবই আশাবাদী যে বাংলাদেশের মানুষ এই  দুঃসময় একদিন কাটিয়ে উঠবেই। তবে করোনার অর্থনৈতিক আঘাতটা আগামী অনেক বছরই হয়তো আমাদেরকে বহন করতে হবে। এবং সেটা প্রায় গোটা বিশ্ব জুড়েই।

পিআর